চলছে তাপপ্রবাহ, থার্মোমিটারে পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে, জনজীবনে উঠেছে নাভিঃশ্বাস। এই অবস্থা এখন ইউরোপের দক্ষিণাংশের।
চলমান এই তীব্র তাপপ্রবাহ শুধু যে স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করছে, তা নয়; দাবানলের বড় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে সতর্কতা জারি করেছে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ।
এই তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত এখন ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিসের মতো দেশগুলো।
পর্তুগাল থেকে তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তাপপ্রবাহের অবস্থান আরও দেশকে ভোগাবে বলে সতর্ক করছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে সপ্তাহ শেষে কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের আভাস স্বস্তির খবর দিচ্ছে।
গবেষকরা এই তাপপ্রবাহের তীব্রতাকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসাবে দেখছেন। তারা সতর্ক করেছেন, এমন চরম আবহাওয়া ভবিষ্যতে সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
৪০ ডিগ্রিতে হাঁসফাঁস
পর্তুগালের দুই-তৃতীয়াংশ রবিবার চরম তাপ ও দাবানলের জন্য উচ্চ সতর্কতায় ছিল। তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠতে পারে বলে আভাস আসার পর সোমবার কর্তৃপক্ষ সাতটি জেলায় রেড এলার্ট জারি করে। দেশটির প্রায় সব অঞ্চলই দাবানলের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইতালিতে ২১টি শহরে এখন রেড এলার্ট। এই উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশটির উত্তর-পশ্চিম লিগুরিয়া এবং দক্ষিণের সিসিলিতে নির্মাণ ও কৃষি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের কাজ করানোর ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
রোমে কলোসিয়ামসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে। মিলান ও নেপলসেও একই অবস্থা। রাস্তার লেবুর শরবতর বিক্রি গেছে বেড়ে।
ফ্রান্সে কর্তৃপক্ষ গৃহহীন, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্রমজীবী মানুষদের তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটিতে যাওয়া অনেক পর্যটক তাদের ঘোরার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে যাওয়া অ্যান্ড্রিয়া টাইসন (৪৬) ইউরো নিউজকে বলেন, “আমাদের একটি বাইক ট্যুরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এত গরম যে তা আর হবে না।”
প্যারিসেও স্যেন নদীর ধারে মানুষকে গা ভিজিয়ে নিতে দেখা যাচ্ছে।

স্পেনে প্রচণ্ড গরমে পর্যটকদের পানির খোঁজে মরিয়া চেষ্টা দেখা গেছে। দেশটির দক্ষিণের শহর সেভিয়ায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছে। স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের এল গ্রানাদো শহরে তাপমাত্রা উঠেছে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। দেশটিতে জুন মাসের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।
দক্ষিণ জার্মানিতে সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তা আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সোমবার তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়সে ওঠার আভাস ছিল। তা ঘটলে এটা হবে দেশটিতে বছরের উষ্ণতম দিন।
দাবানলের উচ্চ সতর্কতা
গ্রীষ্মের প্রথম তাপপ্রবাহ সপ্তাহজুড়ে অব্যাহত থাকবে বলে গ্রিসে দাবানলের উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এথেন্সের দক্ষিণে একটি দাবানল সৃষ্টি হয়, যাতে পসাইডন মন্দিরের কাছে লোকজনকে সরিয়ে নিতে এবং রাস্তা বন্ধ করতে বাধ্য করে।
কর্তৃপক্ষ আগুন নেভানোর জন্য ১৩০ জন দমকলকর্মী, ১২টি বিমান ও ১২টি হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। পুলিশ ৪০ জনকে সরিয়ে নিয়েছে। পাঁচটি এলাকা খালি করে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের মৌসুমের প্রথম দাবানল দেখা দিয়েছে রবি ও সোমবার দক্ষিণের আউদে অঞ্চলে প্রায় ৪০০ হেক্টর বন এলাকায়। আগুন নেভাতে বিমান এবং প্রায় ৩০০ জন দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে পর্যটকদের।
তুরস্কে বনের আগুনে ইজমির অঞ্চলে কিছু অবকাশ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সতর্কতা হিসেবে চারটি গ্রাম খালি করেছে।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, তীব্র তাপপ্রবাহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। বয়স্ক ও শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দিনে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে, বলা হয়েছে বেশি করে পানি পান করতে।
গত বছর ল্যান্সেটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপদাহে মৃত্যু বেড়ে যাওয়া নিয়ে সতর্ক করা হয়। তাতে বলা হয়, এই অবস্থা চলতে থাকলে এই শতকের মাঝামাঝিতে তাপদাহে মৃত্যু চার গুণেরও বেশি বাড়তে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস স্পেন থেকে সোশাল মিডিয়ায় এক পোস্টে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরও ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এখন আর কোনও দেশই সুরক্ষিত নয়।
তথ্যসূত্র : ইউরোনিউজ



