Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ডলারের বাজার হঠাৎ অস্থির

SS-US-dollars-120824
[publishpress_authors_box]

ডলারের বাজার হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠেছে; প্রতিদিনই বাড়ছে দর। আর এতে কমছে টাকার মান; শক্তিশালী হচ্ছে ডলার।

সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা; সর্বনিম্ন ১২২ টাকা ১০ পয়সা। আর গড় দাম ছিল ১২২ টাকা ৪০ পয়সা।

আগের দিন বুধবার (২২ অক্টোবর) সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২২ টাকা ২৫ পয়সা; সর্বনিম্ন ১২২ টাকা। গড় দাম ছিল ১২২ টাকা ০৬ পয়সা।

এক সপ্তাহ আগে ১৬ অক্টোবর ডলারের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১২১ টাকা ৮৬ পয়সা; সর্বনিম্ন ১২১ টাকা ৮০ পয়সা। গড় দাম ছিল ১২১ টাকা ৮৪ পয়সা।

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহের ব্যবধানে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মুদ্রা মার্কিন ডলারের দাম বেড়েছে ৫৬ পয়সা। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে দশমিক ৪৬ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ বেড়েছে। এতে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। সে কারণেই দাম বাড়ছে। এছাড়া দাম ধরে রাখতে নিলামে ডলার কিনেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এটাও ডলারের দর বাড়ার একটি কারণ বলে জানিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে পণ্য আমদানির জন্য সব মিলিয়ে ৬৩০ কোটি (৬.৩০ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। আগের মাস আগস্টে এই অঙ্ক ছিল ৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। শতাংশ হিসাবে বেড়েছে ১৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এদিকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর বাড়ায় ব্যাংকগুলোতেও দাম বেড়েছে। খোলা বাজারেও (কার্ব মার্কেট) বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ১২৩ টাকা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২২ টাকায়। বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২২ টাকা ৫০ পয়সা দরে। সিটি ব্যাংক ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে; কিনেছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার খোলা বাজারে ১২৫ টাকা ২০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এই দর ছিল ১২৪ টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মতিঝিলের এক ডলার ব্যবসায়ী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “হঠাৎ করেই ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। সে কারণেই দাম বেড়েছে।” 

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, “ডলার দরে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাই এখনই এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।”

এদিকে হঠাৎ করে ডলারের এই দরবৃদ্ধির কোনও সুর্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।

তিনি বলেন, “এটা চাহিদা এবং সরবরাহের অসামাঞ্জস্যতা ছাড়া আর কিছু বলে মনে হচ্ছে না। ডলারের বাজার অনেক দিন ধরেই স্থিতিশীল ছিল। অনেক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রি করেছে, যাতে তাদের অবস্থান কমবেশি নিরাপদ থাকে।

“অন্যদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহে সাধারণত মাসের ১৮ থেকে ২৫ তারেখের মধ্যে কিছুটা ধীরগতি দেখা দেয়। গত সপ্তাহে কিছু আমদানিকারক তাদের এলসির বিপরীতে কিছুটা আগেই পাওনা পরিশোধ করেছেন।”

“আশা করা হচ্ছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ডলারের বাজার আগের অবস্থানে ফিরে আসবে এবং দর আগের মতো ১২২ টাকায় স্থিতিশীল হবে। আমাদের চলতি হিসাব এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে। দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই,” বলেন মাসরুর আরেফিন।

মাসে ২.১৩ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

দাম ধরে রাখতে নিলামে ডলার কিনেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবশেষ গত ১৪ অক্টোবর ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। তার আগে ৯ অক্টোবর) কেনা হয়েছিল ১০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

এ নিয়ে তিন মাসে ১৫ দফায় সব মিলিয়ে ২১২ কোটি ৬০ লাখ (২.১৩ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত ডলার কেনা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনও উপায় নেই। কেননা, বাজারে এখন ডলারের সরবরাহ বেশি। এ অবস্থায় না কিনলে ডলারের দর কমে যাবে। তাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

“তবে, এটাও ঠিক যে, ডলার কেনার কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। তারপরও আমি বলব- অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই দুই সূচকের উর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক কাজটি করছে।”

“চাহিদা বাড়ায় ডলারের দর বেড়েছে। আমার মনে হয়, আর খুব বেশি বাড়বে না। কেননা, রপ্তানি আয়ে ধীরগতি দেখা দিলেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের উল্লম্ফন অব্যাহত আছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্য পণ্য আমদানিও বাড়বে না। সন্তোষজনক রিজার্ভ (বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন) আছে। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই,” বলেন জাহিদ হোসেন।

মুদ্রাবাজারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার পর ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ১৩ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে অর্থাৎ ডলারের দর যাতে কমে না যায় সেজন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

আরিফ খান বলেন, “ডলার দর বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য ভালো নয়, আবার কমে যাওয়াও ভালো নয়। তাই এ বাজারকে ‘সুস্থির’ রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামে ডলার কিনছে। তাতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে।”

রিজার্ভ : মাসের আমদানি মেটানো যাবে

অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই। অভ্যুত্থানের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও উদ্বেগ কাটছিল না।

তবে বছর পার হওয়ার পর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় এবং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তার ঋণে রিজার্ভ স্বস্তির জায়গায় এসেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার কারণেও রিজার্ভ বেড়েছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে আকুর জুলাই-আগস্ট মেয়াদের ১৫০ কোটি (১.৫০ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৫ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, গ্রস বা মোট হিসাবে ছিল ৩০ দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলার।

গত দেড় মাসে সেই রিজার্ভ বেশ খানিকটা বেড়েছে। গত বুধবার (২২ অক্টোবর) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসাবে দেখায়।

সবশেষ গত আগস্ট মাসের আমদানির তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তাতে দেখা যায় যে ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

সে হিসাবে বর্তমানের ২৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।

২০২৩ সালের ১২ জুলাই থেকে আইএমএফের কথা মতো রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রস হিসাবের পাশাপাশি বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসরণ করেও রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ওই দিন বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৯ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।

১২ জুলাইয়ের আগে শুধু গ্রস হিসাবের রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করত বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১ সালের আগস্টে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল, তা গ্রস হিসাবেই।

রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয়। এছাড়াও বিদেশি ঋণ ও অনুদান (যেমন- বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ঋণ-সহায়তা) এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

রিজার্ভের এই উৎসগুলোর মধ্যে রেমিটেন্স ছাড়া অন্যান্য সূচক এখন ভালো নেই। আগস্টের পর সেপ্টেম্বর মাসেও রপ্তানি আয় কমেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৬২ কোটি ৭৫ লাখ (৩.৬২ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।

এই আয় পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। আর গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে কম ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই মাসে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

উন্নয়ন সংস্থাগুলো থেকে ঋণ-সহায়তাও তেমন আসছে না। এফডিআইও আশানুরূপ নয়।

এখন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ যেটা বাড়ছে সেটা মূলত ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা ডলার ও রেমিটেন্স বৃদ্ধির কারণেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা ৭৫৮ কোটি ৫৬ লাখ (৭.৫৮ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি।

চলতি অক্টোবর মাসেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই মাসের ২২দিনে (১ থেকে ২২ অক্টোবর) ১৯২ কোটি ১০ লাখ (১.৯২ বিলিয়ন) ডলার দেশে এসেছে, যা গত বছরের অক্টোবর মাসের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found