বিশ্ববাজারের সঙ্গে তালমিলিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম ওঠানামা করছে; একদিন বাড়ছে তো, পরের দিন কমছে। প্রায় প্রতিদিনই চলছে মূল্যবান এই ধাতুর দামের হেরফের।
একদিন না যেতেই বৃহস্পতিবার রাতে সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। এবার সবচেয়ে ভালো মানের (২২ ক্যারেট) সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৩৫৩ টাকা কমিয়েছে সংগঠনটি। আর তাতে ভরি নেমেছে ২ লাখ ৮ হাজার ১৬৭ টাকায়।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) এই মানের সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ৬১৩ টাকা বাড়নোর ঘোষণা দেয় বাজুস; ভরি উঠেছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৫২০ টাকায়। বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে এই দরে বিক্রি হয় সোনার গহনা বা অলংকার।
এর আগে চার দিনে দুই দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৬ হাজার ৮১২ টাকা কমানো হয়।
বিশ্ববাজারে দাম ওঠানাম করায় সেই দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারেও সোনার দর বাড়ানো-কমানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।
১৮ নভেম্বর (মঙ্গলবার) ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৩৬৫ টাকা কমায় বাজুস। ভরি নামে ২ লাখ ৬ হাজার ৯০৮ টাকায়। বুধবার সারা দেশে এই দরে বিক্রি হয় মূল্যবান এই ধাতু নিয়ে তৈরি গহনা।
তিন দিন আগে ১৫ নভেম্বর এই মানের সোনার দাম ভরিতে ৫ হাজার ৪৪৭ টাকা কমানো হয়। আর তাতে ভরি নেমেছিল ২ লাখ ৮ হাজার ২৭২ টাকায়।
তার আগে চার দফায় এই মানের সোনার দাম ভরিতে ১৩ হাজার ৬২৪ টাকা বাড়ানো হয়।
১৩ নভেম্বর বাড়ানো হয়েছিল ৫ হাজার ২৪৯ টাকা; ভরি উঠেছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৯ টাকায়। ১১ নভেম্বর বাড়ানো হয় ৪ হাজার ১৮৭ টাকা বাড়ানো হয়; ভরি ওঠে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৭১ টাকায়।
তার একদিন আগে ১০ নভেম্বর এই মানের সোনার দর ভরিতে ২ হাজার ৫০৮ টাকা বাড়ানো হয়; ভরি উঠেছিল ২ লাখ ৪ হাজার ২৮৩ টাকায়।
এর আগে ১ নভেম্বর সোনার দর বাড়ায় বাজুস। ওই দিন ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ৬৮০ টাকা বাড়নো হয়; ভরি ওঠে ২ লাখ ১ হাজার ৭৭৫ টাকায়।
পুরো অক্টোবর মাস জুড়েই অস্থির ছিল সোনার বাজার। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত টানা বাড়ে; ২২ অক্টোবর থেকে কমতে থাকে। ২৬ অক্টোবর থেকে টানা পাঁচ দিন মূল্যবান এই ধাতুর দর সমন্বয় করে বাজুস। এর মধ্যে চার দিন কমেছে; বেড়েছে একদিন।
৩০ অক্টোবর এই মানের সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ৬১৩ টাকা কমায় বাজুস। আর তাতে ভরি ২ লাখ ৯৬ টাকায় নামে।
তার একদিন আগে ২৯ অক্টোবর এক লাফে ভরিতে ৮ হাজার ৯০০ টাকা বাড়িয়েছিল বাজুস; ভরি বেড়ে ফের ২ লাখ টাকা ছাড়িয়ে ২ লাখ ২ হাজার ৭০৯ টাকায় উঠেছিল।
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০ অক্টোবর দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮২ টাকায় উঠেছিল। এর আগে কখনই সোনার দর অত উচ্চতায় ওঠেনি।
এর পর চার দফায় সাড়ে ২৩ হাজার টাকা কমে ভরি ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮০৯ টাকায় নেমে এসেছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও সোনার দাম বাড়িয়েছিল বাজুস। আগস্টের মাঝমাঝি সময় থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়া শুরু হয়। তার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারেও দাম বাড়িয়ে চলে বাজুস।
বাজুসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসেও অস্থির ছিল সোনার বাজার। পুরো মাসে মোট ১২ বার দাম সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ১০ বারই বাড়ানো হয়, কমে মাত্র দুইবার।
সেপ্টেম্বর মাসে ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনার দাম বাড়ে ২১ হাজার ৬৬ টাকা।
সেই উল্লম্ফন মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত চলে। ওই মাসে টানা সাত দফায় ২২ ক্যারেট সোনর দাম ভরিতে ২১ হাজার ৯৯৭ টাকা বেড়েছিল।
২২ অক্টোবর থেকে নামতে থাকে সোনার দর। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত কমে। ২৯ অক্টোবর ফের বাড়ে। ৩০ অক্টোবর আবার কমানো হয়।
চলতি বছর (২০২৫ সাল) এখন পর্যন্ত মোট ৮০ বার সোনার দাম সমন্বয় করেছে বাজুস। এর মধ্যে ৫৫ বার বেড়েছে, আর কমেছে ২৫ বার।
গত বছর (২০২৪ সাল) পুরো সময়ে দাম সমন্বয় হয়েছিল ৬২ বার।
গত ২০ আগস্ট থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম টানা বাড়ছিল। সেই দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজুসও দেশের বাজারে এই ধাতুর দাম বাড়িয়ে চলে। মাঝে নিম্মমুখী হওয়ায় দেশের বাজারেও কমানো হয়।
বাজুস সাধারণত রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে সোনার দাম বাড়ানো-কমানোর ঘোষণা দিয়ে থাকে। পরের দিন থেকে সারা দেশে সেই দরে সোনা বিক্রি হয়।
তবে মাঝে-মধ্যে দিনে দুই বারও সোনার দাম বাড়ানো-কমানোর ঘোষণা দিয়ে থাকে সংগঠনটি।
সেই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দেয় বাজুস। দাম কমানোর ব্যাখ্যায় সংগঠনটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য হ্রাস পেয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজুসের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে দেশের বাজারে হলমার্ক করা এক গ্রাম ২২ ক্যারেট মানের সোনা ১৭ হাজার ৮৪৭ টাকায় বিক্রি হবে। ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রামে এক ভরি হিসাবে প্রতিভরি বিক্রি হবে ২ লাখ ৮ হাজার ১৬৭ টাকায়। ২১ ক্যারেটের এক ভরি কিনতে লাগবে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৬ টাকা।
এছাড়া ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৭০ হাজার ৩১৮ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৮ টাকায় বিক্রি হবে।
বুধবার দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট মানের প্রতিভরি সোনা ২ লাখ ৯ হাজার ৫২০ টাকায় বিক্রি হয়। ২১ ক্যারেটের বিক্রি হয় ২ লাখ ৩ টাকায়। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৭১ হাজার ৪২৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনা ১ লাখ ৪২ হাজার ৫৯২ টাকায় বিক্রি হয়।
হিসাব বলছে, এক দিনের ব্যবধানে প্রতিভরি ২২ ক্যারেটের সোনার দাম কমছে ১ হাজার ৩৫৩ টাকা। ২১ ক্যারেটের কমছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ১৮ ক্যারেটে ১ হাজার ১০৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি সোনার দাম কমছে ৯৪৫ টাকা।
বিশ্ববাজারেও বাড়ছে-কমছে
বিশ্ববাজারেও সোনার দাম ওঠানামা করছে। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে গত ২০ অক্টোবর অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রতি আউন্সের (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) দাম ৪ হাজার ৩৫০ ডলারে উঠেছিল।
পরে তা কমে ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে এসেছিল। ২৯ অক্টোবর বিশ্ববাজারে প্রতি অউন্স সোনার দাম ছিল ৩ হাজার ৯৯৪ ডলার ৪৩ সেন্ট।
১ নভেম্বর তা ফের বেড়ে ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে ৪ হাজার ২ ডলার ৯৩ সেন্টে ওঠে।
১০ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৮৭ ডলার ৪৮ সেন্ট। ১১ নভেম্বর তা বেড়ে ৪ হাজার ১০৬ ডলার ৯৬ সেন্টে ওঠে। ১৩ নভেম্বর তা আরও বেড়ে ৪ হাজার ২০৭ ডলার ৭২ সেন্টে ওঠে।
১৫ নভেম্বর কমে ৪ হাজার ৮০ ডলার ৭৮ সেন্টে নামে।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাজুস যখন সোনার দাম বাড়ায় তখন বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৯৩ ডলার ২২ সেন্ট।
বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) নিম্মমুখী প্রবণতা লেনদেন শুরু হয়। কমতে কমতে এক পর্যায়ে ৪ হাজার ৪০ সেন্টে নেমে আসে। পরে অবশ্য তা আবার বাড়তে থাকে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টায় প্রতিআউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৮৪ ডলার ৮২ সেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পর সোনার দাম হু হু করে বাড়ছিল। ২২ এপ্রিল প্রতি আউন্স সোনার দাম ৩ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়ায়।
এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দর ৩ হাজার ৫০০ ডলারের নিচে লেনদেন হয়। আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে বাড়ছিল মূল্যবান এই ধাতুর দর।
এরপর ওঠানামার মধ্য দিয়ে চলে লেনদেন। নভেম্বরের শুরু থেকে বাড়তে থাকে। ১৪ নভেম্বর থেকে ফের নিম্নমুখী হয়। এভাবে বাড়া-কমার মধ্য দিয়েই চলছে লেনদেন।

