যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তাপ শেষ হয়নি এখনও। এই যুদ্ধের অস্থিরতা বিশ্বের প্রতিটি মুদ্রা বাজারই টের পাচ্ছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির গতি ধীর।
মাত্রাতিরিক্ত শুল্কের চাপ সহ্য করতে হচ্ছে ক্রেতাদেরও। চীনে অর্থনৈতিক ধীরগতির প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বিলাসপণ্যের বাজারে চাপ পড়েছে। কিন্তু এখানে ব্যতিক্রম এশিয়ার নগররাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতির মধ্যেও দেশটিতে বিলাস পণ্যের বিক্রি বাড়ছে।
অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৬ সাল নাগাদ এই বাজার কোভিড-১৯ মহামারির আগের সময়, অর্থাৎ ২০১৯ সালের রেকর্ড ১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের বিক্রির কাছাকাছি পৌঁছবে।

বিশ্বের অন্য সব বাজারে যখন বিলাস পণ্যের বিক্রিতে ধীরগতি, তখন সিঙ্গাপুর যেন বিলাসপণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর জন্য এক নতুন দিগন্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারগুলোতে চাহিদা কমছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নগর রাষ্ট্রে বিলাসপণ্যের বিক্রি ৭ শতাংশ বেড়ে ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে (প্রায় ১০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার) পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হয়েছে।
জাপান, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ শপিং হাবগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে এই হার। ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরেই সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। একমাত্র জাপান ব্যতিক্রম।
মাত্র ২৮০ বর্গমাইলের নগর রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা ৬০ লাখের মতো। আয়তনে এটি নিউ ইয়র্ক শহরের চেয়েও ছোট, জনসংখ্যায় টোকিও বা সাংহাইয়ের ধারে-কাছে নয়। তবুও চীনের মূল ভূখণ্ড বাদ দিয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২টি শহরের মধ্যে বিলাসপণ্যের দোকান খোলার দিক থেকে সিঙ্গাপুর তৃতীয় অবস্থানে ছিল ২০২৪ সালে। তথ্যটি দিয়েছে বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান স্যাভিলস।
‘দ্য শপস অ্যাট মেরিনা বে স্যান্ডস’র মতো শপিং মলগুলো এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে। মলটিতে গত বছরের আগস্টে ইতালিয়ান বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড মার্নি তাদের প্রথম আউটলেট চালু করে। এখানে ভিআইপি ক্রেতাদের ব্যক্তিগত স্টাইলিং সেশনে অংশগ্রহণ করানোর জন্য বিশেষ গাড়ির মাধ্যমে ঘোরানোর ব্যবস্থা আছে।
মলটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যাজেল চ্যান জানিয়েছেন, মল কর্তৃপক্ষ অচিরেই নির্বাচিত অভিজাত ক্রেতাদের জন্য একান্ত বৈঠকে বিলাসপণ্যের নতুন সংগ্রহ প্রদর্শনের ব্যবস্থা চালু করবে।
বিভিন্ন বিলাসপণ্য কোম্পানি আগে তাদের সিগনেচার পণ্য নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখানোর ব্যাপারটি আগে বছরে দুই-একবার হতো। কিন্তু এখন প্রায় দিনই হচ্ছে।
লাক্সারি নেটওয়ার্ক সিঙ্গাপুরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আইরিন হো জানান, এখন তাদের ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা এবং অভিজাত গ্রাহকদের জন্য বিশেষায়িত বিপণন।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাক্সারিনসাইটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোনাথন সিবোনি বলেন, “ধনীদের জন্য সিঙ্গাপুর এক স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য স্থান। আর এটাই বিলাসপণ্যের জন্য এক শক্তিশালী স্থানীয় বাজার তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর এখন মরুভূমির মধ্যে এক প্রশান্ত মরুদ্যানের মতো।”
সিঙ্গাপুরের এই অগ্রগতির পেছনে আছে দেশটির ধনীবান্ধব নীতি। এর ফলে কয়েক দশক ধরে দেশটিতে উচ্চ আয়ের মানুষদের আকর্ষণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাত গড়ে উঠেছে। আর এটিই সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করেছে।
দেশটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা দেশের ভেতরেই ধনীদের সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মিলিয়নেয়ার রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। গত পাঁচ বছর ধরে দেশের গড় পারিবারিক চাকরিজীবী আয়ের হারও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
শুধু অভ্যন্তরীণ বাজার নয়, সিঙ্গাপুরে আসা পর্যটকরাও বিলাসপণ্যের বিক্রি বাড়িয়ে দিচ্ছেন। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো দেশের পর্যটকরাও এ খাতে বড় ভূমিকা রাখছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পর্যটকদের খরচে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার আয় হয়েছে। এটা আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে সিঙ্গাপুর এখন বিলাসপণ্যের বাজারে শুধু এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয় নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের কৌশলগত এক দুয়ারে পরিণত হয়েছে।
