নগদ রয়েছে জটিলতায়; তাতে দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেনের প্রকৃত হিসাবও গেছে আটকে।
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও গ্রাহকের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত এপ্রিল মাসের তথ্যে দেখা যায়, ওই মাসে মোবাইলে ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ১১৫।
আগের মাস মার্চে লেনদেনের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৩৬ লাখ ২৭ হাজার ২৮।
একক মাসের হিসাবে মার্চের লেনদেন ছিল অতীতের যেকোনো মাসের চেয়ে বেশি। এর আগে চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারি লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮০ কোটি টাকা। গ্রাহক ছিল ২৪ কোটি ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৪।
মার্চ ও এপ্রিলে গ্রাহক সংখ্যা এক ধাক্কায় ১০ কোটির মতো কমলো কেন— এ প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) পরিচালক রাফেজা আক্তার কান্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, নগদ তাদের লেনদেন ও গ্রাহক সংখ্যার তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বলেই এই ফারাক।
“গত মার্চ ও এপ্রিল মাসের তথ্য তারা দেয়নি। নগদের তথ্য বাদ দিয়েই আমরা বাকি অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানের লেনেদন ও গ্রাহক সংখ্যা প্রকাশ করেছি।”
সে কারণেই মার্চ ও এপ্রিল মাসে লেনদেন ও গ্রাহক সংখ্যা কমেছে বলে জানান তিনি।
নগদ ছাড়াও দেশে এমএফএস প্রতিষ্ঠান রয়েছে বিকাশ, রকেট, উপায়, এম ক্যাশ, মাই ক্যাশ, ট্যাপসহ মোট ১২টি।
গ্রাহক সংখ্যা ১০ কোটি কমলেও মার্চে লেনদেনে রেকর্ড হয়েছিল কেন— এ প্রশ্নের উত্তরে কান্তা বলেন, “রোজার ঈদের কারণে মার্চে লেনদেন অনেক বেশি হয়েছিল। দুই ঈদকে কেন্দ্র করে সবসময়ই মোবাইলে লেনদেন বাড়ে। নগদের লেনদেনের তথ্য যোগ হলে মার্চে মোট লেনদেনের ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতো।”
এমএফএসগুলোকে প্রতি মাসের লেনদেন ও গ্রাহক সংখ্যার তথ্য পরবর্তী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই তথ্য তাদের ওবেসাইটে প্রকাশ করত।
কিন্তু নগদ ফেব্রুয়ারির পর কোনও তথ্য না পাঠানোয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তাদের তথ্য নেই। সেখানে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে নগদ লেনদেন ও গ্রাহকের তথ্য পাঠায়নি।
কেন পাঠানো হয়নি— এ প্রশ্নের উত্তরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগদের এক কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “জানেনই তো ভাই, আমাদের ম্যানেজমেন্টের ভেতরে বেশ ঝামেলা চলছে; আমরা সবাই আতঙ্কের মধ্যে আছি কখন চাকরি চলে যায়। সে কারণে কোনও মন্তব্য করতে পারব না।
“তবে যেটা মনে হচ্ছে, গত কয়েক মাস ধরে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে যে জটিলতা হচ্ছে, সে কারণেই হয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে লেনদেন ও গ্রাহকের হিসাব জানানো হয়নি।”
‘৯ কোটির গ্রাহক নিয়ে নগদ পরিবার’
নগদের ওয়েবসাইট খুললেই দেখা যায়, ‘৯ কোটির গ্রাহক নিয়ে নগদ পরিবার’। তাতে আরও লেখা আছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নগদ দারুণ সব রেকর্ডের মাইলফলক স্থাপন করেছে। মাত্র ৫ বছরে প্রায় ৯ কোটি লাখ গ্রাহক, ৩ লাখ উদ্যোক্তা এবং দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা লেনদেনের রেকর্ড অর্জন করেছে নগদ।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক বদিউজ্জামানকে প্রশাসক করা হয়।
তিনি প্রশাসক থাকা অবস্থায় নগদে অনিয়মের নানা অভিযোগের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সেই অভিযানের দিন বদিউজ্জামানের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।
এর ১৫ দিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক মোতাছিম বিল্লাহকে নতুন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এরপর প্রশাসক বসানো নিয়ে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ে নামে মোবাইলে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি।
এর মধ্যে নগদ গত ১৩ মে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত নগদে প্রশাসক নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেছে। এর ধারাবাহিকতায় নগদের সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) হিসেবে যোগ দেন সাফায়েত আলম।
নগদের যাত্রার শুরু থেকেই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত আছেন সাফায়েত আলম। গত পাঁচ বছর তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
সবশেষ গত ২ জুন ঈদের ছুটির আগে নগদে প্রশাসকের কার্যক্রমের ওপর দেওয়া স্থগিতাদেশ স্থগিত করে আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
এর ফলে নগদে প্রশাসকের কাজ চালিয়ে যেতে কোনও বাধা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কৌঁসুলি বি এম ইলিয়াস কচি।
তিনি বলেন, “চেম্বার আদালতের আদেশ স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। এর ফলে নগদে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত বহাল থাকল। প্রশাসকের কার্যক্রম পরিচালনায় আইনগত কোনও বাধা নেই।”
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা কোম্পানি হিসেবে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে নগদ। পরে এ এমএফএস কোম্পানিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
