কয়েকদিন ধরেই জল্পনা কল্পনা চলছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে কি না, তা নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন, ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ মানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংঘাত বৃদ্ধির শঙ্কা।
তবুও এসব শঙ্কা-সতর্কতা উপেক্ষা করে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করতে ইরানে হামলা করেই বসল যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার ভোররাতে নিজেদের সমরাস্ত্র ভাণ্ডারের সেরা সব অস্ত্র দিয়ে হামলাটি করা হয়। ইরাক যুদ্ধের ভয়ংকর স্মৃতি জাগানিয়া সেই টমাহক মিসাইল থেকে বাংকার বাস্টারের মতো অতিকায় বোমাও ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, রবিবার ভোররাতের দিকে আকাশ ও নৌপথ থেকে একযোগে হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় ঠিক কী কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করেনি পেন্টাগন বা হোয়াইট হাউস।

তারপরও যেসব সমরাস্ত্রের নাম পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও আমেরিকার কর্মকর্তাদের বরাতে, তা মোটামুটি ভীতিকর। এসব দিয়েই ইরানের ফোরদো, ইস্পাহান ও নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই তিনটি পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, সেখানে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি। উল্টো তেহরান সমুচিত জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটনকে। ফলে এখন সবার চোখ ইরানের প্রতিক্রিয়ার দিকে।
একদিকে ইরান বড় ধরনের সামরিক পাল্টা আঘাত হানলে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করবে। অন্যদিকে নমনীয় প্রতিক্রিয়া দেখালে দেশের জনগণের মধ্যে শাসকদের প্রতি সমর্থন কমে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত উন্নত সামরিক অস্ত্রগুলো এক নজরে-
বি-২ স্পিরিট স্টিলথ বোম্বার: যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্রের মধ্যে একটি এই বোমার বিমান। বি-২ বোমারু বিমানে রয়েছে এমন প্রযুক্তি, যা অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও পরাস্ত করতে পারে। এটি নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর মতে, এই বিমানে ‘স্টিলথ’ প্রযুক্তি রয়েছে। এর ফলে এটিকে শত্রুপক্ষ রাডার, শব্দ, তাপ ও আলোর মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারে না। একটি বি-২ স্পিরিট স্টিলথ বোম্বার বিমানের দাম প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সামরিক বিমান হিসেবে দেখা হয় এই বোম্বারকে।

জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার বোমা: ট্রাম্প সরাসরি এই বোমার নাম বলেননি। তবে মনে করা হচ্ছে, ইরানে যেসব বি-২ বোম্বার বিমান পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর মাধ্যমেই এই ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে।
জিবিইউ-৫৭ একটি বিশাল ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা। এটি মাটির ২০০ ফুট গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এ কারণেই একে ‘বাংকার বাস্টার’ বলা হয়।
এই বোমার বিশেষত্ব হলো, এটি মাটির নিচে প্রবেশ করার পর বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে ধ্বংসের মাত্রা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
বোমাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর রিসার্চ ল্যাবরেটরির মিউনিশন ডিরেক্টরেট তৈরি করে। আর এর ডিজাইন ও পরীক্ষা চালিয়েছে বোয়িং। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এমন ১২টি বোমা ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।

টমাহক ক্রুজ মিসাইল: ইরানে হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ৩০টি টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। এই দূরপাল্লার মিসাইলগুলো মূলত স্থলভাগের গভীরে আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
এই মিসাইলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আকাশপথে চলার সময়ও লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা যায়। কারণ এটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানিয়েছে, টমাহক মিসাইল নির্দিষ্ট এলাকা ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, নতুন লক্ষ্যের ওপর হামলা করতে পারে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এর ফলে সামরিক কমান্ডাররা দূরপাল্লার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা বা বিশেষ বাহিনীর সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে।
টমাহক প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ১৯৯১ সালে ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’-এ। পরে এটি লিবিয়ায় ‘অপারেশন ওডিসি ডন’ এবং সিরিয়ায় ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিসলভ’-এ ব্যবহৃত হয়। ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ও লস অ্যাঞ্জেলেস শ্রেণির সাবমেরিন থেকে এই মিসাইল ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এফ-২২ র্যাপ্টর: এই বিমান যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিকতম যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এফ-২২ র্যাপ্টরে রয়েছে স্টিলথ প্রযুক্তি, দ্রুতগামী ‘সুপারক্রুজ’, চমৎকার গতিশীলতা ও উন্নত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাপনা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর মতে, এটি আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। খুব দ্রুত ও অনেক দূরেও এটি শত্রুপক্ষের হামলা প্রতিরোধ করতে পারে।
এফ-৩৫এ লাইটনিং টু: ইরান অভিযানে এফ-২২ এর সঙ্গে ছিল এফ-৩৫এ লাইটনিং যুদ্ধবিমান। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক স্টিলথ প্রযুক্তি, যা শত্রু রাডারের চোখ এড়িয়ে কাজ করতে সক্ষম।
এই বিমান পাইলটকে সব আবহাওয়ায় নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে সহায়তা করে। এর ডানার বিস্তৃতি ৩৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ৫১ ফুট। আর এটি ৮ হাজার কেজির বেশি ওজনের অস্ত্র বহনে সক্ষম।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন
ইরানে হামলার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছিল। এই বাহিনীতে ছিল বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিৎজ, বিমান বাহিনীর এফ-১৬, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং সেই বি-২ বোম্বার বিমানগুলো।
অভিযান শেষে কয়েকটি বি-২ বোম্বার বিমান প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ফিরে যায়।
ইরানে হামলার প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। ফক্স নিউজে প্রকাশিত এক মন্তব্যে তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধবিরতি চাই না। আমরা চাই সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত বিজয়। আমি আবার বলছি, আপনারা জানেন আমাদের বিজয় মানে কী—পরমাণু অস্ত্রের একটিও না থাকা।”
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে এই বক্তব্য। তারা শুধু সাময়িক চুক্তি বা যুদ্ধবিরতিতে সন্তুষ্ট নয়। বরং ইরানের পরমাণু সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র : এনডিটিভি, ইউরো নিউজ, আল জাজিরা



