Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

অভিযানে ইসরায়েল, প্রাণ বাঁচাতে গাজা থেকে পালাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা

ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান শুরু করায় গাজা শহর থেকে পালাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।
ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান শুরু করায় গাজা শহর থেকে পালাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।
[publishpress_authors_box]

পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করেছে ইসরায়েল, তা হচ্ছে গাজার পুরোটাই দখলে নেওয়া। সেই লক্ষ্যে গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে গাজা সিটি থেকে পালাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।

দুই বছর ধরে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পর এই মাসের শুরুতে গাজা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা অনুমোদন দেয় ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা।

সেই অভিযানের অংশ হিসাবে স্থলযুদ্ধ চালাতে ৬০ হাজার রিজার্ভিস্টকে তলবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী-আইডিএফের পরিকল্পনাও মঙ্গলবার নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে ব্যাপক এই অভিযান শুরু হবে বলে ধারণা করা হলেও তার আগেই আগস্টের শেষ ভাগে এসে গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের ভেতর যে দুটি অংশ নিয়ে ফিলিস্তিন, তার পশ্চিম অংশটি হলো গাজা। ভূমধ্য সাগর তীরের ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত গাজার ২০ লাখের বেশি বাসিন্দার ৯৯ শতাংশই মুসলমান।

এই গাজার উত্তর অংশে গাজা সিটি; ইসরায়েলি বাহিনী তার নিয়ন্ত্রণ নিতেই অভিযান শুরু করেছে। এই এলাকায় হামাসের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে, যে দলটি ইসরায়েলের অভিযান প্রতিরোধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিত স্থল অভিযানের প্রথম ধাপ শুরু করার পর ফিলিস্তিনিরা গাজা সিটির কিছু অংশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।

গাজা শহরের কাছেই গোলাবর্ষণ করছে ইসরায়েলি বাহিনী।

গাজা সিটির কাছের জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় ইসরায়েল সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে বোমা হামলা এবং গোলাবর্ষণ শুরুর পর এখন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছে। ফলে জেইতুন ও সাবরা এলাকা থেকে শত শত ফিলিস্তিনি উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে পড়ছে।

বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত অবিরাম গোলাবর্ষণ দেখার কথা জানিয়ে গাজা সিটির বাসিন্দা আহমাদ আল-শান্তি এএফপিকে বলেন, “রাতভর আমাদের বাড়ি কেঁপে কেঁপে উঠছিল- বিস্ফোরণ, গোলাবর্ষণ, যুদ্ধবিমান, অ্যাম্বুলেন্স আর সাহায্যের জন্য কান্নার শব্দ।”

সম্ভাব্য মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আওয়াজ ক্রমেই আমাদের আরও কাছে আসছে। কিন্তু আমরা কোথায় যাব?”

আমাল আবদেল-আল নামে এক ফিলিস্তিনি এক সপ্তাহ আগে সাবরা থেকে পালিয়ে গাজায় এসে আশ্রয় নেন।

তিনি বলেন, “গাজায় কেউ ঘুমায়নি, গত রাতেও না, গত এক সপ্তাহেও না। গোলাবর্ষণ এবং বিমান হামলা থামছেই না।”

ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র বুধবার বলেন, সৈন্যরা এরই মধ্যে জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় অবস্থান মজবুত করে অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছে।

আইডিএফ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি দেফরিন বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, “২২ মাসের যুদ্ধের পর হামাস এখন বিধ্বস্ত এবং ক্ষতবিক্ষত। আমরা গাজা সিটিতে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেব।”

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে হামাসকে ইঙ্গিত করে বলছেন, গাজা সিটি হলো ‘সন্ত্রাসীদের শেষ ঘাঁটি’।

গাজা শহরে ঢুকছে ইসরায়েলি ট্যাংক বহর।
গাজা শহরে ঢুকছে ইসরায়েলি ট্যাংক বহর।

অন্যদিকে হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, নেতানিয়াহু আসলে গাজা শহরের নিরীহ বেসামরিক মানুষদের বিরুদ্ধে একটি ‘পাশবিক যুদ্ধ’ শুরু করেছে।

যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারীদের নতুন উদ্যোগে সাড়া না দেওয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনাও করেছে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি।

কাতার ও মিশর একটি চুক্তিতে দুই পক্ষকে রাজি করাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রস্তাবে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং গাজায় এখনও আটকে থাকা ৫০ জন ইসরায়েলি জিম্মির প্রায় অর্ধেককে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

হামাস এমন চৃুক্তিতে রাজি হলেও তেল আবিব এখনও আনুষ্ঠনিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আর কোনও আংশিক চুক্তিতে যাবে না, বরং সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে।

ইসরায়েল সম্পূর্ণ গাজা দখলের পরিকল্পনা ধরে এগোনোর পর তাদের মিত্র অনেক দেশ এখন এর নিন্দা জানাচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, এটা উভয় জনগণের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং পুরো অঞ্চলকে একটি স্থায়ী যুদ্ধের চক্রে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করবে।

রেড ক্রস এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছে, গাজার ২০ লাখের বেিশ মানুষ এখনই বিপর্যয়ের মধ্যে আছে, নতুন করে অভিযান তা চরম করে তুলবে।

গাজার সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, বুধবার ইসরায়েলি হামলা ও গোলাবর্ষণে মোট ২৫ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গাজা সিটির পশ্চিমে শাতি শরণার্থী শিবিরের বদর এলাকায় একটি বাড়িতে বোমা হামলায় তিন শিশু এবং তাদের বাবা-মা নিহত হয়।

দুই বছরের যুদ্ধে ঘর হারিয়ে ফিলিস্তিনিদের অনেকে এখন গাজা সিটিতে তাঁবুতে বাস করছে।
দুই বছরের যুদ্ধে ঘর হারিয়ে ফিলিস্তিনিদের অনেকে এখন গাজা সিটিতে তাঁবুতে বাস করছে।

গাজায় হামাসের হাতে বন্দি থাকা ৫০ জন জিম্মিকে অক্ষত অবস্থায় মুক্ত করার কথা বলছে ইসরায়েলি বাহিনী, যদিও এদের মধ্যে ২০ জন জীবিত আছে বলে ধারণা করা হয়।

জিম্মিদের পরিবারের আশঙ্কা, এই অভিযান তাদের আটকে থাকা স্বজনদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।

রেড ক্রস সতর্ক করে বলেছে, গাজায় সামরিক অভিযান তীব্র হলে তা ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ এবং ইসরায়েলি জিম্মি উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয়কর হবে।

সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়, “কয়েক মাসের অবিরাম শত্রুতা এবং বারবার বাস্তুচ্যুতির পর গাজার জনগণ সম্পূর্ণ ক্লান্ত। তাদের আরও চাপের দরকার নেই, বরং স্বস্তি দরকার। আরও ভয়ের বদলে, তাদের একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দরকার।

“তাদের মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র: খাদ্য, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যবিধি সরবরাহ, পরিষ্কার জল এবং নিরাপদ আশ্রয় পেতে হবে।”

রেড ক্রস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং গাজাজুড়ে দ্রুত ও অবাধে মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও আরও ধ্বংস ও মৃত্যু এড়াতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে জিম্মি থাকা ইসরায়েলিদের মুক্তি দিতে হামাসের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আড়াইশ ইসরায়েলিকে বন্দি করলে ইসরায়েলও পাল্টা হামলা শুরু করে। যুদ্ধে এই পর্যন্ত গাজায় ৬২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, সিএনএন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found