Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় বাড়ল তেলের দাম

CRUDE-OIL
[publishpress_authors_box]

ইরানে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে বিগত কয়েকদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা উত্তপ্ত ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চলালে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

আর এই উত্তেজনার আঁচ লেগেছে তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে। সোমবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। পাশাপাশি তেলের দামও পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে, বাজারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরান বিশ্বের নবম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। আর এর প্রায় অর্ধেক রপ্তানি ও বাকি অংশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরান কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দেশটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রণালীর মধ্য দিয়েই বিশ্বব্যাপী মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এছাড়া ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।

ইরানের প্রভাবশালী দৈনিক ‘কায়াহান’-এর সম্পাদক যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় নৌবহরের ওপর আঘাত হানার এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে পশ্চিমা জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সোমবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটি জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ১২ ডলারে পৌঁছেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ৯৮ ডলারে।

জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাডের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রধান হোর্হে লেওন বলেন, “ইরান সরাসরি হামলা চালালে বা আঞ্চলিক তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানালে তেলের দাম হঠাৎ করেই খুব বেশি বেড়ে যেতে পারে। আর যদি তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া না-ও আসে, তবুও বাজারে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে তা গণ্য হবে এবং তেলের দামে বড় উল্লম্ফন দেখা যেতে পারে।”

ইসরায়েল ইরানে হামলার পর গত দশ দিনে তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার অতিক্রম করেনি। কারণ ওই অঞ্চলের তেল সরবরাহে কোনও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি। গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দিনে সর্বোচ্চ ৭৯ ডলারে পৌঁছায়, যা জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। তবে শুক্রবার বাজার বন্ধ হয় ৭৭ ডলারে।

এশিয়ার শেয়ারবাজারেও পতন লক্ষ্য করা গেছে। বিনিয়োগকারীরা সপ্তাহান্তের ঘটনার প্রভাব মূল্যায়ন করছেন এবং উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায়। 

এরইমধ্যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছে। এতে করে যুদ্ধের বিস্তারের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। আর নাসদাক ফিউচার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।

এশিয়ার বাজারে টোকিওর নিক্কেই সূচক দুপুরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে যায়। হংকং শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে ও সাংহাইয়ের বাজার ছিল স্থির। সিউল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ও সিডনি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। জাপান বাদে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারগুলোর সবচেয়ে বিস্তৃত সূচক এমএসসিআই শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।

ইউরোপের বাজারেও পতনের প্রবণতা দেখা গেছে। ইউরোস্টক্স ৫০ ফিউচার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে, এফটিএসই ফিউচার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ও ডিএএক্স ফিউচার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।

ইউরোপ ও জাপান আমদানি করা তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র একটি নিট রপ্তানিকারক দেশ।

কমোডিটি বাজারে স্বর্ণের দাম সামান্য কমেছে। প্রতি আউন্স স্বর্ণ শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৩ ডলার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডলার জাপানি ইয়েনের বিপরীতে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১৪৬ দশমিক ৪৮ ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। ইউরো শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১৪৮১ ডলারে। ডলার সূচক শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯৯ দশমিক ০৭৮।

এছাড়া সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং ১০ বছরের যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ২ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৩৯৭ শতাংশ।

আরও অস্থিরতা আসতে পারে

ইরান এর আগেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার হুমকি দিলেও কখনও তা বাস্তবায়ন করেনি। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানের প্রেস টিভি জানিয়েছে, ইরানের পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার পণ্য বিশ্লেষক বিবেক ধর রয়টার্সকে বলেন, “হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করার চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু হামলা চালিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচলে ভীতি সৃষ্টি করাই সম্ভবত ইরানের জন্য বেশি কার্যকর কৌশল।”

তিনি আরও বলেন, “ইরান বেছে বেছে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে আমরা ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমপক্ষে ১০০ ডলার ছুঁতে দেখব।”

ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ না করে এর বিকল্প প্রতিক্রিয়া হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব ও কাতারে অবস্থিত তেলক্ষেত্র ও অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাতে পারে। এই অঞ্চলের দেশগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। তারা বারবার যুদ্ধ বন্ধ এবং আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত রবিবার সকালে এক বিবৃতিতে জানায়, এই “বিপজ্জনক উত্তেজনা” অঞ্চলজুড়ে “ভয়াবহ পরিণতি” ডেকে আনতে পারে। সৌদি আরব বলেছে, তারা ইরানের পরিস্থিতি “গভীর উদ্বেগের সঙ্গে” পর্যবেক্ষণ করছে।

বিশ্লেষক জেমস ব্যামবিনো ও রিচার্ড জসউইক বলেন, “মূল প্রশ্ন হলো, এখন কী ঘটবে? ইরান কি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলা চালাবে, না তাদের সহযোগী মিলিশিয়াদের মাধ্যমে? ইরানের তেল রপ্তানি কি বন্ধ হয়ে যাবে? ইরান কি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে?”

তারা আরও বলেন, ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাহতও হলেও ওপেক প্লাস জোটের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মজুদের কারণে বাজারে তেলের জোগান যথেষ্ট থাকবে, যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালী খোলা থাকে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত