Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

চলে গেলেন যতীন সরকার

jatin-sarkar
[publishpress_authors_box]

অধ্যাপক যতীন সরকার আর নেই; ১৯৩৬ সালে যে জীবনের শুরু করেছিলেন তিনি, ৮৯ বছর পেরিয়ে তার ইতি টানলেন তিনি।

শিক্ষকতা করতেন যতীন সরকার; বাংলার অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক হিসাবে খ্যাতিও কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিচয় ছাপিয়ে বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবী হিসাবেই তাকে বেশি চিনত সবাই।

নিজের সম্পর্কে যতীন সরকার বলে গিয়েছিলেন, “সারাজীবন মাস্টারি করেছি। ক্লাসে আমি সিলেবাস পড়িয়েছি। কর্তৃপক্ষ বিরাগ হতে পারেন– এই বিবেচনায় ক্লাসে সিলেবাসের বাইরে এক তুলা কথাও প্রকাশ করিনি।

“কিন্তু সময়, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি নিয়ে আমারও বলার কিছু আছে। যে-সময়ের ভেতরে বসবাস করি সে-সময়কে মানা-না-মানার আমার নিজস্ব দৃষ্টি ও অভিজ্ঞান আছে। সেই কথাই আমি লিখি। আমার লেখালেখিই আমার মাস্টারি।”

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন যতীন সরকার; দুই মেয়াদে সভাপতি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর।

লেখক হিসাবে ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভুষিত হন যতীন সরকার। তার আগে ২০০৭ সালে পেয়েছিলেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পদক।

যতীন সরকারের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোনার কেন্দুয়ার চন্দপাড়া গ্রামে। শিক্ষকতার সূত্রে জীবনের বেশিরভাগ সময় তার কাটে ময়মনসিংহে।

ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। ৪২ বছরের বেশি সময় শিক্ষকতার পর ২০০২ সালে অবসর নিয়ে স্ত্রী কানন সরকারকে নিয়ে ফিরে যান নেত্রকোনায়। সেখানে শহরের সাতপাই এলাকার নিজ বাড়িতেই থাকতেন তিনি।

গত কয়েক বছর ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে কাবু হয়ে পড়েছিলেন যতীন সরকার; আর্থ্রারাইটিসেও আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

এর মধ্যে গত জুন মাসে পড়ে গিয়ে উরুর হাড়ে আঘাত পান। অস্ত্রোপচারের পর ময়মনসিংহে মেয়ের বাসায় কিছু দিন ছিলেন তিনি। আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সম্প্রতি তাকে ময়মনসিংহে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল; এরপর ভর্তি করা হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বুধবার বিকালে সেখানেই তার মৃত্যু হয় বলে কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির ময়মনসিংহ জেলা সভাপতি এমদাদুল হক মিল্লাত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ উদীচীর ময়মনসিংহ কার্যালয়ে নেওয়া হবে বলে জানান সিপিবির ময়মনসিংহ জেলার সাধারণ সম্পাদক শেখ বাহার মজুমদার। সেখান থেকে মরদেহ নেত্রকোনায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

যতীন সরকার মননশীল সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বাম রাজনীতি এবং আন্দোলনে সমান সক্রিয় ছিলেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গেলেও হতাশ হয়ে পড়েননি যতীন সরকার।

উল্টো তিনি বলেছিলেন, “আমি ভাবতাম, কমিউনিস্ট পার্টির মতো এত বড় আর ধীমান সদস্যদের পার্টিতে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। এত বড় পার্টিতে দীন আমি একজন সদস্য। কিন্তু আজকে আমি বুঝতে পারছি, কতগুলো মূর্খের নেতৃত্বে আমি পার্টি করে গেছি।

“তাই পার্টি ভাঙনের দিন সম্পূর্ণ একা হয়ে গেছি। হতাশা কিংবা দুঃখ প্রকাশ নয়, মাটিবর্তী হয়ে পার্টি ও সময় সম্পর্কে আমার একটি নিজস্ব দলিল লিখেছি। যার মর্মার্থ, ‘এই পার্টি আমাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি নয়, এই পার্টি ভাঙার অধিকার আমরা রাখি না। পার্টির তৃণমূল কংগ্রেস না ডেকে আমরা পার্টি ভাগ করতে পারি না।”

তার সম্পর্কে প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছিলেন, “আদর্শবাদের প্রতি পক্ষপাত ছাড়া অন্য কোনও পক্ষপাতে তিনি দুষ্ট নন।”

‘অর্গানিক বুদ্ধিজীবী’ বলতে যা বোঝায়, যতীন সরকারকে তা-ই মনে করেন অনেকে। তিনিও মনে করতেন, রাজনীতি হচ্ছে পথ কিংবা উপলক্ষ; সংস্কৃতি হচ্ছে লক্ষ্য। সংস্কৃতিবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব অসম্ভব।

যতীন সরকারের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু- দর্শন’ এই ভূখণ্ডের গত এক শতকের ইতিহাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “একাত্তরে আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। এই বয়সেই ত্রিকালদর্শী হয়ে গেলাম। ব্রিটিশ শাসনের অবসান আর পাকিস্তানের জন্ম দর্শন করলাম। আবার দর্শন করলাম পকিস্তানের মৃত্যু আর বাংলাদেশের জন্মও।

“বাংলাদেশের জন্মের ক্ষণটিতে কিন্তু মোটেই ভাবতে পারিনি যে অল্প দিনের মধ্যেই বাংলাদেশেই আমাকে পাকিস্তানের ভূত দেখতে হবে।”

তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশী কবিগান, সাহিত্যের কথা প্রত্যাশা, সংস্কৃতির সংগ্রাম , গল্পে গল্পে ব্যকরণ, দ্বিজাতিতত্ত্ব, নিয়তিবাদ ও বিজ্ঞানচেতনা।

তাকে নিয়ে ২০০৬ সালে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন তানভীর মোকাম্মেল।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found