প্রয়াত গায়ক হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের স্মরণসভায় বাংলা গানে তার অবদান এবং নিজেদের সঙ্গে নানা স্মৃতি ভাগ করে নিলেন শিল্পী, সুরকার, সংগীত পরিচালক, প্রযোজক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও তার সহকর্মীরা।
১৩ বছর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে গত ৩০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন সংগীতশিল্পী, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা ও উপস্থাপক জুয়েল।
শুক্রবার রাজধানীর মহিলা সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো ‘সেদিনের এক বিকেলে’ শীর্ষক স্মরণ সন্ধ্যা যাতে গানে-আলোচনায় স্মরণ করা হয় এ সৃষ্টিশীল মানুষটিকে।
অনুষ্ঠানের সূত্রধর ছিলেন মাসুদুজ্জামান ও সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার। অনুষ্ঠানে অতিথিদের স্মৃতিচারণের মধ্যদিয়ে জুয়েলের সংগীত জীবন, কর্মজীবন ও বন্ধুত্বের নানা দিক উঠে এসেছে ।
স্মৃতিচারণমূলক আলোচনায় অংশ নেন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নকীব খান, গীতিকার জুলফিকার রাসেল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শংকর সাঁওজাল, আবৃত্তিকার শিমুল মুস্তাফাসহ জুয়েলের কাছের বন্ধুরা।
এছাড়া, দেশের টেলিভিশন মাধ্যম, সংবাদপত্র এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখের অনেকেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাপ্পা মজুমদার বলেন, “জুয়েল ভাইয়ের গায়কী অতুলনীয় সংযোজন ছিল। আইয়ুব বাচ্চু এবং জুয়েল ভাইর যৌথ যাত্রায় আমরা অসাধারণ সব গান পেয়েছি। ভীষণ রকম স্বকীয় একটি জায়গা নিয়ে জুয়েল ভাই তার সংগীতজীবন অতিবাহিত করেছেন।”
জুলফিকার রাসেল বলেন, “আজকে আমি যে গড়ে উঠেছি, আমাকে নানাভাবেই গড়ে তুলেছেন জুয়েল ভাই। তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। একজন অসামান্য মানুষ ছিলেন তিনি।”

নকীব খান বলেন, “আমার কিছু দুঃখবোধ আছে তাকে নিয়ে, তার সঙ্গে একটা গান করা হয়নি। সেটা হয়ে ওঠেনি। তার সম্পর্কে বলবো, একটা মানুষের মধ্যে যদি বহুমুখী প্রতিভা থাকে তা প্রথম দেখি তার মাঝে। সবার মধ্যে এ গুণটা থাকে না। এ মানুষটাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করতাম। সে সত্যিই ‘জুয়েল’ মানুষ ছিলেন।”
গীতিকার আসিফ ইকবাল বলেন, “জুয়েল ছিলেন আমাদের তারুণ্যের সব্যসাচী। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, তার গান, তার উপস্থাপনা, ফটোগ্রাফি, তার ভিজুয়ালাইজেশান যেখানেই সে হাত দিয়েছে সেখানেই স্বকীয়তা অর্জন করেছে।”
অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদার জুয়েলের গাওয়া জনপ্রিয় কিছু গান পরিবেশন করেন এবং শিমুল মুস্তাফা আবৃত্তি করেন। এছাড়া, অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনের মাধ্যমে জুয়েলের বৈচিত্র্যময় জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর আলোকপাত করা হয়।
জুয়েলের প্রথম অ্যালবাম ‘কুয়াশা প্রহর’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘এক বিকেলে (১৯৯৪)’, ‘আমার আছে অন্ধকার’ (১৯৯৫), ‘একটা মানুষ’ (১৯৯৬), ‘দেখা হবে না’ (১৯৯৭), ‘বেশি কিছু নয়’ (১৯৯৮), ‘বেদনা শুধুই বেদনা’ (১৯৯৯), ‘ফিরতি পথে’ (২০০৩), ‘দরজা খোলা বাড়ি’ (২০০৯) এবং ‘এমন কেন হলো’ (২০১৭)।
একটি করে গান নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে আরও দুটি অ্যালবাম- ‘তাতে কি বা আসে যায়’ (২০১৬) এবং ‘এই সবুজের ধানক্ষেত’ (২০১৬)। ১০টি একক অ্যালবামের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘এক বিকেলে’ অ্যালবামটি। এটি প্রকাশের পর তার নাম হয়ে যায় ‘এক বিকেলের জুয়েল’।
জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক আইয়ুব বাচ্চু (প্রয়াত) এবং বাপ্পা মজুমদারের সুর ও সংগীতায়োজনে এ সকল গান শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়। তিনি দেশের খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পীদের সংগে কাজ করেছেন। বাংলা আধুনিক গানে দেশজ স্বকীয়তা বজায় রেখে জুয়েলের গাওয়া গান বাংলা গানে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা।

হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। দেশের টেলিভিশন মিডিয়ায় সফল অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবেও সমাদৃত। ‘বলতে চাই’, ‘মিথস্ক্রিয়া’, ‘মিউজিক ক্যাফে’, ‘লাক্স সুপার স্টার’, নতুন ঢাকের বাজনা, ‘সরাসরি’ তার নির্মিত উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান। এছাড়াও, ‘সেরা রাঁধুনি’, ‘স্পেলিং বি’, ‘বাউলিয়ানা’, ‘ক্ষুদে গানরাজ’ ইত্যাদি রিয়ালিটি শো-গুলো দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
জুয়েল চ্যানেল আইয়ের হেড অব ইভেন্ট এবং মাছরাঙা টেলিভিশনে হেড অব প্রোগ্রাম হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সফল ইভেন্ট আয়োজক। দেশ ও দেশের বাইরে তারকাদের নিয়ে অনেক বড় ইভেন্টের আয়োজন করে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।
দেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে বহু তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেন। একজন উপস্থাপক হিসেবেও তিনি টেলিভিশন ও টেলিভিশনের বাইরে নানা অনুষ্ঠানে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
তিনি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং কর্পোরেটদের জন্য ডকুমেন্টারী, বিজ্ঞাপনচিত্র, সচেতনতামূলক অডিও-ভিজ্যুয়াল নির্মাণ করেন।

পেশাগত জীবনের বাইরে ফটোগ্রাফি ও ভ্রমণ ছিল তার অন্যতম শখ। সময় পেলে বন্ধুদের নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন। শখের বশে ছবি তুলতেন। তার ফটোগ্রাফি নিয়ে একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল।
শিল্পীর নিকটতম বন্ধুদের উদ্যোগে আয়োজিত হয় এ স্মরণ অনুষ্ঠান। বন্ধু জুয়েলের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতেই এ আয়োজন বলে আয়োজকরা মনে করেন।



