ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, ছবি দেখালে বিশ্বাস করা যেতে পারে।
পল ইউলিয়াস রয়টার জানতেন, সংবাদের চেয়ে বড় পণ্য পৃথিবীতে নেই। কাজেই একে বিকৃত হতে দেওয়া যাবে না, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দিয়ে কলঙ্কিত করা যাবে না। তিনি সবসময় চেয়েছেন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, সাংবাদিকের মতামত নয়। তিনি চেয়েছেন যা ঘটেছে, কেবল তার বিবরণ—রঙ মেশানো বিশেষণ লাগানো বর্ণনা নয়; রয়টারকে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ দিতে তিনি রাজি ছিলেন না।
তার প্রচেষ্টায় কেবল সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে নয়, সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে, দেরিতে হলেও কোনো এজেন্সির ভৌগোলিক একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙেছে, সরকারের আনুকূল্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সংস্থা রয়টার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫১ সালে। ১৮৬৫-এর ১৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনের ফোর্ড থিয়েটারে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন। সেই সংবাদটিও পরিবেশন করল রয়টার। সবার আগে ইউরোপে পুরো খবরটি পৌঁছাতে রয়টারের সময় লাগল ১২ দিন। সংবাদমাধ্যমে ছবি পৌঁছাবার অগ্রণী ভূমিকাটি নিল রয়টার।
এই রচনাটিতে ‘রয়টার আর্কাইভ’ থেকে ধ্রুপদ মর্যাদার কিছু ফটোগ্রাফ উপস্থাপন করা হয়েছে। সে ছবিগুলো এমনিতেই কথা বলে, ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না।
এ পর্যন্ত পাওয়া ক্যামেরায় তোলা প্রাচীনতম ছবিটি ১৮২৬ কিংবা ১৮২৭ সালের। সংবাদপত্রে ছবির সংযোজন হতে অনেক সময় লেগে যায়। ‘একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও বেশি প্রকাশ করতে সক্ষম’— এ বিশ্বাসের উপরই প্রতিষ্ঠিত হয় ফটোজার্নালিজম।

‘সিয়িং ইজ বিলিভিং’— এই প্রত্যয় ছবিকে সংবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। একটা সময় সংবাদ প্রতিনিধিকেই ক্যামেরা বহন করতে হতো। রণাঙ্গনেই হোক কি অন্য কোনো স্থানে, ক্যামেরা কাঁধে মানুষটিকেই মনে করা হয় সাংবাদিক। রয়টারের ফটোগ্রাফার/ফটোজার্নালিস্ট কালজয়ী ছবি যেমন তুলেছেন, কয়েকজনকে ছবি জালিয়াতির জন্য বরখাস্তও করা হয়েছে। সেই রয়টার এখন ‘থম্পসন রয়টার’।

১. পৃথিবী কাঁদানো তিন বছর বয়সী আইলান কুর্দির ছবিটি তুলেছিলেন রয়টারের ফটোগ্রাফার নিলুফার দেমির। সিরিয়ান এই নিষ্পাপ শিশু তুরস্কের কাছে বদ্রুমে ভূমধ্যসাগরীয় সৈকতে শায়িত ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫। লিখে যতোটা প্রকাশ করা যেতো এই ছবি তার চেয়ে অনেক বেশি প্রকাশ কবেছে। এই ছবি বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়েছে এবং শরণার্থীদের দুয়ার খুলে দিয়েছে।

২. হাঙ্গেরির পুলিশ সীমান্ত পেরোনো মুসলিম শরণার্থী পরিবারকে শিশুসহ বিকসে স্টেশনের রেলওয়ে ট্র্যাকে ফেলে দিয়েছে।

৩. মেয়েকে চুমো খেতে খেতে গ্রিস-মেসিডোনিয়া সীমান্ত অতিক্রম করছে এক সিরিয়ান শরণার্থী।

৪. সিগফ্রিড মোডোলা প্রেসিডেন্টের ভাষণ শুনে হোটেলে ফিরছিলেন, তিনি শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে পড়ল সৈন্যরা একজন সেলেকা বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে এবং নিহতের উপর চালাচ্ছে অবর্ণনীয় অত্যাচার। এই সহিংসতা তিনি দীর্ঘক্ষণ দেখতে চাননি, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছবিটি তুলে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করেন।

