Beta
রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬
Beta
রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

সেনাবাহিনীর অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন-মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার

বাম দিক থেকে শ্যুটার আরাফাত, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও শরীফ। ছবি : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
বাম দিক থেকে শ্যুটার আরাফাত, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও শরীফ। ছবি : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
[publishpress_authors_box]

সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদসহ চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে।

সেনাবাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার আনুমানিক ভোর ৫টায় সেনাবাহিনী পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে কুষ্টিয়া জেলা থেকে শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ওরফে ফতেহ আলী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ ওরফে আবু রাসেল মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানী ঢাকার হাতিরঝিল এলাকা থেকে সুব্রত বাইনের অপর দুই সহযোগী শ্যুটার আরাফাত ও শরীফকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড অ্যামোনিশন এবং ১টি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতদের নামে বিভিন্ন থানায় হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কার্যক্রম সংক্রান্ত মামলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, সুব্রত বাইন এবং মোল্লা মাসুদ সেভেন স্টার সন্ত্রাসী দলের নেতা এবং ‘তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর’ অন্যতম। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকালে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। অভিযান দলের দক্ষতায় কোনোরূপ ক্ষয়ক্ষতি এবং নাশকতা ছাড়াই অভিযানটি সম্পন্ন হয় এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। উক্ত সফল অভিযান বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফরমেশন, দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করণ ও আইনশৃংখলা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ- একথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রমের তথ্য নিকটস্থ সেনা ক্যাম্প অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার জন্য সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অভিযানে ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন, ৫৩ রাউন্ড অ্যামোনিশন এবং ১টি স্যাটেলাইট ফোন উদ্ধার করা হয়। ছবি : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

সেনাবাহিনীর এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সুব্রত বাইনকে আটকের খবর আসে।

প্রথম আলো শিরোনাম করে, ‘কুষ্টিয়া থেকে আটক সেই ব্যক্তি আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কুষ্টিয়া শহরে যৌথবাহিনী অভিযানে আটক হওয়া সেই ব্যক্তি দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। তার সঙ্গে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদসহ আটজনকে আটক করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৩টার দিকে প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র।

এদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকায় সোনার বাংলা মসজিদের পাশে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সুব্রত বাইনকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধজগতের আলোচিত নাম ছিল সুব্রত বাইন। আধিপত্য বিস্তার করে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজিতে তার নাম আসা ছিল তখনকার নিয়মিত ঘটনা। এসব কাজ করতে গিয়ে অসংখ্য খুন-জখমের ঘটনাও ঘটেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, মূলত নব্বইয়ের দশকে মগবাজারের বিশাল সেন্টার ঘিরেই উত্থান হয় সুব্রত বাইনের। তিনি এই বিপণিবিতানের কাছে চাংপাই নামে একটি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী ছিলেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে যান। পরে বিশাল সেন্টারই হয়ে ওঠে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র। এ জন্য অনেকে তাকে ‘বিশালের সুব্রত’ নামেও চেনেন।

২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর যে নামের তালিকা তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার ঘোষণা করে, তাদের অন্যতম সুব্রত বাইন। তার নামে এখনও ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি রয়েছে। সেখানে তার বয়স দেখানো হয়েছে ৫৫ বছর। তাকে ধরিয়ে দিতে তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

মোল্লা মাসুদ ২০১৫ সালে ভারতে ধরা পড়েন বলে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হন এবং ভারতেই অবস্থান করেছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছিল।

মোল্লা মাসুদ রাজধানীর মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতেন। সুব্রত বাইনের হাত ধরেই মোল্লা মাসুদ অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০৩ সালের পরে তাকে আর বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ভারতে তিনি আবু রাসেল মো. মাসুদ নামে পরিচিত হন। ভারতীয় নাগরিক রিজিয়া সুলতানাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস করছিলেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, তার মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য কামাল মজুমদারের ভাগনে মামুন হত্যা, পুরান ঢাকায় মুরগি মিলন হত্যা, খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় ট্রিপল মার্ডার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অসংখ্য জিডি আছে। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ঘোষণা করে, তাতে মোল্লা মাসুদেরও নাম ছিল।

মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে কুষ্টিয়া শহরের কালীশংকরপুর এলাকার ওই বাড়িতে গিয়ে বাসিন্দা ও স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে অভিযান চালিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এলাকায় অধিকাংশ বাড়িতে মেস ভাড়া দেওয়া হয়।

যে বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে, সেটির সামনে পৌরসভার সাইনবোর্ডে বাড়ির মালিকের নাম লেখা মীর মহিউদ্দিন। তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেসে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ১৮ জন ছাত্র থাকেন।

মেসের কয়েকজন ছাত্রের ভাষ্যমতে, নিচতলায় এই বাড়ির পেছনের বাড়ির এক স্থানীয় বাসিন্দা দুই মাস আগে ভাড়া নেন। ১২ থেকে ১৫ দিন আগে অতিথি পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তিকে রেখে যান। নিচতলায় কী হয় বা কারা থাকেন, তা কখনো দেখেননি তারা। তবে একজনকে দিনে দু-একবার শুধু খাবার খাওয়ার সময় বের হতে দেখেন।

ছাত্ররা জানান, মঙ্গলবার ভোর ৫টার কিছু সময় পর বাড়ির সামনে সেনাবাহিনীর পাঁচ থেকে ছয়টি গাড়ি আসে। গাড়িবহরে একটি কালো মাইক্রোবাসও ছিল। ২০ থেকে ৩০ জন সেনাসদস্য বাড়ির তালা খুলতে বলেন। তালা খোলার পর তারা দোতলা ও তিনতলায় ওঠেন। এরপর মেসের সব বাসিন্দাকে দ্বিতীয় তলার একটি ও তৃতীয় তলার একটি কক্ষে রাখেন।

এক কর্মকর্তা বলেন, “তোমাদের কোনও ভয় বা সমস্যা নেই। তোমরা বসে থাকো। এখানে অভিযান চলছে।”

সেনা কর্মকর্তা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন বলে ছাত্ররা জানান। দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তি ওই মেসে থাকে কি না, সেটি জানতে চান।

প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে নিচতলায় তল্লাশি চলে। ৮টার কিছু সময় পর কালো মাইক্রোবাসটি একদম গেটের সামনে চলে আসে। নিচতলা থেকে দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে হাতকড়া পরা ও মাথায় গামছা বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে তোলা হয়। আরেক যুবকের কোমরে ও শরীরে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল।

এক ছাত্র কৌতূহলবশত জানতে চান, কাকে নিয়ে যাচ্ছেন? তখন একজন সেনা কর্মকর্তা তাদের বলেন, “এখন বিস্তারিত বললে ভয় পাবা। পরে মিডিয়াতে দেখে নিয়ো।”

অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া সদর মডেল থানার ওসি মোশাররফ হোসেন বিডিনিউজকে বলেন, “শোনা যাচ্ছে, একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা আমাদের অফিসিয়ালি কেউ জানায়নি।”

ছাত্রাবাসের একজন শিক্ষার্থী বলেন, দেড় মাসের বেশি সময় আগে এই নিচতলাটি ভাড়া নেওয়া হয়। পেছনের বাসার একজন নারীর মাধ্যমে এই বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে দু-তিনজন থাকতেন। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাপড় বিক্রি করেন এমনটাই জানতেন ছাত্ররা।

অভিযানের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই মেসের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে সেনাবাহিনী এই অভিযান চালায়। তখন মেসের সব ছাত্র একটি কক্ষে ছিল। সেনাবাহিনী তাদের অভিযান সম্পর্কে বলে এবং নিরাপত্তা দেয়।

পরে ছাত্ররা একটি গাড়িতে করে দুজনকে নিয়ে যেতে দেখেছেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত