জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের অপসারণ এবং সংস্থাটি বিলুপ্তির অধ্যাদেশ সংস্কার দাবিতে রবিবারও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচি চলবে জানিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
শনিবার সকাল থেকে এই কর্মসূচি পালনের পর দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সভাপতি হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার।
তবে আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা এই কর্মসূচির বাইরে থাকবে বলে জানান তিনি। এসময় সমস্যা সমাধানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তারই ধারায় গত ১২ মে এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি বিভাগ তৈরি করে।
আগের দপ্তর বিলুপ্ত করে নতুন দপ্তর গঠন করে সরকারের জারি করা সেই অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে গত ১৪ মে ‘কলম বিরতি’ কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন শুরু করে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।
ফলে পুরো রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এরই একপর্যায়ে ২৫ মে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআর বিলুপ্ত না করে ওই অধ্যাদেশে সংশোধনী আনার আশ্বাসে বাজেটের চলমান কাজ নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে আন্দোলন স্থগিত করে ঐক্য পরিষদ।
সেই আন্দোলন স্থগিতের ২৮ দিন পর এনবিআর চেয়ারম্যানের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের নিপীড়নমূলক বদলির আদেশ দেওয়া এবং অধ্যাদেশ সংশোধনের জন্য কমিটিতে সংস্কার ঐক্য পরিষদের কোনও প্রতিনিধি না রাখার প্রতিবাদে আবারও আন্দোলনে নামে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের সাথে আলোচনা করতে চায় এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। তবে তার আগে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানকে অপসারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশ ও রাজস্বের স্বার্থে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে সংস্কার কার্যক্রম ও এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের যৌক্তিকতা জানাতে যেকোনো সময় অর্থ উপদেষ্টার সাথে আলোচনায় বসতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
“কিন্তু আমাদের এ ধরনের আহ্বান সত্ত্বেও অর্থ উপদেষ্টার দপ্তর থেকে আজ পর্যন্ত আলোচনার জন্য কোনও সুস্পষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে এনবিআর সংস্কার নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করছি আমরা।”
শনিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে এনবিআরের প্রধান কার্যালয়সহ সারাদেশের রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাইজ, বেনাপোল বন্দরসহ সব স্থলবন্দরগুলোও আমদানি-রপ্তানি সেবা বন্ধ ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন দাবি করে ঐক্য পরিষদের সভাপতি বলেন, গত ২১ ও ২২ জুন একাধিক আদেশের মাধ্যমে রাজস্ব সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিহিংসা ও নিপীড়নমূলকভাবে বদলি করা হয়েছে। কর্মসূচিতে সম্মুখসারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন পাঁচ আয়কর কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত কম রাজস্ব সম্ভাবনাময় দপ্তরে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। এমনকি আদেশে প্রাপ্য যোগদানকাল না দিয়েই পরবর্তী কর্মদিবসে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগদান করতে বলা হয়, যা চাকরিবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও অবৈধ।”
এই বদলির আদেশ অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই অবৈধ আদেশ এনবিআর চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত জিঘাংসা চরিতার্থ করার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।
“যৌক্তিক কর্মসূচিতে থাকা কর্মকর্তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে উস্কে দিয়ে তিনি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চান। তার এই কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দূরভিসন্ধিমূলক।”
কমপ্লিট শাটডাউনের প্রথম দিন
শনিবার কমপ্লিট শাটডাউন ও লংমার্চ টু এনবিআর কর্মসূচির প্রথম দিন এনবিআরের প্রধান কার্যালয় রাজস্ব ভবনের মূল ফটক সকালেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভেতরে অবস্থান নেন। কিছু কর্মকর্তা আইডি কার্ড দেখিয়ে কার্যালয়ে ঢুকতে পারলেও পরে আর কাউকে ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হয়নি। এর ফলে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এনবিআর ভবন।
এনবিআরের প্রধান দুই ফটকের সামনে ফুটপাত এবং প্রধান সড়কের একাংশ জুড়ে আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবস্থান নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন স্লোগান দেন।
সারাদেশ প্রভাব
শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তর থেকেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। এতে চট্টগ্রাম বন্দর ও বেনাপোল ভোমরা স্থলবন্দরসহ সারাদেশের সকল বন্দর প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
এই শাটডাউনের কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুল্ক ও ভ্যাট সংক্রান্ত কাজ বন্ধ থাকায় বন্দরে পণ্য খালাস আটকে আছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের এই কর্মসূটির কারণে ব্যবসায়ীরা দৈনিক ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএসহ ১৩টি শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন শনিবার হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে। সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ অন্য ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এই ১৩ ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (আইসিসিবি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি) এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদ হাসান খান এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি সমর্থন করেন না বলে জানান। তবে একটি দক্ষ ও হয়রানিমুক্ত এনবিআর প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্থাটির সংস্কারের পক্ষে তার জোরাল অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, “এই আন্দোলনের কারণে আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। দ্রুত এর সমাধান হওয়া উচিত।”
মাহমুদ হাসান খান আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কাজে ফেরার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন।
সম্মেলনে অন্য ব্যবসায়ী নেতারাও এই অচলাবস্থার কারণে দেশের অর্থনীতিতে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।



