রক্তের সঙ্কট মোকাবেলা ও নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায় বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম রক্ত তৈরি করার উপায় খুঁজছেন অনেক বছর ধরেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে লাখো মানুষ শুধু রক্তের অভাবে মারা যায়।
রক্ত শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে এবং বর্জ্য পদার্থ অপসারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো গবেষণাগারে তৈরি রক্ত মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ করে বিরল গ্রুপের রক্তের রোগীদের জন্য।
বিজ্ঞানীরা জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার ও রক্ত সঞ্চালনে সহায়তার জন্য কৃত্রিম রক্ত তৈরির চেষ্টা করছেন। প্রশ্ন হলো বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম রক্ত তৈরির কতটা কাছাকাছি পৌঁছেছেন?

কৃত্রিম রক্ত কী
কৃত্রিম রক্ত মানুষের তৈরি। এতে কোনও মানব কোষ নেই। এটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। এই বিশেষভাবে তৈরি অণুগুলো রক্তকণিকার মতো কাজ করে এবং শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে। এটি মূলত জরুরি ও সামরিক চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। যাতে যেখানে বিরল রক্তের গ্রুপ না পাওয়া গেলে কৃত্রিম রক্ত সরবরাহ করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ৪৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ‘এরিথ্রোমার’ তৈরিতে। এটি একটি কৃত্রিম রক্ত প্রতিস্থাপক, যা সব রক্তের গ্রুপের জন্য উপযুক্ত এবং সংরক্ষণের জন্য ঠাণ্ডা রাখার দরকার হয় না।
এটি এখনও গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিতের জন্য। অন্যদিকে গবেষণাগারে তৈরি রক্ত মানুষের লাল রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে। এটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রস্তুত করা হয়।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির সংক্রমণ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সেড্রিক জেভার্টের মতে, গবেষণাগারে তৈরি রক্তকণিকা সহজলভ্য হলে কিছু রোগের চিকিৎসা আরও কার্যকর হতে পারে।
গবেষণাগারে তৈরি প্লাটিলেট আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের রক্তপাত বন্ধ করতে বেশি কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে লিউকেমিয়ার রোগীদের প্লাটিলেট দেওয়া হয় রক্তপাত প্রতিরোধে, বন্ধ করার জন্য নয়।
গবেষণাগারে কীভাবে রক্ত তৈরি হয়
কৃত্রিম রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় স্টেম কোষ দিয়ে। এটি বিশেষ ধরনের কোষ, যা শরীরের বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে। স্টেম কোষ থেকে লাল রক্তকণিকা, প্লাটিলেট (যা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে) বা ত্বকের কোষ তৈরি হতে পারে। এটি নির্ভর করে কোষের অবস্থান ও ধরনের ওপর।
বিজ্ঞানীরা হেমাটোপয়েটিক স্টেম কোষ ব্যবহার করেন। এটি সব ধরনের রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে শ্বেত রক্তকণিকা, লাল রক্তকণিকা ও প্লাটিলেট। এই স্টেম কোষ হাড়ের ভেতরের নরম অংশে (বোন ম্যারো) বা রক্তদাতার রক্তে পাওয়া যায়।
স্টেম কোষকে লাল রক্তকণিকায় পরিণত করতে গবেষণাগারে বিশেষ পরিবেশে রাখা হয়। সেখানে কোষ বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক উপাদান (গ্রোথ ফ্যাক্টর) ব্যবহৃত হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, এই স্টেম কোষ ধীরে ধীরে পরিপক্ব লাল রক্তকণিকায় পরিণত হয় এবং স্বাভাবিক রক্তকণিকার মতো কাজ করে।
অধ্যাপক জেভার্ট ব্যাখ্যা করেন, বিজ্ঞানীরা ‘জিন সম্পাদনা’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্টেম কোষ পরিবর্তন করতে পারেন। এটি রক্ত উৎপাদন বাড়াতে এবং রক্তের গ্রুপ শনাক্তকারী উপাদান সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। এর ফলে, এমন রক্ত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা যেকোনো ব্যক্তির শরীরে নিরাপদে দেওয়া যাবে। রক্তের গ্রুপ মেলানোর প্রয়োজন হবে না।

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম রক্ত তৈরির কতটা কাছাকাছি
গবেষণাগারে তৈরি বা কৃত্রিম রক্ত এখনও গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে একটি পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে গবেষণাগারে তৈরি লাল রক্তকণিকা সঞ্চালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল এর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চিকিৎসায় বাণিজ্যিকভাবে কৃত্রিম রক্ত ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এছাড়া গবেষণাগারে তৈরি রক্ত উৎপাদনের খরচ এখনো অনেক বেশি। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (ডিএআরপিএ) জানায়, গবেষণাগারে এক ইউনিট রক্ত উৎপাদনে ৯০ হাজার ডলারের বেশি খরচ হয়।
অবশ্য উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বর্তমানে এই খরচ কমে ৫ হাজার ডলারের নিচে এসেছে। তুলনামূলকভাবে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলো এক ইউনিট দান করা লাল রক্তকণিকার জন্য গড়ে ২১৫ ডলার ব্যয় করেছে। অর্থাৎ কৃত্রিম রক্ত তৈরির খরচ এখনও অনেক বেশি।
কৃত্রিম রক্ত ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হয়। সেটি ছিল এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রথম উদাহরণ। ২০২২ সালে জাপানে একটি ছোট পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে হিমোগ্লোবিন ভেসিকলস পরীক্ষা করা হয়েছিল। এগুলো কৃত্রিম রক্তের উপাদান, যা প্রকৃত লাল রক্তকণিকার মতো অক্সিজেন পরিবহন করতে ডিজাইন করা হয়েছে। এগুলো সাধারণ রক্ত সঞ্চালনের নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প হতে পারে কি না, তাই পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল।
ওই গবেষণায় ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১২ জন সুস্থ পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়েছিলেন। তাদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল। প্রতিটি গ্রুপের সদস্যদের পর্যায়ক্রমে ১০ মি.লি., ৫০ মি.লি., ও ১০০ মি.লি. ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল।
কিছু অংশগ্রহণকারীর সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। যেমন জ্বর ও চর্মরোগ। কিন্তু এটি দ্রুত ঠিক হয়ে যায়। রক্তচাপে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

বাণিজ্যিক উৎপাদন কবে নাগাদ
বাণিজ্যিকভাবে রক্ত উৎপাদনের পথে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। এই বাধাগুলোর মধ্যে একটি হলো, চাহিদা অনুসারে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং গবেষণাগারে তৈরি বা কৃত্রিম রক্তের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিতের উপায় কি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) ও ইউরোপীয় ঔষধ সংস্থা (ইএমএ) কৃত্রিম রক্তকে কোষ থেরাপি হিসেবে বিবেচনা করা হবে নাকি ঔষধ হিসেবে, তা নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কারণ এই সংস্থাগুলোও উপরই ওই পণ্যের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে।
শুধু তাই নয়, পণ্য হিসেবে কৃত্রিম রক্ত যেকোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যই নতুন বিষয়। একে নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সরবরাহের প্রতিটি স্তর এখনও অজানা।
বিরল গ্রুপের রক্ত ও কৃত্রিম রক্ত উৎপাদন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম রক্ত বিশ্বব্যাপী রক্তের অভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য-আয়ের দেশগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন রক্ত দান সংগ্রহ করা হয়। এর ৪০ শতাংশ উঁচু আয়ের দেশগুলো থেকে আসে। যদিও এই দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ১৬ শতাংশ।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা চাহিদা মেটাতে প্রতি ১ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ২ হাজার ইউনিট রক্তের প্রয়োজন। তবুও অনেক দেশে, বিশেষত সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও ওশেনিয়াতে রক্তের গুরুতর সংকট রয়েছে।
যেসব অঞ্চলে রক্তের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কম, সেখানে রক্তপাতজনিত মৃত্যুর হার ধনী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। নিম্ন ও মধ্য-আয়ের দেশের গ্রামীণ জনপদগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে ৭৫ শতাংশেরও বেশি রোগী রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্ত পান না।
তবে, এই সঙ্কট মূলত রক্ত সংরক্ষণ ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে। রক্তের ব্যাংকগুলো প্রায়ই অনেক দূরে থাকে। ফলে এই অঞ্চলের চিকিৎসকরা জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হন।
অধ্যাপক জেভার্ট বলেন, গবেষণাগারে তৈরি রক্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হবে সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে এর দ্রুত ব্যবহার করতে পারা। যেমন মহামারি, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়। তখন রক্তের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়।
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা



