আবারও আলোচনায় নোবেল এবং এবারও গানের জন্য নয়। এক টিভি রিয়ালিটি শোতে গান গেয়ে প্রচারে এলেও অনিয়ন্ত্রিত জীবনের জন্য বারবার আলোচনায় আসছেন তিনি।
মঙ্গলবার ভোররাতে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে তিনি। এটাও এই প্রথম নয়, দুই বছর আগেও কিছু দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে।
পার্থক্য এটুকু যে সেবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অর্থ নিয়ে এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে না যাওয়ায়; এবার গ্রেপ্তার হলেন এক তরুণীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগে।
নোবেল অবশ্য দাবি করেছেন, ওই তরুণী তার স্ত্রী; কিন্তু বিয়ের কোনও প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি বলে জানায় পুলিশ।
ওই তরুণীর বাবা-মা ‘৯৯৯’ এ ফোন করার পর সোমবার রাতে ঢাকার ডেমরার সারুলিয়ার বাসা থেকে নোবেলকে গ্রেপ্তার এবং ওই তরুণীকে উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ইডেন কলেজের ওই ছাত্রীকে সাত মাস আগে মোহাম্মদপুর থেকে তুলে সারুলিয়ায় নিজের বাসায় নিয়ে যান নোবেল। তাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিয়ে করেননি। বরং জোর করে তাকে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করতেন। তা আবার ভিডিও করে ব্ল্যাকমেইল করতেন।
সম্প্রতি নিজের বাসার সিঁড়ি দিয়ে ওই তরুণীকে নোবেলের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় আসে। ওই ভিডিও দেখে ওই তরুণীর বাবা-মা নিজেদের মেয়েকে চিনতে পেরে সোমবার রাতে জাতীয় জরুরি সেবার হটলাইনে ফোন করেন।
ডেমরা থানার পুলিশ পরিদর্শক মুরাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ওই ফোন পেয়ে সারুলিয়ায় নোবেলের বাসা থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করেন তারা। তবে নোবেল বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে রাত ২টার দিকে পাশের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকা থেকে নোবেলকে গ্রেপ্তার করে তারা।
এর পর ওই তরুণী নোবেলের বিরুদ্ধে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করলে তা তদন্তের দায়িত্ব পান মুরাদ। তিনি মঙ্গলবার সকালে নোবেলকে ঢাকার আদালতে নিয়ে তাকে কারাগারে রাখার আবেদন জানান।

নোবেলের পক্ষে তার আইনজীবী জসিম উদ্দিন জামিন চেয়ে আদালতে বলেন, মামলার ঘটনা গত বছরের ১২ নভেম্বর। আর বাদী আসামির স্ত্রী। গতরাত পর্যন্ত তারা একই বাসায় ছিলেন। ভুল বোঝাবুঝিতে মামলা হয়েছে। নোবেল তার সঙ্গে সংসার করতে চায়।
এসময় বিচারক কাবিননামা চাইলে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, তাড়াহুড়ার কারণে কাবিননামাটা আনা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, বাদী ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের পরিচয়। পরে ফোনে কথাবার্তা হয়। গত বছরের ১২ নভেম্বর তাদের দেখা হয়।
“আসামি বাদীকে তার ডেমরার স্টুডিওতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে আটকে রাখে। ২/৩ জনের সহায়তায় তাকে ধর্ষণ করে, মারধর করে।”
এসময় বিচারক জানতে চান, ঘটনার পাঁচ মাস পর মামলা কেন?
আদালত পুলিশের কর্মকর্তা এসআই ইলা মনি তখন বলেন, “ভিকটিমকে আটকে রাখত। কারও সাথে যোগাযোগ করতে দিত না। একটা ভিডিও দেখে তার পরিবার। পরে এসে তাকে উদ্ধার করে।”
শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম জিয়া উদ্দিন আহমেদ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে নোবেলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
২৮ বছর বয়সী নোবেলের পুরো নাম মাইনুল আহসান নোবেল। তিনি ‘নোবল ম্যান’ নামে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন। গোপালগঞ্জের ছেলে নোবেলের শৈশব, কৈশোর কেটেছে ঢাকা, খুলনা মিলিয়ে।
ছয় বছর আগে ২০১৯ সালে ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলার রিয়্যালিটি শো ‘সা রে গা মা পা’তে নাম লিখিয়ে টিভি দর্শকদের চেনামুখ হয়ে ওঠেন নোবেল। বাংলাদেশের প্রতিযোগী বলে এই দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন কুড়ান তিনি, সেই সঙ্গে তার গায়কী পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদেরও প্রশংসা পায়।
ইতিবাচক শুরুর পর নেতিবাচক একের পর এক ঘটনায় আলোচনায় আসতে থাকেন নোবেল; কখনও বিয়ে করে, কখনও বিতর্কিত মন্তব্য করে, কখনও প্রতারণা করে। গান ছাপিয়ে তার এসব কাণ্ড-কীর্তির মূলে মাদকাসক্তিই বলে দাবি করে আসছেন তার সােবক স্ত্রী সালসাবিল।

