Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

রঙের ভাষা সিনেসথেসিয়া: রোগ না আশীর্বাদ?

synaesthesia-color-01
[publishpress_authors_box]

সিনেসথেসিয়া একটি স্নায়বিক অবস্থা যা মানুষের স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতা বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, রঙ দেখতে পাওয়া দ্বিতীয় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

আমার মায়ের নাম দুধের রঙের। একটি অ্যাকোস্টিক গিটারের তারগুলো বাজানো হলে, মৌচাকের উষ্ণ হলুদ রঙ দেখায়। শব্দটা সমতল, শক্ত এবং মসৃণ। আর সোমবার গোলাপী। এই অনুভূতিগুলো সবসময় একই থাকে এবং সবসময় উপস্থিত থাকে। এটাই সিনেসথেসিয়া – আমার ক্ষেত্রে বর্ণ-রঙ সিনেসথেসিয়া, শব্দ-রঙ সিনেসথেসিয়া এবং শব্দ-টেক্সচার সিনেসথেসিয়া।

অনেক সিনেসথেটের মতো  আমিও অল্প বয়সেই সংগীত এবং ভাষা দুইটির প্রতি আমার আগ্রহ আবিষ্কার করি। সংগীতে, আমি পারফর্ম করার শারীরিক কাজে পারদর্শী ছিলাম না, বরং কম্পোজিশনে পারদর্শী ছিলাম। আমি ছোট চলচ্চিত্র এবং নৃত্য থিয়েটারের জন্য একজন সুরকার এবং টেলিভিশনের জন্য একজন শব্দ সম্পাদক হয়েছি। আমার কাছে গান লেখা অনেকটা ভাষার মতো মনে হতো, কারণ আমি শব্দগুলোর রঙ একই রকম ‘দেখতে’ পেতাম। আমি ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ এবং ভাষাতত্ত্বও অধ্যয়ন করেছি– ভাষার রঙ আমাকে শব্দ এবং ব্যাকরণের প্যাটার্ন মনে রাখতে সাহায্য করত।

সিনেসথেসিয়া একটি স্নায়বিক অবস্থা যা আনুমানিক ৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষকে  ‘সংবেদনের মিশ্রণ’ (cacophony of sensation) হিসেবে বিশ্বকে অনুভব করায়।

‘সংবেদনের মিশ্রণ” বলতে আমাদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয় (যেমন দেখা, শোনা, স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ) একসাথে কাজ করে এবং একটি একক অভিজ্ঞতায় মিশে যাওয়াকে বোঝায়। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একাধিক সংবেদন একই সময়ে অনুভূত হয় এবং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

যেমন যখন আমরা কোনো খাবার খাই, তখন শুধু স্বাদই অনুভব করি না, এর গন্ধ, টেক্সচার এবং এমনকি দেখতে কেমন, সেটিও আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ হয়। এই সব সংবেদন মিলেমিশে খাবারের স্বাদ তৈরি করে। কিংবা যখন আমরা গান শুনি, তখন শুধু সুরই শুনি না, গানের কথা, শিল্পীর কণ্ঠস্বর এবং পরিবেশের অন্যান্য শব্দও আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ হয়।

প্রায় ৬০ ধরনের সিনেসথেসিয়া শনাক্ত করা হয়েছে। এর পরিমাণ তবে ১০০টিরও বেশি হতে পারে, কিছু প্রকার গুচ্ছ আকারে অনুভূত হয়।

এই অবস্থাটি বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ঘটে বলে মনে করা হয় যা মস্তিষ্কের গঠনগত এবং কার্যকরী বিকাশে প্রভাব ফেলে। মস্তিষ্কের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর মধ্যে বর্ধিত যোগাযোগের অর্থ, উদাহরণস্বরূপ, শব্দ স্বাদকে উদ্দীপিত করতে পারে, সংখ্যার ক্রম স্থানিক বিন্যাসে অনুভূত হতে পারে, বা টেক্সচারের অনুভূতি আবেগ জাগাতে পারে।

