Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

রেমিটেন্স-রপ্তানি আয়ের স্বস্তিও আটকে যাচ্ছে যেখানে

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ না বাড়লে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ না বাড়লে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
[publishpress_authors_box]

রেমিটেন্সে রেকর্ড, রপ্তানি আয়ও ভালো, তাতে রিজার্ভ উঠছে; কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ দেশের অর্থনীতিতে অস্বস্তি রেখেই দিচ্ছে।

এই সূচকের প্রবৃদ্ধি মে মাসে ফের ৭ শতাংশের নিচে নেমে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগ কমে যাবে। তার মানে হলো নতুন শিল্প স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণের গতি নেই। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ারও সুযোগ নেই, এই অর্থই দাঁড়ায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একে তো দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা বিনিয়োগের আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন না, তার ওপর যোগ হয়েছে ব্যাংক ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি।

এই অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ বেড়েছে, এটা ভালো। কিন্তু সূচকগুলো ভালো হলেই অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরবে না।

“যে করেই হোক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমি মনে করি, এখন বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেই সরকারের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।”

অঙ্ক কী দেখাচ্ছে

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় কমতে কমতে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছিল।

পরের দুই মাস প্রবৃদ্ধি খানিকটা বেড়ে ৭ শতাংশের উপরে উঠেছিল; মার্চে উঠেছিল ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশে। এপ্রিলে ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। মে মাসে আবার ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের নিম্নমুখী এই ধারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে শুরু হয়। মহামারির পর তখন ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাতে ডলারের দাম চড়ে যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অস্থিরতার মধ্যে তা আরও কমতে থাকে।

৩০ জুন ২০২৪-২৫ অর্থ বছর শেষ হয়েছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থ বছর। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মে মাসের তথ্য প্রকাশ করেছে।

তাতে দেখা যায়, বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের একাদশ মাস মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেড়েছে।

২০২৫ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। তার আগে নভেম্বরে ৭ দশমিক ৬৬, অক্টোবরে ৮ দশমিক ৩০, সেপ্টেম্বরে ৯ দশমিক ২০, আগস্টে ৯ দশমিক ৮৬, জুলাইয়ে ১০ দশমিক ১৩ এবং জুনে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ২৩ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মে মাস শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ৩ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এ হিসাবেই মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা আছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। সে হিসাবে ফেব্রুয়ারিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ পয়েন্ট কম হয়েছে প্রবৃদ্ধি।

শুধু তাই নয়; নতুন বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান নির্দেশক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানিও আশঙ্কাজনভাবে কমছে।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) মূল্যধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ কমেছে ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

এই ১১ মাসে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য ১৪১ কোটি ৯২ লাখ (১.৪১ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তারা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১৯৫ কোটি ৬৩ লাখ (১.৯৫ বিলিয়ন) ডলার।

সব মিলিয়ে দেশে শিল্প স্থাপনের নতুন উদ্যোগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে আছে।

এমন হলো কেন

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। সেই খাতে ঋণপ্রবাহ ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ হলো বিনিয়োগ থমকে যাওয়া। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে না। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি দামি হয়ে গেছে। একদিকে বেড়েছে ডলারের দাম, অন্যদিকে ব্যাংক সুদহারও চড়া। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ করতে গেলে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দরকার।

আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বাজারে পণ্যের চাহিদাও কমে গেছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের জন্য এ সময়টাকে মোটেই অনুকূল মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “দেশে সর্বত্র অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা; কোথাও স্বস্তি নেই। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করবে কে? ঋণ নেবে কে?”

তিনি বলেন, “করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ- একের পর এক ধাক্কায় আমাদের অর্থনীতি চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবার ঋণের সুদের হার বেড়েই চলেছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।”

“সত্যি কথা বলতে কি, দেশে এখন বিনিয়োগের অনুকুল পরিবেশ নেই। কবে স্বাভাবিক পরিবেশ আসবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই,” বলেন দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি পারভেজ।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদহার বাড়িয়েই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক; উঠেছে ১০ শতাংশে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

বেসরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার জন্য একে অন্যতম কারণ হিসাবে দেখান বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকের নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করছে। ফলে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমে গেছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনেরও একটা প্রভাব পড়েছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, দেশের বর্তমান অবস্থায় ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী- কেউই ঠিকমতো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছেন না। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। এর অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণ কীভাবে হতে পারে- প্রশ্নে ব্যাংকার মাহবুবুর রহমান বলেন, “বর্তমানে দেশে স্থিতিশীলতা নেই; অনিশ্চয়তা আছে। আগামী দিনগুলো কী হবে, নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। এমন অবস্থায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছেন। কারণ কোনও ব্যবসায়ীই অনিশ্চিত পরিবেশে বিনিয়োগ করেন না।”

“বেসরকারি খাতে ঋণ তখনই বাড়বে, যখন ব্যবসায়ীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে। এই আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত