উন্নয়ন বরাদ্দে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখার দাবি বহু িদনের; কিন্তু এক বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে তা উপেক্ষা করেছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও হাঁটছে সেই একই পথে।
চলতি অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, সেখানে স্বাস্থ্য খাত ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দই সবচেয়ে কমানো হচ্ছে। ছেঁটে ফেলা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে ৫৯ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতের বরাদ্দ থেকে ৩৫ শতাংশ।
এই দুই খাতসহ প্রায় সব ধরনের খাতের এডিপিতে বরাদ্দ কেটে নেওয়ার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
একমাত্র ব্যতিক্রম পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাত। এই খাতে উল্টো এডিপির মুল বরাদ্দের সঙ্গে আরও ৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এডিপি সংশোধন হয় বরাবরই; কিন্তু গত অর্থ বছরও কাটছাঁটে বরাদ্দ সবচেয়ে কমেছিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। অথচ জিডিপি অনুপাতে এই দুই খাতে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে কম খরচ করে বাংলাদেশ।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তখন সংশোধিত এডিপিতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছিল।
এরপর গত বছরের মে মাসে শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দিয়েছিল। বাজেট দেওয়ার পর অভ্যুত্থানে পতনের আগে এক মাস হাতে পেয়েছিল ওই সরকার।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকারও অর্থ বছরের শেষ ভাগে এসে এডিপি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাতে মূল বরাদ্দ থেকে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা বা ১৫ শতাংশ কমছে। সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের তৈরি এই সংশোধন প্রস্তাব রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় অনুমোদন পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বর্ধিত সভায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি অনুমোদিত হয়েছে। তা চূড়ান্ত করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে উপস্থাপন হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান মুসরাত মেহ্ জাবীন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে এনইসি সভা হতে পারে। ওই সভায় সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।”
এডিপি সংশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণত পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবই অনুমোদিত হতে দেখা যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে জানিয়েছেন, গত এক দশকের হিসাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত এডিপি বরাদ্দ কাটছাঁট করা হতো। কিন্তু এবার প্রায় ১৫ শতাংশ কমানো হচ্ছে।
গত কয়েক বছরের এডিপি ও সংশোধিত এডিপির তুলনামূলক হিসাব করে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে মূল এডিপি থেকে কাটছাঁট হয়েছিল ৭ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে কাটছাঁট হয়েছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। মহামারির অভিঘাতে গতি কমে যাওয়া ২০২০-২১ অর্থ বছরেও মাত্র ২.৪৮ শতাংশ বরাদ্দ কেটে সংশোধনের রেকর্ড দেখা যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, মূলত অর্থ সঙ্কটের কারণেই চলতি অর্থ বছরে উন্নয়ন বরাদ্দ বেশি কেটে নেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে ওঠায় এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। আবার বর্তমান সরকারের ওপর সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা গোষ্ঠীর দাবি দাওয়ার চাপ তৈরি হওয়ায় সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।”
পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে জানান, এবারের সংশোধনী প্রস্তাবে আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি ৫৯ বরাদ্দ কেটে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাত থেকে।
মুল এডিপিতে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে ওই বরাদ্দ থেকে ১২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা কেটে নিয়ে ৮ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে শিক্ষায় বরাদ্দ ৩৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। খাতটি থেকে ১১ হাজার ১৮০ কোটি টাকা কেটে নিয়ে ২০ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধিত এডিপিতে। মুল এডিপিতে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা।
কোন খাত থেকে কত কমল
সংশোধিত এডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত থেকে ২২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বা ৩২ শতাংশ এবং শিল্প খাত থেকে ৩১ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া কৃষি খাত থেকে ২৭ শতাংশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ২২ শতাংশ, গৃহায়ণ ও কমিউনিটি খাত থেকে ২১ শতাংশ, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি খাত থেকে ১০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাত থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবার কেন এত বেশি অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে- উত্তরে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের উর্ধতন একজন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর শিল্প খাতে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। এর প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব আয়ে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে অর্থ সঙ্কট। মূলত এই কারণেই সরকারকে বড় ধরনের সংশোধনীতে যেতে হচ্ছে।”
অর্থ বছরের অর্ধেক পেরুনোর পরও সরকারের প্রধান রাজস্ব আহরণকারী সংস্থা এনবিআর রাজস্ব আহরণে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম হয়েছে।
এ সময়ে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা; আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ঘাটতি ৫৭ হাজার ৭০১ কোটি টাকা।
এডিপিতে ব্যাপক কাটছাঁটের মধ্যেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে। এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। সংশোধন প্রস্তাবে তা ৫৬১ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সংশোধিত এডিপিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৬ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগকে। এরপরেই রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, ২১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এরপরই রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, তাদের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিবেচনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা; রেল মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ২২৮ কোটি টাকা; পানিসম্পদের জন্য ১০ হাজার ২১২ কোটি টাকা, নৌপরিবহনের জন্য ৭ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা, সেতু বিভাগের জন্য ৫ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
যেভাবে কাটছাঁট হচ্ছে
গত বছরের ১৬ মে এনইসি সভায় চলতি ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জন্য ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া ঋণের তহবিল থেকে ১ লাখ কোটি টাকা জোগান দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল।
পরিকল্পনা কমিশন যে প্রস্তাব তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি অর্থ বছরের সংশোধিত এডিপির জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই খাত থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা বা বরাদ্দের ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
আর বৈদেশিক সহায়তা বা বৈদেশিক ঋণের তহবিল থেকে প্রায় ৮১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ কেটে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মূল এডিপি বরাদ্দের উভয় খাত থেকে গড়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ১৫ শতাংশ।