সিনেসথেসিয়াকে স্নায়বিক ব্যাধি নয়। যদিও এটি অটিজম, উদ্বেগ এবং সিজোফ্রেনিয়াসহ স্নায়ুবিকাশ এবং মানসিক স্বাস্থ্য অবস্থার সাথে যুক্ত করা হয়েছে- এটিকে একটি ‘বিকল্প সংবেদনশীল বাস্তবতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং সাধারণত উপকারী বলে মনে করা হয়।

স্মাদার ফ্রিশ বলেন, “আমি যখন ছোট ছিলাম তখন জানতাম আমি বিশ্বকে ভিন্নভাবে দেখি এবং অন্যদের কাছে এটি বর্ণনা করার আমার উপায় ছিল ‘রঙিন’।”

ফ্রিশ, যার বর্ণ-রঙ সিনেসথেসিয়া, শব্দ-রঙ সিনেসথেসিয়া এবং লেক্সিক্যাল-গাস্টেটরি সিনেসথেসিয়া (যেখানে শব্দের স্বাদ থাকে) রয়েছে। তার পডকাস্ট, ক্রোমাটিক মাইন্ডসের মাধ্যমে সংবেদনশীল জগতের অন্বেষণ করেন এবং বর্তমানে এই বিষয়ে তার প্রথম বই লিখছেন। তিনি বলেন, “স্কুলে শেখাটা আমার জন্য সংবেদনশীলভাবে খুব বেশি ছিল। যখন সংখ্যার একটি সিরিজের সমস্ত রঙ একটি সাইকেডেলিক বিস্ফোরণ ছিল। তখন একটি সমীকরণ সমাধানের চেষ্টা করা খুব কঠিন।”

ফ্রিশ বলেন, রঙের এই বিস্ফোরণ তার মনোযোগ হারিয়ে ফেলতেন এবং তিনি কী করছিলেন সেটিও ভুলে যেতেন। “ভাষার ক্ষেত্রেও একই ছিল। শব্দগুলোর রঙ, সঙ্গীত এবং স্বাদের সংবেদন আমাকে এতটাই উত্তেজিত করত – যে আমি মনোযোগ হারিয়ে ফেলতাম।”

হাইস্কুল প্রায় শেষ করার আগ পর্যন্ত তিনি রিচার্ড সাইটোউইক এবং ডেভিড ঈগলম্যানের ‘ওয়েডনেসডে ইজ ইন্ডিগো ব্লু’ বইটি খুঁজে পাননি। “আমার প্রথম চিন্তা ছিল, বুধবার আসলে কমলা রঙের- এবং আমার এই বইটি দরকার।” ফ্রিশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। “অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম আমার সিনেসথেট মস্তিষ্ক কীভাবে স্নায়বিকভাবে সংযুক্ত। এবং আমি নিজেকে বললাম, এই ঘটনাটি আশ্চর্যজনক। আমি বিভ্রান্ত হওয়ার পরিবর্তে শেখার জন্য রংগুলো ব্যবহার করতে পারি।”

ফ্রিশ নতুন করে এই রঙ এর ভাষা দ্রুত এবং সাবলীলভাবে শিখতে রঙ-কোডিং সিস্টেম তৈরি করেছিলেন। “ভাষা অধ্যয়ন আর বিভ্রান্তিকর নয়, বরং ‘সংগঠিত’ মনে হয়েছিল”, তিনি বলেন। “এবং এটা কাজ করেছে! আমার পুরো পৃথিবী বদলে গেছে। আমি সেই জিনিসটি শিখতে শুরু করি যাতে আমার মস্তিষ্ক পারদর্শী হওয়ার কথা ছিল: ভাষা।”

ফ্রিশ বলেন, তিনি মাত্র দুই মাসে ফরাসি এবং স্প্যানিশ ভাষা সাবলীলভাবে শিখতে সক্ষম হয়েছিলেন। “আমি প্রতিটি [ফরাসি এবং স্প্যানিশ] পরীক্ষায় ৯০-এর বেশি নম্বর পেয়েছি,” তিনি জানান।

আজ ফ্রিশ সাতটি ভাষা সাবলীলভাবে বলতে পারেন – এবং বলেন যে তিনি ‘অল্প সময়ের মধ্যে, কোনো অসুবিধা ছাড়াই’ যেকোনো ভাষা শিখতে পারেন।

যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল্টিসেন্স সিনেসথেসিয়া রিসার্চ ল্যাবরেটরির পরিচালক জুলিয়া সিমনার। তিনি এবং তার দল ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী প্রায় ৬,০০০ শিশুকে পরীক্ষা করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা প্রতিটি শিশুকে পৃথকভাবে সিনেসথেসিয়ার জন্য পরীক্ষা করেছি এবং তারপর [তাদের] সিনেসথেসিয়ার সঙ্গে কী কী দক্ষতা তৈরি হয়েছে তা নির্ধারণের জন্য একগুচ্ছ পরীক্ষা দিয়েছি।”

পর্যবেক্ষণে দেখা  যে সিনেসথেসিয়া আছে এমন শিশুরা অন্যান্য সাধারণ শিশুদের তুলনায় বেশ কিছু দক্ষতায় ভালো ছিল- যে দক্ষতাগুলো, সিমনারের মতে, ‘অবশ্যই প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে’।

সিমনার জানান, বিশেষ করে তারা শব্দ বলার এবং বুঝতে পারার পরিমাণের দিক থেকে, স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি, খুঁটিনাটির প্রতি মনোযোগ এবং সৃজনশীলতায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো ছিল ।

তিনি বলেন, “এই ‘সিন-সংযুক্ত’ দক্ষতাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে সিনেসথেসিয়া আছে এমন কারো জন্য দ্বিতীয় ভাষা শেখা সহজ হবে বলে আমরা আশা করতে পারি।”

তিনি বলেন, সিনেসথেটিক রং থাকার কারণে অক্ষরগুলো বেশি স্মরণযোগ্য হয়ে ওঠে। সিনেসথেসিয়া রংগুলো কোনও একটি ভাষা থেকে দ্বিতীয় ভাষায় শেখার ক্ষেত্রে ওই পরের ভাষাটির শব্দগুলোকেও আরও স্মরণযোগ্য করে তোলে।

তিনি বলেন, “অক্ষরের চেহারার মাধ্যমে অথবা অক্ষরের শব্দের মাধ্যমে এই রংগুলো ভাষাগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এমন যেন রংগুলো একটি ভাষা থেকে অন্য ভাষার কাঠামো তৈরি করছে।”

২০১৯ সালে, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে আরেকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, বর্ণ-রঙ সিনেসথেসিয়া, যেখানে প্রতিটি অক্ষর এবং সংখ্যার নিজস্ব স্বতন্ত্র রঙ থাকে, পরিসংখ্যানগত শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়। এটি একজন ব্যক্তিকে প্যাটার্ন ‘দেখতে’ সক্ষম করে- ভাষা শেখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা।

গবেষকরা গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটি কৃত্রিম ‘ভাষা’ উপস্থাপনকারী কিছু অর্থহীন শব্দ (উদাহরণস্বরূপ,  মুহ-কেহ এবং বেহ-ওড)শুনতে বলেছিলেন।

তারপর তারা দ্বিতীয় আরেকটি শব্দের সেট শোনেন। এই সেটে মূল কৃত্রিম শব্দগুলোর সঙ্গে নতুন কৃত্রিম শব্দও ছিল, যা একটি ‘বিদেশি’ ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে। অংশগ্রহণকারীদের তারপর দুটি কৃত্রিম ভাষার প্রতিটি থেকে ‘শব্দ’ আলাদা করতে বলা হয়েছিল।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানীয় স্নায়ুবিজ্ঞান এবং বিকাশ পরীক্ষাগার, ফিন ল্যান্ড ল্যাবের মনোবিজ্ঞানী এবং পরিচালক অ্যামি ফিন বলেন, “এটির কোনো অর্থ ছিল না।এটি ‘সেগমেন্টেশন’ দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল- অথবা ভাষার সেগমেন্টগুলো কী তা বের করতে আপনি কীভাবে নিয়ম ব্যবহার করেন। প্রাথমিক ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এটি একটি খুব প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।”

