ফিলিস্তিনের গাজায় তীব্র স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই অভিযানের নাম তারা দিয়েছে গিদিয়ন’স চ্যারিটস।
হামাসের সঙ্গে গত মার্চে যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসার পর গাজায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব।
এমন পটভূমিতেই শুরু হয়েছে ইসরায়েলের এই অভিযান, যাতে এরই মধ্যে নিহত হয়েছে শত শত মানুষ।
গাজায় হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দিতে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও তাকে এ চাপ দিচ্ছে।
এই অবস্থায় ইসরায়েল গাজায় এমন ব্যাপক মাত্রায় স্থল অভিযান শুরু করল কেন? এর মাধ্যমে কী অর্জন করতে যাচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু?
গিদিয়ন’স চ্যারিটস কী
অপারেশন গিদিয়ন’স চ্যারিটস হলো গাজায় ইসরায়েল পরিচালিত বড় ধরনের স্থল অভিযান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় প্রায় ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর এই অভিযান শুরু হয়।
ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর সহায়তায় এই অভিযান গাজার দক্ষিণ এবং উত্তর উভয় অঞ্চলেই চালানো হচ্ছে।
গত শনিবার দোহায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনার দ্বিতীয় দিন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজায় এই হামলা শুরু করে ইসরায়েল।
সাধারণত এ ধরনের আলোচনার সময় অভিযান ও হামলা জোরদার করে থাকে ইসরায়েল।
তারা জানিয়েছে, গাজায় সর্বশেষ এই অভিযান হামাসের ওপর ‘ব্যাপক চাপ’ তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলা শুরু করেন এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর শেষ করেন।
এই মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় তিনি অবশ্য ইসরায়েল যাননি।

অভিযানের লক্ষ্য
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তারের লক্ষ্যে গিদিয়ন’স চ্যারিটস অভিযান শুরু করা হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তি ও হামাসকে পরাজিত করাও এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে তারা।
এদিকে বন্দিদের মুক্তির বিষয়কে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় ইসরায়েলি সমাজের একাংশ, বিশেষ করে বন্দিদের পরিবারগুলো বারবার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করে যাচ্ছে।
তাছাড়া যুদ্ধ বন্ধ ও বন্দিমুক্তির জন্য হামাস যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তা যে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, সেটারও সমালোচনায় মুখর খোদ ইসরায়েলিরা।
গিডিয়ন’স চ্যারিয়টস শুরুর এক সপ্তাহ আগে নেতানিয়াহুর একটি বক্তব্য ফাঁস হয়। তিনি গাজার বাইরে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তর নিয়ে কথা বলেছিলেন সেই বক্তব্যে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির ওই রুদ্ধ দুয়ার বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, “আমরা গাজায় আরও অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস করছি। তাদের আর ফেরার কোনও জায়গা নেই।
“গাজার মানুষদের গাজা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে চাওয়াই হবে একমাত্র অনিবার্য পরিণতি।”

৩ দিনে নিহত ১৪৪
গাজার স্বাস্থ্যসেবার সূত্রগুলো বলছে, গত রবিবার গিদিয়ান’স চ্যারিটস অভিযান শুরুর পর কমপক্ষে ১৪৪ জন মানুষ নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম বোমা হামলায় গাজার উত্তরাঞ্চলে অন্তত ৪২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পাঁচজন সাংবাদিক।
আর গাজার দক্ষিণে খান ইউনিস শহরের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের এক তাঁবুতে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং ১০০ জনের বেশি আহত হয়।
তবে রবিবার অভিযান শুরুর পর গাজায় এমন তীব্র হামলা শুরু হয়েছে, তা নয়। আগে থেকেই ফিলিস্তিনের ওই অঞ্চলে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছিল ইসরায়েল।
গত সপ্তাহে গাজার ৬৭০টি স্থানে ‘হামাসকে’ লক্ষ্য করে স্থল ও বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। পাঁচ দিনে কমপক্ষে ৩৭০ জন ফিলিস্তিনি তাদের হাতে নিহত হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ লাখ ২১ হাজার ৩৪ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় ইসরায়েলের হামলার মাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি করছেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের আশঙ্কা, এই হয়তো তাদের শেষ লেখা।

গাজার মানবিক পরিস্থিতি
গোটা গাজা এখন দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে।
মৌলিক মানবিক সরবরাহ যেমন খাবার, জ্বালানি, চিকিৎসা সহায়তা, শিশুদের টিকা গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল।
গত মার্চের ২ তারিখে গাজায় সব ধরনের সহায়তা প্রবেশ একেবারে বন্ধ করে দেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার তার প্রতি গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানালেও তা শুনছেন না ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, “দুই মাসের বেশি সময় ধরে গাজা অবরুদ্ধ করে রাখার কারণে ২০ লাখ মানুষ না খেয়ে আছে।
“অথচ গাজা সীমান্ত থেকে মিনিট কয়েকের হাঁটা দূরত্বে অপেক্ষা করে আছে ১ লাখ ১৬ হাজার টন খাবারবোঝাই ট্রাক।”
জাতিসংঘ বলছে, গাজায় প্রতি ৫ জন ফিলিস্তিনির মধ্যে একজন অনাহারে ভুগছে। আর বছরের শুরু থেকে ইসরায়েলের চলমান খাদ্য অবরোধের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৯ হাজার শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় হাসপাতালে ভর্তি।
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা


