খেলা শেষ হতেই সতীর্থদের তুমুল করতালি। কিন্তু মারজান আক্তার প্রিয়ার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। মাত্রই জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছেন প্রিয়া। অনূর্ধ্ব-৬৮ কেজি ওজন শ্রেণীতে বাংলাদেশ আনসারের হুমায়রা সুলতানা মিথিকে হারিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রিয়া জিতেছেন সোনার পদক। কিন্তু প্রিয়ার মুখে ছিল না সোনাঝরা হাসি!
থাকবে কি করে? মিরপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোরে এসিবিহীন অবস্থায় চলতে থাকা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জেকে বসেছে ভ্যাপসা গরম। এর ওপর শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা প্রিয়া ম্যাচ শেষেই ছুটলেন অক্সিজেনের খোঁজে। দ্রুতই সতীর্থ খেলোয়াড় ও কোচ মিলে তাকে ইনডোরের এক পাশে নিয়ে বসালেন। গলার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডকে হাতপাখা বানিয়ে বাতাস করতে লাগলেন প্রিয়াকে।
২০১৯ কাঠমান্ডু এসএ গেমসে সোনাজয়ী প্রিয়া ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হবেন এটা যেন জানা কথাই। কিন্তু যখন জানবেন প্রিয়ার রক্তে সংক্রমণ। হার্টে ও ফুসফুসে সমস্যা। এক বছর আগে টিবি (যক্ষা) ধরা পড়ে প্রিয়ার। অনেক কষ্টে কোনওরকম সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে পুরোপুরি সারেনি এই রোগ। এর ওপর প্রচন্ড রকমে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।

খেলার মাঝ পথেও শ্বাসকষ্ট ওঠে। বারবার ইনহেলার নিতে হয়েছে। এরপর কোনও রকমে অনুশীলন শেষে এসে ম্যাটে নেমেছেন। এবং প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী প্রিয়া জিতে নেন জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ক্যারিয়ারের টানা তৃতীয় সোনা। প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই, সেই সঙ্গে নিজের শরীরের সঙ্গেও লড়াই। প্রিয়ার এই সোনার পদকের মাহাত্ম্য তাই অন্য রকম বলতেই হবে।
যেন প্রিয়ার দেহ ক্লান্ত কিন্তু মন নয়। এক বুক শ্বাসকষ্টের সঙ্গে এক বুক সাহস নিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়ে গেছেন। যেন বলছিলেন, যেখানে শ্বাস থামে সেখানেই শুরু করতে হয় লড়াই।
এত শারীরিক সমস্যা নিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। কিন্তু তারপরও শুধু নিজের দলের (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) স্বার্থের কথা বিবেচনা করে খেলতে নামেন প্রিয়া।
সোনা জয়ের পর সেই কথাগুলোই বলছিলেন তিনি, “আমি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছি। আমার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। এত চড়াই উতরাই পরও যে আমরা রেজাল্ট দিতে পারি সেটা এক্সটা অর্ডিনারি পাওয়ার ছাড়া এবং আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত ছাড়া সম্ভব না।”
সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “আমি এবারের ন্যাশনাল খেলতে চাইনি। কিন্তু টিমের স্বার্থে খেলছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমাকে চাকরি দিয়েছে। এসএ গেমসের পর ওরাই আমাকে নার্সিং করেছে। আজ সেনাবাহিনী টিম না থাকলে আমি হারিয়েই যেতাম।”
ছোটবেলাতেই মার্শাল আর্টের প্রতি প্রিয়ার ভালো লাগা তৈরি হয়। ভিকারুননিসায় পড়ার সময় স্কুলে কারাতে শেখার সুযোগ এসে যায়। সেই শুরু। এরপর ক্লাব পর্যায় হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু পেছন ফিরে আজ সবই মিথ্যা মনে হয় তাঁর কাছে। যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি নাকি শুধুই মরীচিকা।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষে সেনাবাহিনীতে অল্প বেতনে চাকরি করছেন। কিন্তু এই সামান্য টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাও সম্ভব না। সংসার চালানো তো দূরের কথা।

প্রিয়া বলেন, “আমি খাওয়ার অভাবে, অর্থনৈতিক সমস্যার অভাবে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেছি। আমি আর খেলতে পারব কিনা জানি না। সম্ভবত এটা আমার শেষ গেম। আমি শ্বাস কষ্ট নিয়ে সেই সকাল থেকে খেলে যাচ্ছি। আমি ইনহেলার ব্যবহার করি প্রতিদিন। আমার জন্য খেলাটা খুব ঝুঁকি হয়ে যায়।”
প্রিয়া তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে, “ আমরা দেশের সম্পদ। কিন্তু এত কষ্ট করেও মাস শেষে মাত্র ২০ হাজার টাকা পাই। এই টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। এই টাকা দিয়ে আবার সাপ্লিমেন্ট খাবার কিনতে হয়, ডায়েট প্লান, কোচকে বেতন দিতে হয়। এত সম্ভব না। আমি ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে কোচের কাছে ট্রেনিং নিই। শিখি। ব্যক্তিগত কোচ যদি না পেতাম এত ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারতাম না। অবশ্যই ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দরকার আমার। সরকার যদি আমার দিকে না তাকাই, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন যদি সহযোগিতা না করে তাহলে আমি তো হারিয়ে যাব। আমার মতো আরও অনেকে হারিয়ে যাবে।”
শ্বাসকষ্টের কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে ক্রিকেট ছেড়ে অবসর নেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী ক্রিকেটার প্রান্তিক নওরোজ নাবিল। একই সমস্যা প্রিয়ারও। কিন্তু প্রিয়া হাল ছাড়তে নারাজ, “ওই ক্রিকেটার ও আমারও এক সমস্যা। আমার এই অবস্থা ২০২০ সাল থেকে শুরু। যদি দেখি অবস্থার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে তাহলে খেলা সম্ভব না। সিএমএএইচে ট্রিটমেন্ট করাচ্ছি। কিন্তু এতেও হচ্ছে না। আমার দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা করা লাগবে। যদি এই চিকিৎসা না করাতে পারি তাহলে আমার পক্ষে খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এসএ গেমসে তো প্রশ্নই আসে না। ন্যাশনালেই খেলতে পারব না।”

খেলতে এসে সংসারের স্বপ্নও ধূসর হয়ে গেছে প্রিয়ার, “ আমার এই শারীরিক অবস্থায় বাবাও না করে দিয়েছে। মাও নিষেধ করেছে। দেখছে দিনকে দিন আমার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমার সংসারজীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আমি হয়তো মাতৃত্বের স্বাদটা নাও গ্রহণ করতে পারি। এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।”
প্রিয়ার ফুসফুসে যুদ্ধ। কিন্তু হৃদয়ে সোনা। তাইতো খেলা শেষে বলছিলেন, “এমনও হতে পারতো আমি এখানে শ্বাসকষ্টে মারাও যেতে পারতাম।”



