Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

শেষযাত্রায় সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার

বিভুরঞ্জন সরকার।
বিভুরঞ্জন সরকার। ফাইল ছবি
[publishpress_authors_box]

একদিন নিরুদ্দেশ থাকার পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের সৎকার করা হয়েছে ঢাকার বাসাবোর সবুজবাগের বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দিরে।

ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার দুপুরে তার মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে ‘অপ্সরা’ নামের যে বাসায় তিনি ভাড়া থাকতেন, সেখানে।

‘অপ্সরা’য় মৃতদেহ আনার পর বিভুরঞ্জন সরকারকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় জমান তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনরা। পরে মৃতদেহ নিয়ে ফ্রিজিং গাড়ি বাসাবোর দিকে রওনা হয়।

এর আগে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পুলিশ ও স্বজনদের উপস্থিতিতে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই’

বিভুরঞ্জন সরকারের শরীরের বাইরে ও ভেতরে আঘাতের কোনও চিহ্ন নেই বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্ত সম্পন্নকারী মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) শেখ মো. এহসানুল ইসলাম।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “লাশটি পানি থেকে এসেছে। লাশ হালকা পচনশীল ছিল। আমরা যত দূর দেখেছি, শরীরের বাইরে ও ভেতরে আঘাতের চিহ্ন পেলাম না। তারপরও শরীরের কিছু অংশ—দাঁত, চুল, লিভার, কিডনি, পাকস্থলী—নিয়েছি। এগুলো ফ্রিজিং করে ঢাকায় পাঠাচ্ছি। প্রতিবেদন আসার পরে আমরা চূড়ান্ত মন্তব্য দিতে পারব।”

শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের কলাগাছিয়া এলাকায় মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ৭১ বছর বয়সী সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মরদেহ।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কর্মস্থল বনশ্রীতে আজকের পত্রিকায় যাওয়ার উদ্দেশে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। নিজের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও বাসায় রেখে যান তিনি।

পরে পরিবারের পক্ষ থেকে আজকের পত্রিকায় যোগাযোগ করা হলে তারা জানতে পারে, সেখানে যাননি বিভুরঞ্জন সরকার।

বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর কোনও সন্ধান না পেয়ে রাতে রমনা থানায় জিডি করেন বিভুরঞ্জনের ছেলে ঋত সরকার।

বিভুরঞ্জন সরকারের নিরুদ্দেশ হওয়ার পর তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টায় তার একটি ‘খোলা চিঠি’ তাদের মেইলে আসার কথা জানিয়ে শুক্রবার বিকালে তা প্রকাশ করে। ওই চিঠির ফুটনোটে তিনি লিখেছিলেন, “জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।”

এথেকে ধারণা করা হচ্ছে যে বিভুরঞ্জন সরকার আত্মহত্যা করেছেন। তিনি হতাশায় ভুগছিলেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন তার ছোট ভাই কলামনিস্ট চিররঞ্জন সরকার। তবে পুলিশ এবিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলেনি।

বিভুরঞ্জন সরকার সেই চিঠিতে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা, নিজের ও ছেলের অসুস্থতা, তার চিকিৎসক মেয়ে এবং প্রকৌশলী ছেলের যথার্থ মূল্যায়ন না হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরে খেদের কথা লিখেছিলেন।

তার ভাষ্যে, “আমার জীবনে কোনও সাফল্যের গল্প নেই। সাংবাদিক হিসেবেও এডাল-ওডাল করে কোনও শক্ত ডাল ধরতে পারিনি। আমার কোথাও না কোথাও বড় ঘাটতি আছে। এই ঘাটতি আর কাটিয়ে ওঠা হলো না।”

১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া বিভুরঞ্জন সরকার পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন তিনি, যুক্ত ছিলেন বাম আন্দোলনেও।

দৈনিক আজাদের মফস্বল সংবাদদাতা হিসাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন বিভুরঞ্জন সরকার; কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতায়ও কাজ করেন তিনি।

