ইউরোপ কি পরাধীন? প্রশ্নটি অবান্তর। কিন্তু এখন প্রশ্ন আসবে, জার্মানির হবু চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস কেন বললেন স্বাধীনতার কথা?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেরার পর যেভাবে শুরু করেছেন, তাতে বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ সব যাচ্ছে উল্টে।
ইউক্রেন নিয়ে তার পদক্ষেপে রুষ্ট ইউরোপের নেতারা; তার প্রতিধ্বনিও যেন এল জার্মানিতে নতুন সরকার গঠন করতে যাওয়া রক্ষণশীল দলের নেতা ম্যার্ৎসের কণ্ঠে।
রবিবার ভোটে জেতার পর ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) এই নেতা বলেছেন, ক্ষমতায় বসেই ইউরোপকে শক্তিশালী করার কাজে মনোযোগ দেবেন তিনি। এটাই হবে তার কাজের অগ্রাধিকার। যাতে ইউরোপকে অন্য দেশের হাত থেকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভর করা না লাগে।
স্নায়ুযুদ্ধের কালে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী। তিন যুগ আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও তাদের গাঁটছড়া থাকে অটুট। এখনও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশের মধ্যে ২৯টিই ইউরোপের।
এই ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ থেকেই তিন বছর আগে ইউক্রেন যুদ্ধের সূত্রপাত। প্রতিবেশী দেশটিতে সামরিক অভিযান শুরু করে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। শুরু থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি পেয়ে যাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের সমর্থন।
কিন্তু ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পালাবদলে দৃশ্যপট গেছে পাল্টে। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন তিনি।
এই আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কোনো দেশকে না ডাকায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে ইউরোপের দেশগুেলার কাছ থেকে। তার আগে থেকেই ইউরোপ নিয়ে ট্রাম্পের নানা কথায় চটে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা। এর মধ্যে আবার মিউনিখ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স মোটামুটি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইউরোপকে এখন নিজের পথ নিজের দেখতে হবে।

তার মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ জার্মানিতে রবিবার বুন্ডেসটাগ বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ভোটের ফল দেশটিতে ক্ষমতার পালাবদলও স্পষ্ট করেছে। এতদিন দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল উদারপন্থিদের জোট; এখন আসছে রক্ষণশীল জোট। তার মধ্যে মধ্য বামদের হটিয়ে আবার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে চরম ডানপন্থি দল এএফডি।
সেই নির্বাচনের ফল সরকার গঠনের নিশ্চয়তা না দিলেও সিডিইউ-সিএসইউ জোটই যে অন্য কারও সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করবে, তা মোটামুটি স্পষ্ট, তাতে ম্যার্ৎসেরও পরবর্তী সরকার প্রধান বা চ্যান্সেলর হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
এক সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের দল সিডিইউর নেতা ম্যার্ৎসের কথায়ই এল ইউরোপকে স্বাধীন করার কথা।
ভোটে জয় পাওয়ার পরপরই তিনি এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আমাদের যত দ্রুত সম্ভব ধাপে ধাপে ইউরোপকে শক্তিশালী করতে হবে। এ মুহূর্তে এটাকেই অগ্রাধিকারে রাখছি।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি ম্যার্ৎস। ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্প যেভাবে এগোচ্ছেন, তার সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের পদক্ষেপগুলোর তুলনা দিয়েছেন তিনি।
ম্যার্ৎস বলেন, “ইউক্রেনে রাশিয়ার যে হস্তক্ষেপ আমরা দেখেছি, ওয়াশিংটনের এখনকার পদক্ষেপ তার চেয়ে কম নাটকীয় কিংবা বিপর্যয়কর নয়।
“এ ধরনের কিছু আমাকে টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এসে বলতে হবে, তা কখনও ভাবিনি। কিন্তু গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে স্পষ্ট, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন একটা ভাবে না।”
ন্যাটো জোটের সম্মেলন আগামী জুনের শেষে হওয়ার কথা। এই জোটে জার্মানিও রয়েছে। ইউক্রেনকে এখন আর ন্যাটোতে যুক্ত করতে পক্ষপাতি নন ট্রাম্প। পাশাপাশি ন্যাটোর ব্যয়ের বড় ভার যুক্তরাষ্ট্র আর বহন করতে নারাজ বলেও ইউরোপের দেশগুলোকে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
জুনের বৈঠকের আগ পর্যন্ত ন্যাটোর আদল একই থাকবে কি না, সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন ম্যার্ৎস।
তিনি বলেন, “ন্যাটো সম্মেলনে কী হতে যাচ্ছে, এনিয়ে আমি বেশ কৌতূহলী …. হতে পারে আমাদের দ্রুতই স্বাধীন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”
জার্মানির এবারের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি দল অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ডকে (এএফডি) খোলাখুলি সমর্থন জানিয়েছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ধনকুবের ইলন মাস্ক।
ভোটে এবার না জিতলেও উত্থান ঘটেছে আলিস ভাইডালের দল এএফডির, ২০ শতাংশ ভোট পেয়ে সিডিইউর পরের স্থানে রয়েছে তারা। তবে সরকার গঠনে তাদের সমর্থন নেওয়ার সম্ভাবনা ম্যার্ৎস নাকচ করে দিয়েছেন।
এএফডির প্রতি মাস্কের সমর্থনের প্রসঙ্গ তুলে ম্যার্ৎস বলেন, “আগে মস্কোকে আমাদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে দেখেছি। এবার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা এই দুই দেশ থেকেই ব্যাপক চাপে আছি।”

ইউক্রেনকে দেওয়া এই সহায়তা অব্যাহত রাখতে চান ম্যার্ৎস। তবে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত কিছু বলেননি। যদিও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনে নিজ নিজ দেশের সেনা পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহী।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জার্মানি ইউক্রেনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সহায়তা দানকারী দেশ। প্রথমে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প অবশ্য জার্মানির নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়ে দিনটিকে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্য ‘মহান দিন’ অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের ফলের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, জ্বালানি ও অভিবাসন নিয়ে জার্মানির আগের সরকারের কাণ্ডজ্ঞানহীন নীতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল দেশটির সাধারণ মানুষ।”
ইউরোপ কি একা হাঁটতে চায়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব দৃশ্যত ভাঙতে যাচ্ছে ট্রাম্পের পদক্ষেপে।
সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ থামানো নিয়ে যে কবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, প্রায় প্রতিবারই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি। এমনকি তাকে ‘স্বৈরশাসক’ও বলেন ট্রাম্প।
ন্যাটো নিয়ে না এগিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে অনেকটা একতরফাভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ‘শান্তি’ আলোচনারও আয়োজন করেন তিনি।
ফলে এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করেন ম্যার্ৎস।
নির্বাচনের আগে গত শুক্রবার ম্যার্ৎস বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর এখনই সময়। সহযোগিতা বাড়লে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা থেকে ইউরোপকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র এতদিন ধরে যে নিশ্চয়তা দিয়ে আসছিল, তার আর প্রয়োজন পড়বে না।
তবে জার্মানির হবু সরকার প্রধান ম্যার্ৎস যতই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে প্রতিরক্ষা নির্ভরশীলতা দূর করার কথা বলছেন, ইউরোপে তার দুই মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এখনও তেমনটা ভাবছে না।
বরং সোমবার প্রতিরক্ষা বিষয়ে কথা বলতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। এর দুদিন পর বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে যাবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, পলিটিকো