৫. রয়টারের পাকিস্তানি ফটোগ্রাফার আদ্রিস লতিফের এই ছবিটি ছাপা হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১; পাকিস্তানি দুর্গতরা খাদ্য সাহায্যের জন্য কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, ছবি সে কথাই বলছে।

৬. ইফতারের পর একজন রোজদার মুসলমান মহিলা মাগরেবের নামাজ আদায় করছেন।

৭. রয়টারের ফটোগ্রাফার নরেন্দ্র শ্রেষ্ঠা নেপালের পাতানে একটি গাছের খোড়লে একজোড়া পেঁচাকে ক্যামেরাবন্দি করেন।

৮. সামুদ্রিক ঢেউয়ে গ্রিক দ্বীপ লেসবো’র পাথুরে সৈকতে অজানা সব অভিবাসী।

৯. ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর শিশুসন্তানসহ ভাসমান শরণার্থী।

১০.সার্বিয়া-হাঙ্গেরির সীমান্ত পেরোনের চেস্টা করছে সিরীয় নারী ও পুরুষ।

১১. রুয়ান্ডান গণকবর পরিস্কার করছেন একজন শ্রমিক।

রুয়ান্ডান গণহত্যাকে দাপ্তরিকভাবে তুতুসি বিরোধী গণহত্যাই বলা গয়ে থাকে। রুয়ান্ডার হুটু সংখ্যাগারিষ্ঠ সবরকার ও হুটু জনগণ ৭ এপ্রিল ১৯৯৪ থকে ১৫ জুলাই ১৯৯৪ পর্যন্ত পৌনে তিন মাসে ৫ থেকে ১০ লক্ষ তুতসিকে হত্যা করেছে। ১৯৯৪ তে গণহত্যা ব্যাপক আকার ধারণ করে। জাতিগত বিরোধটি দীর্ঘদিনের। এটি মূলত শাসক ও শোষিতের লড়াই। ১৯৯২ তে এই লড়াইয়ের সূচনা বুরুন্ডিতে। সে বছর ২৭ এপ্রিল হুটু পুলিশ গুলি করে প্রায় ১২০০ তুতসিকে হত্যা করে।
১২. বেইজিং-এ ২০০ মিটার দৌড় বিজয়ের পর জামাইকার উসাইন বোল্ট।

৯.৬৯ সেকেন্ডে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট জিতে বিশ্বরেকর্ড করে উসাইন এমনিতেই অ্যাথলেটিকসের আইকন হয়ে আছেন। ১৯.৩০ সেকেন্ডে জিতেছেন ২০০ মিটার স্প্রিন্ট। ড্রাগ আসক্তি যেখানে অ্যাথলেটদের ক্যারিয়ার শেষ করে দিচ্ছে, উসাইন তখন কেবল বিশ্বরেকর্ডই করছেন না, মাদকবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বও দিচ্ছেন।
১৩. ইউএস ম্যারিন কোরের অ্যাসাল্টম্যান কার্ক ডেরলিম্পল দেখছেন তার চোখের সামনে ক্ষমতাধর সাদ্দাম হোসেনের মূর্তির পতন ঘটছে সেন্ট্রাল বাগদাদে, ৯ এপ্রিল ২০০৩।

১৩. পাঁচ বছরের তালিবান শাসনের অবসানর পর আফগান নারী ঘোমটা খুলে সেন্ট্রাল কাবুলে খাবারের লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

১৪. ২০০৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়েছে এই ছবিটি। ইমার্জেন্সি ফিডিং সেন্টার থেকে ১ আগস্ট তোলা মা ও শিশুর এই ছবিটি অনেক পোস্টারে ব্যবহার করা হয়েছে।

১৬. রয়টারের অর্ক দত্তের ছবি। সুনামিতে নিহত স্বজনের জন্য ক্রন্দনরত রমণী।

১৭. শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ২ নম্বর টাওয়ার জ্বলছে।

১৮. সাও বার্নর্দোতে ফোর্ড কারখানায় প্রোডাকশন লাইন থেকে বেরিয়ে আসা ট্রাকের সারি।

১৯. আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা।

২০.তেজষ্ক্রিয় চেরনোবিল।

ছবি সত্যিই কথা বলে। ছবি ইতিহাস তুলে ধরে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক।
ইমেইল: momen98765@gmail.com


