সিনেমার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাজেট খরচ হয়েছে মাত্র পাঁচটি গানের দৃশ্যায়নে। আর এটিই হয়তো ‘গেম চেঞ্জার’ সিনেমার ভরাডুবির কারণ। অন্তত তেমনটাই দাবি ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টদের।
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল পরিচালক এস. শঙ্কর এবং জনপ্রিয় অভিনেতা রাম চরণের যুগলবন্দিতে তৈরি ‘গেম চেঞ্জার’ সিনেমাটি মুক্তির আগেই বক্স অফিস হিট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
শঙ্করের তেলুগু অভিষেক এবং ‘আরআরআর’ সিনেমার সাফল্যের পর রাম চরণের প্রথম একক ছবি হিসেবে এটি প্রত্যাশার পারদ বাড়িয়েছিল। কিন্তু, জানুয়ারির ১০ তারিখে মুক্তির পর সিনেমাটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে, যা ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য ২০২৫ সালের শুরুতেই একটি ছিল একটি ধাক্কা।
পরিচালক শঙ্কর তার ভিজ্যুয়াল স্টাইল, সামাজিক বার্তা এবং বাণিজ্যিক সাফল্যের জন্য পরিচিত। তার পরিচালিত বক্স অফিস হিট সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘এন্থিরান’ (২০১০) এবং ‘২.০’ (২০১৮) অন্যতম।
অন্যদিকে ‘মাগাধীরা’ (২০০৯), ‘রাঙ্গাস্থালাম’ (২০১৮), এবং ‘আরআরআর’ (২০২২) এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিয়েছেন রাম চরণ। তার প্যান-ইন্ডিয়ান তারকাখ্যাতি এই সিনেমার সাফল্যের ব্যাপারে প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল।
‘গেম চেঞ্জার’ মুক্তির প্রথম দিনে সব ভাষা মিলিয়ে ৫১ কোটি রুপি আয় করে একটি শক্তিশালী সূচনা করেছিল, যার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তেলুগু সংস্করণ।
তবে, দ্বিতীয় দিন থেকেই ছবির আয় দ্রুত কমতে শুরু করে। দ্বিতীয় দিনে আয় ছিল মাত্র ২১ কোটি রুপি। শেষ পর্যন্ত, ভারতে ছবিটির মোট আয় ছিল ১৩১ কোটি রুপি, যার মধ্যে ৮৯ কোটি রুপি আসে তেলুগু সংস্করণ থেকে।
ছবিটির প্যান-ইন্ডিয়ান লক্ষ্য ব্যর্থ হয়। হিন্দিভাষী অঞ্চলে ব্যাপক প্রচার সত্ত্বেও, হিন্দি সংস্করণটি সারা ভারতে মাত্র ৩২ কোটি রুপি আয় করে। নায়ক শঙ্করের নিজের রাজ্য তামিলনাড়ুতেও তামিল সংস্করণটি মাত্র ৮ কোটি ৩০ লাখ রুপি আয় করে।
বিদেশের বাজারেও ‘গেম চেঞ্জার’ সিনেমাটির আয় ছিল হতাশাজনক- প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার (৩০ কোটি রুপি)। পাঁচ সপ্তাহের দৌড়ের পর ছবির বিশ্বব্যাপী মোট আয় ১৮৬ কোটি রুপি আয় করতে পারে, যা একটি বিশাল বাজেটের প্যান-ইন্ডিয়ান মুক্তির জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
সিনেমাটি ব্যর্থতায় বড় বাজেটের পাশাপাশি গল্পের দুর্বলতার কথা বলছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গেম চেঞ্জার’- এর বাজেট ছিল প্রায় ৪০০ কোটি রুপি। কেউ কেউ বলছিলেন- এটির নির্মাণের খরচ ৫০০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল সিনেমার গানের জন্য ব্যয়।
প্রযোজক দিল রাজু, সিনেমাটির ট্রেইলার মুক্তির সময় মুম্বাইয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘গেম চেঞ্জার’ সিনেমার পাঁচটি গানের জন্য ৭৫ কোটি রুপি খরচ করা হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, “প্রতিটি গান শুট করতে ১০-১২ দিন সময় লেগেছে, বিশাল সেট এবং শত শত ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার ব্যবহার করা হয়েছে।”
দর্শক এবং সমালোচকদের মতে, ‘গেম চেঞ্জার’-এ দৃশ্যের জাঁকজমক গল্পের গভীরতাকে ছাপিয়ে গেছে। শঙ্কর তার বিশাল ভিজ্যুয়াল স্টাইল এবং শক্তিশালী গল্পের জন্য পরিচিত হলেও, এই ছবিতে গল্পের দুর্বলতার কারণে দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হন।
‘গেম চেঞ্জার’- এর গল্পটি মূলত রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং একজন সাধারণ মানুষের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেন্দ্র করে তৈরি। রাম চরণ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন, একজন সাধারণ নাগরিক এবং অন্যজন একজন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ। ছবির প্রধান প্লটটি আবর্তিত হয় একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য উঠে পড়ে লাগে, এবং দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতাদের মুখোশ খুলে দেয়।
সিনেমাতে দেখানো হয়, মুখ্য চরিত্র কিভাবে একজন সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে, যা দর্শকদের কাছে খুব একটা নতুন মনে হয়নি। অনেক দর্শক মনে করেন, গল্পের গতি খুব ধীর ছিল, এবং কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ ছিল।
কিছু সমালোচকের মতে, সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা থাকলেও, তা ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি। এই গল্পের দুর্বলতাই দর্শকদের কাছে সিনেমাটিকে একঘেয়ে করে তোলে। গানের পেছনে অতিরিক্ত খরচ, এবং গল্পের দিকে কম মনোযোগ দেওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে।
অবশেষে চলতি ফেব্রুয়ারিতে ‘গেইম চেঞ্জার’ মুক্তি দেওয়া ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্রাইম ভিডিওতে।



