Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে দগ্ধ ৩ বন্ধু, বাঁচানো গেল না মাকিনকে

লাল টিশার্ট পরা দীপ্ত আর সবুজ টিশার্ট পরা আয়ানের মাঝে মাকিন।
লাল টিশার্ট পরা দীপ্ত আর সবুজ টিশার্ট পরা আয়ানের মাঝে মাকিন।
[publishpress_authors_box]

মাকিন, দীপ্ত, আয়ান। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওরা। শুধু সহপাঠী না, তিনজনকে বলা যায় ‘হরিহর আত্মা’।

বাসা কাছাকাছি হওয়ায় ছুটির দিনের সকালটা তাদের শুরু হতো একসঙ্গে। একসঙ্গে খাবার, এরপর সুইমিং, সাইকেল চালানো শেষে রাতে খেয়ে তবে যার যার বাসায় ফেরা। সেদিন যখন স্কুলভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয় তখনও তারা ছিল একসঙ্গেই।

স্বজনরা বলছেন, ওই দিন যখন বিমান বিধ্বস্ত হলো তখন মাকিন, দীপ্ত আর আয়ান ছিল স্কুলে। দীপ্তদের ক্লাস হয় দোতলায়। তখন কোনও একটা কাজে ওরা ছিল টিচার্স রুমে। ঠিক সে সময়েই বিমানটা বিধ্বস্ত হয় বলে সকাল সন্ধ্যাকে জানান দীপ্তর মামা।

চারপাশে আগুন আর চিৎকার, জরুরি পরিস্থিতিতে নিজের কথা না ভেবে অন্যদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায় ওরা। বন্ধুদের কয়েকজনকে সাহায্য করে। এতে ওদের তিনজনেরই শরীর আরও বেশি পুড়ে যায় বলে জানান দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান।

অন্যদের সাহায্য করার পর দীপ্তকে যে আগে বের হতে সাহায্য করে সেই বন্ধুটিই মাকিন; পুরো নাম আব্দুল মোসাদ্দের মাকিন। তিন বন্ধুর মধ্যে দীপ্তের শরীরের ৫২ শতাংশ, আয়ানের ৪০ শতাংশ আর মাকিনের শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যায়।

আব্দুল মোসাদ্দের মাকিন

সেদিন আয়ান আর দীপ্তকেও আগে বের করে মাকিন।

দীপ্তর মা নুরুন নাহার বলেন, “মাকিন দীপ্তকে আগে বের করে বলেই মাকিনের পোড়াটা ওদের দুইজনের চাইতে বেশি। নয়তো দীপ্তও ওর (মাকিন) মতোই দগ্ধ হতো।”

দগ্ধ অবস্থায় তিনজনেরই জায়গা হয় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে। বৃহস্পতিবার ওয়েটিং রুমে বসে ছেলের কথা শোনাচ্ছিলেন দীপ্তর মা। পাশেই ছিলেন আয়ানের মা। চোখের সামনে ছেলেকে এভাবে দেখে যেন পুরো নির্বাক হেয়ে গেছেন তিনি। কারও সঙ্গে কথা বলেন না, এমনকি প্রয়োজন ছাড়া আয়ানের বাবার সঙ্গেও না।

দীপ্তর মা বলেন, “স্কুলে বা স্কুলের বাইরে তিন বন্ধু যেমন একসঙ্গে ছিল, এখানেও একইসঙ্গে আছে।”

তিন বন্ধুর আর একসঙ্গে বেশিক্ষণ থাকা হয়নি, হয়নি একসঙ্গে সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরাও। শুক্রবার দুপুর ১ টা ৫ মিনিটে মাকিনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট মাকিন। তার বড় ভাই মেহেদি এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তাদের বাবা মো. মহসীন ব্যবসায়ী।

বৃহস্পতিবার বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউয়ের সামনে নামাজঘরে বসে ছেলেকে ভিক্ষা চাচ্ছেন মা সালেহা নাজনীন। দুর্ঘটনার পর প্রত্যেকদিনই তাকে এমন প্রার্থনা করতে দেখা যায়। তার সেই প্রার্থনা শোনেননি সৃষ্টিকর্তা।