সিঙ্গাপুরে ধনীদের যাতায়াত এবং পশ্চিমা ও এশীয় নান্দনিকতার সমন্বয়ে অভ্যস্ত গ্রাহকরা বিলাসপণ্য কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন কৌশল তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে। এসব কোম্পানি এখন সিঙ্গাপুরকে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার’ হিসাবে ব্যবহার করছে। তারা সেখানে নতুন খুচরা বিক্রির ধারণাগুলো পরীক্ষা করছে বলে জানিয়েছেন আরটিজি গ্রুপ এশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অ্যাঞ্জেলিটো পেরেজ ট্যান জুনিয়র। তার প্রতিষ্ঠান বিলাসপণ্য-সংক্রান্ত পরামর্শ সেবা দেয়।
ট্যান বলেন, “এগুলো শুধুই কোনও চটকদার কৌশল নয়। বরং এগুলো হলো পরিকল্পিত পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা ব্র্যান্ডের সঙ্গে কতটা আবেগ নিয়ে যুক্ত হন, তা বিশ্লেষণ করা হয়।”
তবে সিঙ্গাপুরের ঝলমলে বৈভবের আড়ালে রয়েছে আরেক বাস্তবতা। দেশটিতে এখনও কয়েক লাখ মানুষ আছেন যারা ধনী নন। তাই এই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সমাজে আয়বৈষম্য কমানো সরকারের জন্য একটি স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য হলো ধনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনা। আর সেই প্রচেষ্টার একটি বড় দিক হলো ধনীদের ওপর কর বাড়ানো। কিন্তু এই পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষের উপকার হয়, অন্যদিকে আবার কিছু ধনী করের চাপ থেকে বাঁচতে দুবাইয়ের মতো বিকল্প স্থান বিবেচনা করছেন।
২০২৩ সালে দেশটিতে ইতিহাসে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ঘটে। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন সিঙ্গাপুরি ডলার। মূলত ওই ঘটনার পরেই ব্যাংকগুলো তাদের ধনী গ্রাহকদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করে। ওই কেলেঙ্কারি সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং ও ব্রোকারেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা মেলে ধরেছিল।
মজার বিষয় হলো, ওই তদন্ত সিঙ্গাপুরের প্রতি ধনীদের আস্থা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অ্যাঞ্জেলিটো ট্যান বলেন, “এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, সিঙ্গাপুরের আইন-কানুন সত্যিকার অর্থেই কার্যকর। আর ধনী, সৎ এবং আইনি পথে সম্পদ অর্জনকারীদের কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যখন কোনও দেশে আইন ও বিশ্বাসের পরিবেশ থাকে, তখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যয় করতে আগ্রহী হয়। এই আস্থা এবং স্বীকৃতিই সিঙ্গাপুরে বিলাসপণ্যে স্থিতিশীল ব্যয়ের মূল কারণ। এমনকি যখন অন্যান্য অঞ্চলে বিক্রয় কমে যাচ্ছে।”
বর্তমানে বিলাসপণ্যের প্রতিটি খাতে প্রবাহিত হচ্ছে ক্রেতাদের অর্থ। আর প্রতিটি ব্র্যান্ডই চেষ্টা করছে ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। উদাহরণ হিসেবে টেপেস্ট্রি ইনক. এর মালিকানাধীন ‘কোচ’ ব্র্যান্ডের কথা। ব্র্যান্ডটি গত মে মাসে তাদের প্রথম বার চালু করেছে সিঙ্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী এক ব্যবসায়িক ভবনে। সেখানে কাস্টমাইজড মার্টিনি এবং নিউইয়র্কের রাস্তায় জনপ্রিয় স্ন্যাকস পরিবেশন করা হচ্ছে।
আর সুইস ঘড়ির বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘অডেমার পিগুয়ে হোল্ডিং এসএ’ তাদের বুটিকের ভেতরেই চালু করেছে ‘এপি ক্যাফে’। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে সুইস-সিঙ্গাপুরীয় খাবার। এর মেনুতে আছে ওয়ানটন স্কিন ও চিকেন রাইসের মতো উপাদানে তৈরি বিশেষ পদ। খাবারের পাশাপাশি এটি ফ্যাশনের সঙ্গেও মিলিয়ে তৈরি এক বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা।
২০২৪ সালে র্যাফেলস সিটি মলও বিলাসবহুল প্রসাধনী বাজারে প্রবেশ করেছে বৃহৎ পপ-আপ দোকান চালুর মাধ্যমে। এ বছর অন্তত ২১টি বিখ্যাত সৌন্দর্য ব্র্যান্ড এই উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্মানি বিউটি, ওয়াইএসএল বিউটি, শ্যানেল, ডিওর ও গুচির মতো নাম।
স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে এই উন্নতি।
২২ বছর বয়সী ক্লো লিয়েম একজন গয়না সংগ্রাহক। তিনি কার্টিয়ার এবং ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস-এর মতো রিচমন্ট এসএ ব্র্যান্ডের গয়নার ভক্ত।

তিনি বলেন, “আমি জানি বিলাসবহুল জিনিসের দাম অনেক বেশি। কিন্তু আমি শুধু পণ্যটি নয়, বরং তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির জন্য অর্থ খরচ করি। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এসব জিনিস কিনি, কারণ এতে আমি আনন্দ পাই।”
সব মিলিয়ে বলা যায় সিঙ্গাপুর এখন আর কেবল বিলাসপণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র নয়। এটি ধনীদের আস্থা অর্জনের কেন্দ্র, ভোক্তা অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের স্থান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক কৌশলগত দুয়ার।
তথ্যসূত্র : ব্লুমবার্গ