শফিক রেহমান সম্পাদিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে কাজের মধ্য দিয়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যায়যায়দিনে ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে লেখা তার রাজনৈতিক নিবন্ধ পাঠকপ্রিয় ছিল।

এরপর সাপ্তাহিক মৃদুভাষণের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে সাপ্তাহিক চলতিপত্রের সম্পাদক হন তিনি। দৈনিক মাতৃভূমিও তার সম্পাদনাতেই বের হয়। দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক রূপালীতেও কাজ করেন তিনি।

পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে যান বিভুরঞ্জন সরকার। তবে এনিয়েও নিজের হতাশার কথা লিখে যান শেষ চিঠিতে- “দৈনিক ‘জনকণ্ঠ’ যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন প্রথম পৃষ্ঠায় আমার লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপা হতো। অথচ এখন কোনও কোনও পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে ছাপার জন্য অনুরোধ করেও ফল পাই না। আমার লেখা নাকি পাঠক আর সেভাবে ‘খায়’ না। এক সময় কত খ্যাতিমান লোকেরা আমার লেখা পড়ে ফোন করে তারিফ করেছেন।”

আর্থিক টানাপড়েন নিয়ে বিভুরঞ্জন লিখেছেন, “এখন আমার দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় ওষুধ খেয়ে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিয়ে এবং ওষুধ কেনার টাকার চিন্তায়।”

নিজের কারণে সন্তানদেরও বিপাকে পড়তে হয়েছে বলে ধারণার কথা লিখে গেছেন তিনি- “আমার সংসারে স্ত্রী ছাড়া দুই সন্তান। এক মেয়ে, এক ছেলে। ছেলেমেয়েরাও আমার মতো একটু বোকাসোকা। বর্তমান সময়ের সঙ্গে বেমানান।”

পাঁচ দশকের সাংবাদিকতা জীবনে সত্য প্রকাশে ঝুঁকি নেওয়ার কথা লিখে গেছেন বিভুরঞ্জন সরকার। সেই সঙ্গে বলেছেন, এজন্য কখনও সরকারি কোনও সুবিধা তিনি নেননি।

“শুধু মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অবিচল অবস্থানের কারণে আমাকে আজও ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দেওয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী আমলেও কোনও বাস্তব পুরস্কার পাইনি। আমি পেলাম না একটি প্লট, না একটি ভালো চাকরি। বরং দীর্ঘ সময় চাকরিহীন থেকে ঋণের বোঝা বেড়েছে। স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে পরিবারের দায়বদ্ধতা আমাকে প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে রাখে।”

বিভুরঞ্জন লিখেছেন, “রাজনৈতিক আদর্শবোধ ও সাংবাদিকতার নৈতিক সততা আমাকে ব্যক্তিগত সুখভোগের জন্য তাড়িত করেনি। একটাই তাড়না–দায়িত্ববোধ। আমি জ্ঞানত কখনও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করিনি। নিজের কাজে ফাঁকি দেইনি। খুব সাহসী মানুষ হয়তো আমি নই, কিন্তু চোখ রাঙিয়ে কেউ আমাকে দিয়ে কিছু লেখাতে পারিনি।

“অনেকেই সুবিধা, স্বার্থ, সামাজিক মর্যাদা বা আর্থিক স্বার্থের জন্য সত্যকে আড়াল করে লেখেন। আমি নাম আড়াল করলেও সত্য গোপন করিনি। তাই হয়তো দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় এই পেশায় কাটিয়ে সন্মানজনক বেতন-ভাতা পাই না।”

একটি কলাম ছাপানোর কারণে নিজের সর্বশেষ কর্মস্থল আজকের পত্রিকায়ও চাপে পড়ার কথা লিখে গেছেন বিভুরঞ্জন।

“আমি লিখি, কারণ আমি জানতাম সাংবাদিকতা মানে সাহস। সত্য প্রকাশ মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার নাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, সত্য লিখতে হলে কখনও কখনও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য হারাতে হয়। আমি তেমন স্বাচ্ছন্দ্য চাইনি কখনও। তবে সারাজীবন হাত পেতে চলতে হবে, এটাও চাইনি,” বলে গেছেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত