প্রায় পাঁচ দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জালে বন্দি হয়ে ছিল সিরিয়া। দেশটিতে পালাবদলের পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সৌদি আরব সফরে গিয়ে মঙ্গলবার ট্রাম্প এই ঘোষণা দেওয়ার পর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে উল্লাসে ফেটে পড়ে দেশটির মানুষ। তার প্রকাশ ঘটে শূন্যে গুলি ছোড়ার মধ্য দিয়ে।
আসাদ পরিবারের শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর এখন বাণিজ্যিক বাধা থেকে মুক্তির প্রত্যাশা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পদে ফেরার পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সফরে রয়েছেন এখন ট্রাম্প। তার তিন দিনের সফরে সৌদি আরবের পর কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেই সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে তার সাক্ষাত হবে।
তার আগেই ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে বলেন, “দেশটিতে (সিরিয়া) এখন নতুন সরকার, যারা শািন্ত ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারবে বলে আশা করছি।
“আমি সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ইতি টানার নির্দেশ দেব, যাতে দেশটি ঠিক পথে আসার সুযোগ পায়।”
রিয়াদে এক বিনিয়োগ সম্মেলনে ভাষণে ট্রাম্প আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সিরিয়ার জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করবে। তাদের ভাগ্য এখন খুলতে চলেছে।”
সিরিয়ায় ১৯৭১ সালে হাফিজ আল আসাদের ক্ষমতা গ্রহণের কিছু কাল পর থেকে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে দেশটিকে ‘সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক’ রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করে ওয়াশিংটন।
হাফিজের ছেলে বাশার আল-আসাদ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও সিরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নানা নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত ছিল।
এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে বিদেশি সহায়তা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ-কোনোকিছুই পৌঁছাতে পারত না।

গত বছরের ডিসেম্বরে বিদ্রোহী বিভিন্ন গোষ্ঠী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নিলে বাশার রাশিয়ায় পালিয়ে যান। তার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আসাদ পরিবারের কর্তৃত্ববাদী শাসনের: দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধেরও অবসান ঘটে।
বাশারের ক্ষমতাচ্যুতির পর সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে বসেন বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেওয়া গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) প্রধান আহমেদ আল-শারা।
গত ডিসেম্বরে বাশার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটির নতুন সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
সেসময় সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকার আহমেদ আল-শারা এক সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেছিলেন, সিরিয়া এখন বিশ্বের জন্য হুমকি নয়।
ওই সাক্ষাৎকারে দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান বিদ্রোহী থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া এই সিরীয়।
এছাড়া তার নিজের গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামকে (এইচটিএস) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ যেন তাদের সন্ত্রাসী তালিকা থেকে বাদ দেয়, সে আহ্বানও করেছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সিরিয়াকে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দেবে।
“বহু বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর স্থিতিশীল, স্বাবলম্বী এবং সত্যিকারের পুনর্গঠনের প্রত্যাশায় দিন গুনছে সিরিয়া।”
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাশার আল-আসাদের শাসনামলে সিরিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল।

সিরিয়ার ওপর কী কী নিষেধাজ্ঞা ছিল?
স্নায়যুদ্ধকালে ১৯৭১ সালে হাফিজ আল আসাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর সিরিয়া রুশ বলয়ে ঝুঁকে পদে, পর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আসতে থাকে ওয়াশিংটন থেকে।
১৯৭৯ সালে সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ রাষ্ট্র হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত করার পর অস্ত্র বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় দেশটির ওপর। সেই সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তাসহ নানা আর্থিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়।
বাশার আল আসাদ প্রেসিডেন্ট হওয়ার চার বছর পর ২০০৪ সালে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় সিরিয়ার ওপর। তার মধ্যে অস্ত্র বাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর বিধি-নিষেধ আরও কঠোর করা হয়।
২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর বাশার সরকার বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা শুরু করলে সিরিয়া সরকারের নানা ব্যক্তিদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে ওয়াশিংটন। তাতে বিদেশে থাকা সিরীয় সরকারের ওই ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দ করার বিষয়টি ছিল।
সিরিয়ায় মার্কিন বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। দেশটি থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতেও আরোপ করা হয় কঠোর বিধি-নিষেধ।
তবে সিরিয়ার বর্তমান নেতা আল-শারাকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণাও করেছিল যুক্তরাষ্ট্র্। কেননা তিনি তখন আল-কায়দার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসাবেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কেন?
সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার শুরুটা হয়েছিল তার সোভিয়েত বলয়ে অবস্থানের কারণে। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আরও নিষেধাজ্ঞা আসে এই কারণে যে তখন যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী পক্ষকে সমর্থন করছিল।
বিদ্রোহীদের ওপর বাশার সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার ঠেকাতে বাশার আল-আসাদকে এক ঘরে করার চেষ্টা করেছিল ওয়াশিংটন।
আবার হায়াত তাহরির আল-শামকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের’ তকমা দিয়ে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়দার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা।
এখন কেন নিষেধাজ্ঞ তুলে নেওয়া হচ্ছে?
ডিসেম্বরে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আল-শারা তার সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পথে এগিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছে। তার আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বাধাও উঠে গেছে, তিনি সৌদি আরব ও ফ্রান্সসহ বিশ্বনেতাদের দেখাও পাচ্ছেন।
নতুন সিরীয় সরকার নিজেদের একটি মধ্যপন্থী শক্তি হিসাবে দেখাতে চাইছে। নিজেদের গ্রহণযোগ্য করার সেই প্রয়াস অন্য দেশগুলোর সমর্থনও পাচ্ছে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো থেকে নিজেদের দূরে রাখা, সন্ত্রাসীবাদবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এখন আল-শারা।
রয়টার্স এই সপ্তাহে জানিয়েছে, সিরিয়ার নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারা কোনও হুমকি নয় বরং সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য অংশীদার।
দামেস্কে একটি ট্রাম্প টাওয়ার নির্মাণসহ যুক্তরাষ্ট্র-সিরিয়া ব্যবসায়িক চুক্তি হতে পারে বলেও আলোচনা চলছে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে আলোচনার পরেই তিনি সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিলের একজন ফেলো ওমর রহমান বলেন, সৌদি আরব, কাতার ও আমিরাত সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা অবসানের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিল।
এখন কি সিরিয়ায় বিনিয়োগের বন্যা বইবে?
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকার কারণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বিশ্বের কাছে একটি সঙ্কেত দেবে যে তারা সিরিয়ায় ব্যবসা করতে পারে।
নিষেধাজ্ঞাগুলো সিরিয়াকে অর্থতিকভাবে দুর্বল করে রেখেছিল। নতুন সরকারের জন্যও তা একটি বিশাল বাধা ছিল। কারণ যুদ্ধপীড়িত দেশটিতে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার চাপ রয়েছে, যেখানে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের উচ্চ স্তর এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট নৈমত্তিক ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সিরিয়ায় বিনিয়োগ করে কি না, তা এখন বলা না গেলেও আরব ও তুরস্কের বিনিয়োগ বাড়তে পারে সিরিয়ায়।
“নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সিরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাটি দূর হল,” বলছেন ওমর রহমান। তবে তিনি একইসঙ্গে হুঁশিয়ার করেন, তবে দেশটি এখনও অনেক বাধা এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
তথ্যসূত্র : বিবিসি ও আল জাজিরা