নোবেলকে নিয়ে বিতর্ক ‘সা রে গা মা পা’র মঞ্চ থেকেই শুরু। তিনি যখন ওই শোতে গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদের কিছু গান গেয়েছিলেন, তখন প্রিন্স মাহমুদের নাম তিনি মুখে নিতেন না। এনিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছিলেন প্রিন্স মাহমুদ।
এরপর আবার কলকাতার একটি পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের চেয়ে প্রিন্স মাহমুদের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে বেশি ভালো বলে দাবি করেন, যা নিয়ে দুই বাংলাই সমালোচনা শুনতে হয় নোবেলকে।
‘সা রে গা মা পা’র এক বিচারকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর কিছু দিন ওই শো থেকে তাকে বাদ রাখা হয়েছিল। নোবেল তখন এমন দাবিও করেন যে বাংলাদেশের কোনও শিল্পীকেই তার যোগ্য মনে হয় না।
কলকাতার পাট চুকিয়ে ঢাকায় আসার পর ২০২০ সালে ইউটিউবে নিজের গান ‘তামাশা’ প্রকাশ করেন নোবেল। তখন আবার এক ইউটিউবারের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই ইউটিউবারকে তিনি গালাগালি করলে তিনি র্যাবে অভিযোগ দেন। পরে র্যাব কার্যালয়ে গিয়ে ওই ইউটিউবারের কাছে ক্ষমতা চেয়ে আসতে হয়েছিল নোবেলকে।
২০২২ সালে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিরো আলম যখন রবীন্দ্র ও নজরুল সঙ্গীত বিকৃতভাবে গাওয়ার জন্য সমালোচনায় পড়েছিলেন, তখন তার পক্ষে দাঁড়িয়ে নোবেল ফেইসবুকে লেখেন, “রবীন্দ্রনাথ-নজরুল তো আর নবী কিংবা দেবতা না যে তাদের গান প্যারোডি আকারে গাওয়া যাবে না!”
এছাড়াও রবিঠাকুরকে নিয়ে তার কিছু মন্তব্যও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী ইমন চক্রবর্তী তো নোবেলকে কাছে পেলে ‘থাপড়াবেন’ বলেও ঘোষণা দেন।
২০২৩ সালের ২০ মে প্রতারণার এক মামলায় গ্রেপ্তার হন নোবেল। কয়েকদিন কারাগারে থেকে পরে জামিনে ছাড়া পান তিনি।
শরীয়তপুর জেলায় একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার চুক্তি করে অগ্রিম ৭৫ হাজার নিয়েছিলেন নোবেল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়ায় আয়োজকদের একজন ঢাকার হাতিরঝিল থানায় নোবেলের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলাটি করে।
ওই বছরের এপ্রিলে কুড়িগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সময় নোবেলকে মাতলামি করতে দেখা গিয়েছিল। তখন দর্শকদের ছোড়া পানির বোতল আর জুতার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন নোবেল।

গায়ক হিসাবে পরিচিতি পাওয়ার আগেই নিজের এক আত্মীয়কে নোবেল বিয়ে করেছিলেন বলে শোনা যায়। তবে সেই বিয়ে টেকেনি।
২০১৯ সালের ১৫ নভেম্বর মেহরুবা সালসাবিলকে বিয়ে করেন নোবেল। মাঝে-মধ্যেই আলোচনায় আসত তাদের দাম্পত্য কলহ। নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ করতেন সালসাবিল। বেশ কিছুদিন আলাদা থাকার পর ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেলের সঙ্গে দাম্পত্যের ইতি টানেন সালসাবিল।
সালসাবিল অভিযোগ করেন, নোবেল অতিমাত্রায় মাদক সেবন করেন। মাদক সেবন করেই তাকে মারধর করতেন। মাদক থেকে ফেরানোর অনেক চেষ্টা করেও সফল হননি বলে তাকে তালাক দেন তিনি।
সালসাবিলের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ওই বছরই আরেক তরুণীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একাধিক ছবি ফেইসবুকে দেন নোবেল। ওই তরুণীকে নিজের স্ত্রী বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে পরে ওই তরুণী দাবি করেন, নোবেলের সঙ্গে তার কখনও বিয়ে হয়নি। নোবেল তাকে জোর করে ঢাকায় এনে মাদক সেবন করিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে কিছু ছবি তুলে রেখেছিল।
এরপর নোবেলকে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করানোর কথাও শোনা গিয়েছিল। সেখান থেকে আসার পর এখন আবার বিতর্কে জড়িয়ে কারাগারে গেলেন তিনি।



