Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

একদম বিনে পয়সায় মন ভালো রাখার সহজ উপায়

mind-refreshing-exercise
[publishpress_authors_box]

মন খারাপের কাটাতে আমাদের জীবনের ভাল স্মৃতিগুলো এবং সময়টি মনে করার উপদেশ গুরুজনেরা প্রায়ই দিয়ে থাকেন। ইদানিং মনোবিজ্ঞানীরাও লছেন, একই কথা। আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া ভালো ঘটনাগুলোর তালিকা করতে করতে আমাদের মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যেতে পারে বলে তাদের অভিমত।

মনোবিজ্ঞানীরা যখন বলছেন, তখন তো আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা গবেষণা না করে বলেননি। কাজেই তাদের চালাতে হয়েছে বিস্তর মানুষের ওপর জরিপ। তবে সে প্রসঙ্গে কিছুটা পরেই আসা যাবে। আগে দেখে নেয়া যাক- এই যে তালিকা করবো সেটি কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায়।  

তালিকা করার নিয়ম

অনেকেই এই তালিকাটিকে নানাভাবে করে থাকেন। যেমন ধরা যাক- তিনটি ভালো কাজ, তিনটি সৌভাগ্যের মুহূর্ত, তিনটি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ঘটনা ইত্যাদি ইত্যাদি। মনোবিজ্ঞানীদের দেওয়া নানা ফর্মুলা রয়েছে। তবে সব ফর্মুলারই একই উদ্দেশ্য- মূলত অনুশীলনের মধ্যে রয়েছে রাতের কিছু মুহূর্ত সারা দিনের বা অতীতের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ইতিবাচকতাকে মনের গহীন থেকে বের করে নিয়ে আসা।

বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা যাক। ধরুন, আপনি লেখার ‘টপিক’ হিসেবে যেকোনও কিছু বেছে নিতে পারেন। সেটা আপাতদৃষ্টিতে আপনার কাছে গুরুত্বহীন কিংবা ছোট ঘটনা হতে পারে। যেমন- বাসে উঠতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করছেন এমন সময় দেখলেন, যার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে সে আপনার একজন পুরনো বন্ধু, সময়ের স্রোতে অনেকদিন যোগাযোগ নেই! অথচ একসময় প্রতি বিকালে তার সঙ্গে দেখা হতো, কেটেছে দারুণ কিছু মুহূর্ত! সেইসব দিন থেকে তিনটি ভালো মুহূর্তের একটি তালিকা তো হতেই পারে।

আবার হতে পারে, ভোরের নরম রোদে পথে হাঁটার সময়ের কোনও অসাধারণ দৃশ্য। হয়তো দেখলেন একটি শিশু একদল কুকুর ছানার সঙ্গে খেলছে। তাদেরকে খেতে পাউরুটির টুকরো ছিঁড়ে দিচ্ছে। নিজের স্মৃতি হাতড়ে এরকম আরও তিনটি চমৎকার ঘটনার তালিকাও তো করে ফেলা যায়।

আবার এসবের বিকল্প হিসেবে কেউ তার নিজের তালিকায় অনেক কঠিন কঠিন বিষয়ও রাখতে পারেন। যেমন- একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বা পদোন্নতি পাওয়া, অথবা নিজের কিংবা পরিবারে কোনও শিশু সন্তানের আগমনের খবর শোনার আগের বা পরের মুহূর্তের সুখকর স্মৃতি। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যায়ামও বটে।  

বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা

এ ধরনের আশীর্বাদ তালিকা করার ব্যাপারটি পুরনো- সেটি তো আগেই বলেছি। মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যান এবং ক্রিস পিটারসনের ২০০৫ সালের একটি জরিপ প্রথম এ ব্যাপারে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ হাজির করে যে, তালিকা তৈরি সত্যি মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

৫৭৭ জন ব্যক্তিকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বিভিন্ন দলে ভাগ করে তারা একটি গবেষণা চালান। একটি দলকে প্রতি সন্ধ্যায় তাদের শৈশবকালের স্মৃতি নিয়ে লিখতে হত। আবার বাকি দলগুলোকে দেয়া হয়েছিল, তিনটি ভালো ব্যাপার বা ঘটনার তালিকা করতে। কেন সেই ঘটনাগুলো ঘটবার দিন ভালো হয়েছিল, সেই কারণও লিখতে বলা হয়েছিল।

পরের বেশ কয়েক মাসে, স্বেচ্ছাসেবক দলগুলোর তাদের মানসিক সুখ পরিমাপের জন্য যে স্কেল দেওয়া হয়েছিল, তার ফলাফল ছিল আকর্ষনীয়।  যাদেরকে তিনটি ভালো জিনিসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দেখা গেল এক মাসের মধ্যেই তাদের সুখের মাত্রা ভালো রকম বেড়েছে। পাশাপাশি যেসব বিষয় নিয়ে তারা হতাশ ছিলেন সেগুলো কমতে শুরু করেছে। আর এ পরীক্ষার ইতিবাচক প্রভাবগুলো গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছয় মাস ধরে স্থায়ী হয়েছিল।

