ঢাকার গুলশানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুধবার ছড়িয়ে পড়ে।
চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক জানে আলম অপু ভিডিওটিতে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওই চাঁদাবাজির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন।
বৃহস্পতিবার বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, এমন কোনও ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তিনি বলছেন, পূর্বপরিচয় থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর জানে আলম অপুর সঙ্গে তার দেখা হয়নি।
এদিকে ওই ভিডিও ফাঁসের পেছনে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন জড়িত বলে অভিযোগ তুলেছেন অপুর স্ত্রী কাজী আনিশা। এ বিষয়ে জানতে ইশরাক হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
কী ছিল ভিডিওতে
বুধবার রাতে ৩৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেইসবুকে। সেখানে কথা বলতে দেখা যায় গুলশানে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার বাগছাসের বহিষ্কৃত নেতা জানে আলম অপুকে।
দীর্ঘ এই ভিডিওতে কেন ও কীভাবে তিনি গুলশানের ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন আর তারপর তার ভাষায় ‘ফেঁসে গিয়েছিলেন’- সে বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায় তাকে।
ভিডিওর অপর প্রান্ত থেকে এ সময় কাউকে প্রশ্নও করতে শোনা যায়।
ভিডিওতে অপুকে বলতে শোনা যায়, ১৬ জুলাই রাত পেরিয়ে ১৭ তারিখ ভোর ৪টা ১০ থেকে ৪০ মিনিট, এই আধা ঘণ্টার মধ্যে গুলশান ২ পার হয়ে ওয়েস্টিন হোটেলের নিচে সাদা সিএফমোটো বাইকে হেলমেট পরা অবস্থায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার সঙ্গে কথা বলেন।
তার বলা এই কথাগুলোর সময় ভিডিওর ওপর দিয়ে চলতে থাকে ওই তারিখের রাত ৪টা ১০ থেকে ১১ মিনিটের একটি সিসিটিভি ফুটেজ। সেখানে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয় একটি অংশ। এরপরই একটি বাইককে সেখান থেকে চলে যেতে দেখা যায়।

রিয়াদ নামে একজনের প্রসঙ্গ টেনে ভিডিওতে অপু বলেন, “রিয়াদ বলছিল, রাতে ওই যে ভাই আসছিল। এখন সমীকরণটা আপনারাই মেলান।”
“সব ভাইরাই এতে জড়িত” দাবি করে অপু বলেন, “এটা ওপেন সিক্রেট।”
অপুকে আরও বলতে শোনা যায়, “এটা চোখের সামনে আপনাদের, কে কী করছে। আঙুল ফুলে কলা গাছ কীভাবে হইছে। যেসব ছেলেপেলেরা হলে থাকতে পারতো না ছাত্রলীগের যন্ত্রণায়, বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবে সেই টাকা থাকতো না, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের থেকে টাকা ধার নিয়ে থাকতে হতো, ডোনেশনে যাদের মেস ভাড়া চলছে, তারা এখন ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকে। নিজস্ব গাড়িতে চলাফেরা করে।”
যা বললেন আসিফ মাহমুদ
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তোলা অপুর এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
২০২২ সালে ছাত্র অধিকার পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় থেকে জানে আলম অপুকে চেনেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন তিনি।
“কিন্তু ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর ওর সঙ্গে আমার কখনও দেখা হয় নাই, কথাও হয় নাই এবং রিয়াদ নামে আরেকজনের কথা যে বলা হচ্ছে, তাকে আমি চিনি না এবং ওরও আমাকে চেনার কথা না। কারণ আমাদের কখনও দেখা হয় নাই,” বলেন আসিফ মাহমুদ।
সিসিটিভি ফুটেজে যে তাকেই দেখা যাচ্ছে, এমন কিছুও পাননি বলেও মন্তব্য করেন এই উপদেষ্টা।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর সেদিন রাতে ওয়েস্টিনের কাছে তার থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, “মাঝে মধ্যেই রাতে যখন কাজ শেষ হয়, কখনও কখনও ভোরও হয়ে যায়, ওই সময়ে আসলে রাতের খাওয়া-দাওয়া দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। আমি বেশিরভাগই যাই ৩০০ ফিটের নীলা মার্কেট বলে একটা জায়গায়। ওখানে হাসের মাংস খুব ভালো পাওয়া যায়।”
“তো ওখানে হয়তো যাই চার-পাঁচজন মিলে। ওটা আবার বেশি ভোর হয়ে গেলে বন্ধ থাকে। তখন ওদিকে ওয়েস্টিনে যাওয়া হয়। তবে এক্সাক্ট ওইদিন আমি গিয়েছিলাম কি না, সেখানে ছিলাম কি না এটা আমার মনে নাই।”