গত মঙ্গলবারও মাকিনকে নিয়ে কথা হয়েছিল সালেহা নাজনীনের সঙ্গে।

তিনি বলেছিলেন, “ছেলেটা একদম মা ঘেঁষা। আমি একটু একা মোবাইল ফোনেও কথা বলতে পারতাম না, শরীরের সাথে মিশে থাকত। কাল রাতে আমাকে বলতেছিল- আম্মু আমাকে একটু ধর, হাতে ধর, আমার যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি ঘুমাতে পারছি না।”

মা সালেহা নাজনীনের সঙ্গে মাকিন
মা সালেহা নাজনীনের সঙ্গে মাকিন

বৃহস্পতিবার মোবাইলে তিন বন্ধুর ছবি দেখাচ্ছিলেন দীপ্তর মা। শুক্রবার সন্ধ্যায় সকাল সন্ধ্যাকে দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান বলেন, “আইসিইউর ভেতরে দীপ্ত যে বন্ধুদের কথা বলতো, তারা মাকিন আর আয়ান।

“দীপ্ত আমাকে বলেছে, মাকিন ওকে বাঁচিয়েছে। ও বলেছে, আমাদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে তুমি মাকিনের বাবা-মাকে দেখো বাবা।”

দীপ্তর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলেও সংক্রমণের ভয়টা রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

শুক্রবার মাকিনের মৃত্যুর সাড়ে তিন ঘণ্টা আগে দগ্ধ আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ১০ বছরের তাসনিম আফরোজ আইমান। সে মাইলস্টোন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল আইমানের।

স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন দোলনায় বসে থাকত আইমান। ওখান থেকে গাড়িচালক তাকে বাসায় নিয়ে যেত।

আইমানের ফুফু শিউলি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “দাদীর খুব প্রিয় ছিল আইমান। ছুটির সময় গাড়িচালক এসে দোলনায় ওর ব্যাগ পায়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আইমান অন্য মোবাইল থেকে নিজেই ফোন করে দাদীকে বলে, আমি পুড়ে গেছি দাদী।”

এখনও জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

শুক্রবার বিকালে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. নাসির উদ্দীন বলেন, “আজ আমরা ক্রিটিক্যাল অবস্থায় থাকা দুই শিশুকে হারিয়েছি। সকালে আইমান এবং দুপুরে মাকিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আইমানের বাড়ি শরীয়তপুরে, মাকিনের গাজীপুরে। তাদের মরদেহ যথাযথভাবে দাফনের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই জেলার সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

অধ্যাপক নাসির উদ্দীন জানান, বর্তমানে ইনস্টিটিউটে ৪০ জন রোগী ভর্তি আছে। এদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক (ক্রিটিক্যাল), ১০ জন সিভিয়ার (গুরুতর) এবং ২৫ জন ইন্টারমিডিয়েট (মাঝামাঝি) পর্যায়ের রোগী।

তিনি বলেন, “ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের ১০ জনকে পোস্ট-অপারেটিভ ডকে রাখা হয়েছে, বাকি ১৫ জনকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে।”

আগামীকাল চার থেকে পাঁচজন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা আছে জানিয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেন, “আশা করছি প্রতিদিন আমরা কিছুসংখ্যক রোগীকে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি পাঠাতে পারব। এর মধ্যে আরেকটা ভালো খবর হচ্ছে, ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীদের মধ্যে দুজন বর্তমানে সজাগ আছে এবং নিজেরাই নিঃশ্বাস নিতে পারছে।”

বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান সোমবার দুপুরে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের প্রাথমিক শাখার ভবনে।

এই দুর্ঘটনায় শুক্রবার এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাইলটসহ ৩৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক পাতায় শুক্রবার বিকাল সোয়া ৪টায় দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ৫০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এর মধ্যে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রয়েছে ৪০ জন। এছাড়া ঢাকা সিএমএইচে ৮ জন, শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ১ জন এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ১ জন ভর্তি রয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found