প্রশাসক নিয়োগের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ডাক অধিদপ্তর নগদ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করার লক্ষ্যে ৫ সদস্যের একটি ম্যানেজমেন্ট বোর্ড গঠন করে। এই ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হচ্ছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ।
সদস্যরা হলেন- খন্দকার সাখাওয়াত আলী (ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়), বজলুল হক খন্দকার (গবেষণা পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট- পিআরআই), আনোয়ার হোসেন (সাবেক নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংক) এবং ফরিদ আহমেদ (পোস্টমাস্টার জেনারেল, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ)।
ব্যাংকিং সেবায় বৈপ্লবিক এক পরিবর্তন এনেছে মোবাইল ব্যাংকিং। কেবল টাকা পাঠানোই নয়, দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছে মোবাইল ব্যাংকিং। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ সেবামূল্য পরিশোধ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো অর্থাৎ প্রবাসী-আয় বা রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এখন অন্যতম পছন্দের মাধ্যম। এই সেবার কারণে বেড়েছে নতুন কর্মসংস্থান।
সব মিলে হাতের মোবাইল ফোনেই এখন ব্যাংক। হাতে থাকা মোবাইল ফোনটিই হয়ে উঠেছে সব ধরনের লেনদেনের অপরিহার্য মাধ্যম। এসব লেনদেনের হিসাব খুলতে কোথাও যেতে হয় না। গ্রাহক নিজেই অনায়াসে নিজের হিসাব খুলে লেনদেন করতে পারছেন।
মোবাইল ফোনের সাহায্যে অন্যকে টাকা পাঠানো, মোবাইল রিচার্জ, বিভিন্ন পরিষেবা ও কেনাকাটার বিল পরিশোধ, টিকেট কেনাসহ কত সেবা যে মিলছে, তা এক দমে বলা খুবই কঠিন। সব মিলিয়ে বিকাশ, রকেট, নগদ ও উপায়ের মতো মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে আর্থিক স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে।
যেভাবে বেড়েছে লেনদেনের অঙ্ক
গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের শেষ মাস জুনে মোবাইলে লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৩ টাকা। ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তা কমে ১ লাখ ২২ হাজার ৯২২ কোটি টাকায় নেমে আসে।
পরের মাস আগস্টে লেনদেন বেড়ে হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লেনদেন হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। অক্টোবরে বেড়ে হয় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। নভেম্বর মাসে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।
গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে লেনদেনের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মোবাইল ফোনে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮০ কোটি টাকায় নেমে আসে।
২০২৪ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে মোবাইলে লেনদেনের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে লেনদেন হয় ১ লাখ ৩০ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। মার্চে লেনদেনের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
এপ্রিল ও মে মাসে লেনদেন হয় যথাক্রমে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৯ কোটি ও ১ লাখ ৪০ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালের শেষ মাস ডিসেম্বরে লেনদেনের অঙ্ক ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা; নভেম্বরে হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
তার আগের মাস অক্টোবরে এক লাখ ২০ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়। সেপ্টেম্বরে লেনদেন হয় এক লাখ ৮ হাজার ৩৭৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। আগস্টে লেনদেনের অঙ্ক ছিল এক লাখ ৯ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থ বছরের শেষ চার মাসেই (মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুন) মোবাইলে লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথম মাস জুলাইয়ে তা কমে লাখ কোটি টাকার নিচে, ৯৮ হাজার ৩০৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। এরপর থেকে প্রতি মাসেই লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোবাইলে লেনদেন হয়েছিল ৩২ হাজার ১১৬ কোটি টাকা।
এভাবেই বাংলাদেশে মোবাইলে আর্থিক সেবা বা এমএফএস ব্যবহার প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত গতিতে বাড়ছে।
গ্রাহক বেড়েছে যেভাবে
মোবাইল লেনদেনে গ্রাহক সংখ্যাও বেড়ে চলেছে একই গতিতে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মোট গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ৪৬৮। গত ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৪ কোটি ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৪ এ দাঁড়ায়। জানুয়ারিতে ছিল ২৩ লাখ ৯৩ লাখ ২ হাজার ৯৯১।
গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ২৩ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৫৩। নভেম্বরে ছিল ২৩ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার ৫১৫। অক্টোবর ছিল ২৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪ হাজার ৭১৩। সেপ্টেম্বরে ২৩ কোটি ৩৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫২৩।
একজন গ্রাহক একাধিক এমএফএস সেবায় হিসাব খুলতে পারেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ঠিক কত নাগরিক এমএফএসের আওতায় এসেছেন, তা বলা যাচ্ছে না। তবে প্রতিটি পরিবারেই সেবাটি পৌঁছে গেছে, এটা বলা যায়।