“সিসিটিভিতে যে কাউকে যদি আমি বলে দাবি করা হয় এটা আসলে কতটা বিশ্বাসযোগ্য আমি জানি না। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। এটা তদন্তধীন একটা বিষয়। তারপরও অনেক কিছু বললাম কারণ আমার নাম এসেছে,” বলেন আসিফ মাহমুদ।
গত ১ আগস্ট ঢাকার ওয়ারী থেকে জানে আলম অপুকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, ১৭ জুলাইয়ের ওই চাঁদাবাজির ঘটনার পর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন অপু।
এ ঘটনা নিয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে জানে আলম অপুর স্ত্রী কাজী আনিশা দাবি করেন, ওই ভিডিওটির পেছনে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের হাত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা আসিফ বলেন, “অপুকে রাজনৈতিক নেতার বাসায় নেওয়ার যে অভিযোগ এসেছে পরিবারের দিক থেকে সেটা গুরুতর অভিযোগ। এখন পর্যন্ত এ অভিযোগ যথেষ্ট রিলায়েবলও মনে হচ্ছে। আমার সংশ্লিষ্টতার কথা বলা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

অপুর স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
সংবাদ সম্মেলনে ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন জড়িত অভিযোগ করে অপুর স্ত্রী কাজী আনিশা বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিওটি করা হয়েছে জোরপূর্বক।
তার দাবি, গ্রেপ্তারের পর রিমান্ড শেষে ৮ আগস্ট কাশিমপুর কারাগারে স্বামী অপুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তুলে নিয়ে জোর করে ভিডিও করার বিষয়ে জানান অপু।
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ৩১ জুলাই রাতে বাইকে করে জোর করে অপুকে গোপীবাগে ইশরাক হোসেনের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন আনিশা। তার দাবি, ওই বাসাতেই অপুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন ইশরাক। সেই আলাপের একটি স্ক্রিনশটসহ বাসার ভেতরের কিছু ছবি নিরাপত্তার স্বার্থে স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে রাখেন অপু।
আনিশার ভাষ্যমতে, “অপু বলেন, নিখোঁজ থাকার পুরোটা সময় তিনি সাদেক হোসেন খোকার গোপীবাগের বাসায় ছিলেন। সেখানেই চাপের মুখে ওই ভিডিও ধারণ করা হয়।”
কিন্তু কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় এবিষয়গুলো গণমাধ্যম পর্যন্ত আনবেন তা তিনি জানতেন না। বুধবার অপুর ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ‘পাশ থেকে সরে যাওয়ারাই’ তাকে খুঁজে বের করে সংবাদ সম্মেলন করার ব্যবস্থা করে দেন।
আনিশা বলেন, “আমার সামনে এতগুলা চ্যানেল দাঁড়ায় আছেন, আমি তো কাউকে চিনি না। এগুলা আমাকে ম্যানেজ করে দিছে অপুর দলের (লোকেরা), যখন অপুর এনসিপির ওপর প্রশ্ন এলো, এনসিপির ওপরে প্রশ্ন চলে এলো, এনসিপির স্বার্থে চলে এলো, তখন তারা আমাকে এখানে নিয়ে আসছে।”
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে কেউ একজন ক্যামেরার পেছন থেকে প্রশ্ন করেন অপুকে। ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সংবাদ সম্মেলনে সেই বিষয়টি উল্লেখ করে আনিশা বলেন, “৩১ তারিখ থেকে ১ তারিখ ওকে কে আটকে রাখছে? কে দফায় দফায় একটু একটু করে ভিডিও রেকর্ড করছে?”
কারা কোন পেজ থেকে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে তা খুঁজে বের করলেই ইশরাক হোসেনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানা যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।
এমনকি ইশরাক হোসেনের বাসার সামনে থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে আনিশা বলেন, “আমার ধারণা, অপুকে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা বলছিল যে তুমি আমাকে আসিফ অথবা নাহিদ যেকোনও একটা উপদেষ্টার শুধু একটা নাম বলবা যে এরা তোমাদের দিয়ে চাঁদাবাজি করায়। তাইলেই হবে। তোমার যত রকমের হেল্প লাগে, আমরা তোমাকে করব।”
ইশরাক হোসেনই ডিবিকে ফোন করে অপুকে ধরিয়ে দেন দাবি করে আনিশা বলেন, রিমান্ডে নিয়েও আসিফ মাহমুদ আর নাহিদ ইসলামের নাম বলতে অপুকে চাপ দেওয়া হয়।
কিন্তু ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে জানে আলম অপু চাঁদাবাজির পেছনে তাদের কারও সম্পৃক্ততার কথা বলেননি বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন ও ম্যাসেজের মাধ্যমে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন।