তবে ইতিমধ্যে প্রথম দলটি, যারা শৈশবের স্মৃতি নিয়ে কেবল লিখেছেন, তাদের মধ্যে সুখের মাত্রা কেবল প্রথম সপ্তাহেই কিছুটা বেড়েছিল। পরে আবার আগের জায়গাতে অর্থাৎ গবেষণা শুরুর আগে যেমন ছিল তেমনটি দাঁড়ায়। পরবর্তী ছয় মাসেও এর কোনও উন্নতি হয়নি।   

২০০৫ সাল থেকে, এই একই পরীক্ষণটি কেনিয়ার নাইরোবির বস্তির কিশোর থেকে শুরু করে সুইজারল্যান্ডে বসবাসকারী বয়স্ক নারী- সব ধরনের ব্যক্তির উপরই চালানো হয়েছে।

তিনটি ভালো জিনিসের তালিকা বনাম মানুষের প্রবণতা

তিনটি ভালো জিনিসের তালিকার কৌশল যে কাজ করতে পারে, তার একটি কারণ হল এটি মানুষ হিসাবে আমাদের মধ্যে থাকা হার্ড-ওয়্যার্ড (Hard-wired) প্রবণতাকে প্রতিরোধ করতে শুরু করে। মানুষের মধ্যে এই হার্ডওয়্যার্ড প্রবণতাটি মূলত সে জন্মের পর থেকেই গড়ে ওঠে। যেমন- একটি শিশু জন্মের সময় কাঁদবে, এটাই হার্ডোয়্যার্ড প্রবণতা। মানুষও তেমনি ইতিবাচক ঘটনার পরিবর্তে নেতিবাচককেই বেশি মনে রাখে।

আমরা কেন এইভাবে ভাবি তার একটি শক্তিশালী বিবর্তনীয় কারণ রয়েছে: এটি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, একটি ছোট বিড়াল রাস্তায় আমাদের অনুসরণ করছে কিনা তা আমরা খুব কমই লক্ষ্য করি, তবে এটি সিংহ হলে আমরা অবশ্যই দেখতাম। আমাদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়। যুদ্ধ, দুঃখকষ্ট, ঘৃণা এবং বিভাজনের এই বিশ্বে নানা খবর আমরা ফোনেই পেয়ে থাকি। অনেক সময়ই এ খবরগুলোর নেতিবাচকতা আমাদের বুকের ভেতরে গভীর ছাপ ফেলে।

তিনটি ভালো জিনিসের তালিকা করার মনস্তাত্ত্বিক ব্যায়াম মানুষকে একটি সুনির্দিষ্ট উপায়ে ইতিবাচক দিকে ফোকাস করতে সাহায্য করে। যদিও এটি দিন শেষে রাতের অনুশীলন- তবু বলা যায় এর আসল শক্তি মূলত এর মধ্যে যে, কেউ যখন তালিকাটি করতে বসেন, তখন পুরো দিনটি তার কাছে উদ্ভাসিত হতে শুরু করে।

পরিশেষ

যখন কেউ খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যান, তখন অবশ্য তার জন্য ইতিবাচক মুহূর্ত খোঁজা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এমন নয় যে, তালিকা করার আইডিয়াটি ‘গেইম চেঞ্জার’। তবে ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মানুষ যখন চরম বিষণ্ণ থাকেন, তখনও তিনটি ভালো জিনিসের তালিকা করার এই পদ্ধতি কাজ করে।

আবার এর অর্থ এই নয় যে, এটি প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রেই কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের কিশোর-কিশোরীদের ওপর এই পদ্ধতির ফলাফল তেমন কার্যকর হয়নি। গবেষকদের অনুমান হলো, যেসব দেশের স্কুলগুলোয় লিখিত কাজের ওপর বেশি জোর দেয়া হয়, সেসব দেশের শিক্ষার্থীরা এই তিনটি ভালো কাজের তালিকা করাকে একটি বাড়তি বাড়ির কাজ, এবং চাপ মনে করে। আমাদের দেশেও ব্যাপারটি এরকমই। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিঃখরচা ও ঝুট-ঝামেলাহীন এই পরীক্ষাটি নিজের ওপর চালানো যেতেই পারে। আর তাতে যদি ফল দেয় তাহলে তো কথাই নেই।

(বিবিসিতে প্রকাশিত ক্লাউডিয়া হ্যামন্ডের প্রবন্ধের ভাবানুবাদ।)

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found