পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির তো আগেই জানিয়েছিলেন, এবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও জানালেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনোনীত করার খবর।
সোমবার হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজে আকস্মিকভাবেই তাকে মনোনীত করে নোবেল কমিটিকে পাঠানো চিঠিটি তার হাতে তুলে দেন নেতানিয়াহু।
নোবেল কমিটিকে সুপািরশ জানিয়ে লেখা সেই চিঠিতে নেতানিয়াহু লিখেছেন, এত অল্প সময়ে বিশ্ব শান্তির জন্য এতটা অর্জন আর কেউ দেখাতে পারেনি। ইতিহাসের যুগ বদলের এই সন্ধিক্ষণে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে যোগ্যতর আর কেউ নেই।
মধ্যাহ্ন ভোজের টেবিলে বিপরীত পাশে থাকা নেতানিয়াহু দাঁড়িয়ে বাম হাতে থাকা চিঠিটি ট্রাম্পের দিকে বাড়িয়ে দেন।
তার আগে তিনি বলেন, “আমি কেবল ইসরায়েলিদের পক্ষ থেকে নয়, সব ইহুদিদের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই।” খানিকটা থেমে বলেন, “আপনি এর যোগ্য।”
ট্রাম্প বসে থেকেই বাম হাত দিয়ে সেই চিঠি গ্রহণ করেন। নেতানিয়াহুকে তার ডাক নাম ‘বিবি’ সম্বোধন করে ধন্যবাদ জানিয়ে সেই চিঠি খুলে তাতে চোখ বুলিয়ে প্রথমেই ট্রাম্প বলে ওঠেন- ‘ওয়াও’।
তারপর চিঠির ওপর আবার চোখ বুলিয়ে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “বিশেষ করে আপনার কাছ থেকে এটা আসাটা খুবই অর্থবহ।”
এরপর চিঠির ভাঁজ বন্ধ করতে করতে ট্রাম্প বলেন, “এটা বড় সম্মানের।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে আগের মেয়াদের দায়িত্ব পালনের সময়ও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার মতো কাজ করেছিলেন বলে ট্রাম্প দাবি করে আসছেন। তার ভাষ্য, তিনি ডেমোক্রেট নন বলে নোবেল কমিটির চোখ তার ওপর পড়ে না।
গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পরও রিপাবলিকান ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “তারা আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেবে না। এটা খুব খারাপ। আমি এর যোগ্য, কিন্তু আমি জানি, তারা এটা কখনও আমাকে দেবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নোবেল শািন্ত পুরস্কার জয়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এমনও বলেছিলেন, “যদি আমার নাম ওবামা হতো, তাহলে এই পুরস্কার তারা আমাকে ১০ বার দিত।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে চারজন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে থিওডোর রুজভেল্ট বাদে বাকি তিনজনই (উড্রো উইলসন, জিমি কার্টার ও বারাক ওবামা) ডেমোক্রেট।
গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পকে মনোনীত করেছে ইসলামাবাদ।
বিশ্বের সব যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ফেরা ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে এখনও না পারলেও চার দিনের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করেন।
গত মে মাসের সেই যুদ্ধবিরতি ক্ষেত্রে ট্রাম্পের উদ্যোগের কথা পাকিস্তান সরকার স্বীকার করলেও ভারত সরকার স্বীকার করে না। নয়া দিল্লির দাবি, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায়ই থেমেছে ওই যুদ্ধ।
তবে গত মাসে ইসরায়েল-ইরানের যুদ্ধ ১২ দিনের মধ্যে থামানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা অনেকটাই দৃশ্যমান। ইরানে এক দফা হামলা চালিয়ে তিনিই প্রথম যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার কথামতোই পরে ইরান ও ইসরায়েলও আক্রমণ বন্ধ করতে দেখা গিয়েছিল।
ওই যুদ্ধের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সোমবারই প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ট্রাম্পের। আর সেখানেই ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে পাঠানো চিঠিটি হস্তান্তর করেন নেতানিয়াহু।
নোবেল কমিটিকে লেখা চিঠিতে নেতানিয়াহু লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বকে শান্তিময়, নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রয়েছে অদম্য আগ্রহ। তার প্রচেষ্টা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
নরওয়ের নোবেল কমিটিকে লেখা নেতানিয়াহুর চিঠিটি দেখা যাচ্ছে ১ জুলাই তারিখের। তবে ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন জমার সময় তার পাঁচ মাস আগেই ফুরিয়ে গেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নামের সুপারিশ পাঠাতে হয় নোবেল কমিটিতে। তারপর মার্চে একটি শর্ট লিস্ট করা হয়ে থাকে। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো মনোনীত নামগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করে। অক্টোবরে বিজয়ীর নাম ঘোষণার পর ডিসেম্বরে পুরস্কার দেওয়া হয়।
সময়ের পরে কোনও নাম এলে তা পরবর্তী বছরের বিবেচনার জন্য চলে যায়। সেক্ষেত্রে ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর সুপারিশ ২০২৬ সালের বিবেচনায় চলে যাওয়ার কথা।

অবশ্য এবারের নামের তালিকায়ও ট্রাম্পের নাম রয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে; যদিও নোবেল কমিটি কখনও সুপারিশকরা নামের তালিকা প্রকাশ করে না। ৫০ বছর পরই কেবল তা জানা যায়।
শান্তিতে কে পাবেন নোবেল, তা ঠিক করতে নরওয়ের পার্লামেন্ট পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেল ঠিক করে দেয়। ওই প্যানেলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেলের জন্য ৩৩৮টি নামের সুপারিশ এসেছে বলে নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে। তার মধ্যে ২৪৪ জন ব্যক্তি এবং ৯৪টি প্রতিষ্ঠান। এবারের নামের সুপারিশ গত বছরের চেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে নামের সুপারিশ ছিল ২৮৬টি। সবচেয়ে বেশি সুপারিশ ৩৭৬টি ছিল ২০১৬ সালে।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য কাউকে মনোনীত করার ক্ষমতা সবার থাকে না। নয় ধরনের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেবল এই নাম পাঠাতে পারে।
তারা হচ্ছে- কোনও রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, মন্ত্রী, কোনও দেশের পার্লামেন্ট সদস্য; হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের বিচারক; ফ্রান্সভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ল’র সদস্য; উইমেন্স ইন্টারন্যাশনাল লিগের আন্তর্জাতিক বোর্ডের সদস্য; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন, দর্শন, ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক;
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির বর্তমান ও সাবেক সদস্য; নোবেল কমিটির সাবেক উপদেষ্টা; নোবেলজয়ী কোনও ব্যক্তি; নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।
তবে ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেউ নিজের নাম প্রস্তাব করতে পারেন না।
তথ্যসূত্র : গার্ডিয়ান, টাইমস অব ইসরায়েল, দ্য নোবেল প্রাইজ