ফলাফল দেখিয়েছে যে বর্ণ-রঙ সিনেসথেটরা সিনেসথেসিয়া নেই এমন অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় দুটি ‘ভাষা’ এর মধ্যে পার্থক্য করতে বেশি সক্ষম ছিল। “আমরা মনে করি [সিনেসথেসিয়া] আপনাকে ভাষার অংশগুলো আরও সহজে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করতে পারে,” ফিন বলেন।

যখন সিনেসথেটরা একাধিক ইন্দ্রিয় দিয়ে একই প্যাটার্ন অনুভব করে (উদাহরণস্বরূপ, শ্রবণ এবং দৃষ্টি উভয়ভাবেই) তাদের মন একটি অতিরিক্ত সেকেন্ডারি ইঙ্গিত তৈরি করে যা তাদের প্যাটার্ন চিনতে বা মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

১১ বছর বয়সে  মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রথম সপ্তাহে ফরাসি ভাষার (লেখক ইংরেজ) শিক্ষক জিজ্ঞাসা আমাকে করেন- “তুমি ‘কাজ’ কীভাবে বলবে?”  পুরো ক্লাস নিরব। আমি জানি শব্দটা ‘নীল’। তারপর আমার মনে পড়ল। “ত্রাভাই,” (ফ্রেঞ্চে কাজ)  আমি উত্তর দিলাম। কখনও কখনও আমি একটি শব্দ মনে রাখতে পারি না- কিন্তু আমি রঙ মনে রাখতে পারি। এটি হতাশাজনক হতে পারে কারণ আমি যদি বলি ‘এটা গোলাপী’, তবে কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ রঙগুলো কেবলই আমার নিজের মনের জন্য অনন্য। অন্যদিকে, রঙ একটি অতিরিক্ত অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে, একটি বোনাস বলা যেতে পারে যা আমি ভাষা শেখার সময় ব্যবহার করতে পারি।

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন,  যেসব শিশুরা শিশুকাল থেকেই দুইটি ভাষা জানে, তাদের সিনেসথেসিয়া বেশি থাকে। কিন্তু গবেষণা বলছে, যারা পরে দ্বিতীয় ভাষা শেখে, তাদের সিনেসথেসিয়া বেশি। এর মানে সিনেসথেসিয়া ভাষা শেখার একটা উপায়।

শিশুরা যখন চারপাশের জগৎ বুঝতে শুরু করে এবং কথা বলা, পড়া ও লেখা শেখে, তখন সিনেসথেসিয়া দেখা দেয়। ২০১৬ সালে কানাডা, আমেরিকা ও চেক রিপাবলিকের গবেষকরা দেখেন, শিশুরা চার থেকে সাত বছর বয়সের মধ্যে রং চিনতে শেখে। এই সময়েই তারা পড়া ও লেখা শুরু করে এবং ছয় বছর বয়স থেকে সিনেসথেসিয়া শুরু হয়। গবেষকরা মনে করেন, শিশুরা রং চেনার নতুন দক্ষতা ব্যবহার করে অক্ষর ও শব্দ শেখার জন্য। অর্থাৎ, রং চেনার ক্ষমতা তাদের অক্ষর ও শব্দ শিখতে সাহায্য করে।

যাইহোক, সিনেসথেসিয়া মানুষে মানুষে যোগাযোগকে আরও কঠিন করে তোলে নাকি এবং এটি শেখার সুবিধার্থে একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে- এই এটি এখনো ‘বিতর্কের বিষয়’ বলেই মনে করেন ফ্রান্সের টুলুজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী লুসি বুভেট।

মূল লেখাটি বিবিসি থেকে নেওয়া ক্যাথরিন ল্যাথাম এর লেখার ভাবানুবাদ। ক্যাথারিন বিজ্ঞান ও পরিবেশ সাংবাদিক এবং সম্পাদক।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found