ভারতে নরেন্দ্র মোদী সরকার ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) পাস করে। আইনটির মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ধর্মকে একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই আইন ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়। এটি কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোতে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য একটি সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা।
কিন্তু সরকারের এই যুক্তি অনেক ভারতীয়কেই বিশ্বাস করাতে পারেনি। কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ নির্বাচনী ভাষণে বলেছিলেন, সিএএ পাস হওয়ার পরপরই জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) চালু করা হবে।
আসামে এনআরসি প্রয়োগের সময় দেখা যায়, কোটি কোটি মানুষ তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে দেশজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে আশঙ্কা জন্মায়, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে সিএএ ও এনআরসি একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে। কারণ সিএএ-তে মুসলিম অভিবাসীদের কোনও সুযোগ রাখা হয়নি।

সেই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে অংশ নেয়। গণবিক্ষোভের চাপে মোদী সরকার ঘোষণা দেয়, তাদের এনআরসি চালুর কোনও পরিকল্পনা নেই।
২০১৯ সালের ওই ঘটনাকে তখন একটি বড় বিজয়ের মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, ‘এনআরসি চালুর কোনও পরিকল্পনা নেই’ এমন ঘোষণা ছিল একটি ভেক মাত্র।
ভারতীয় মিডিয়া স্ক্রলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই বছর সরকার অনেকটাই গোপনে নতুন একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে। এতে খোলাখুলিভাবে না বলেই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি কঠিন পরীক্ষা তৈরি করছে।
আর এর একটি বড় উদাহরণ হলো—বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াটি সরকারের নিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা পরিচালনা করছে। এই তালিকা সংশোধন কার্যক্রম কার্যত একটি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এর আওতায় রাজ্যের কোটি কোটি মানুষ পড়েছেন।
বিহারের প্রায় আট কোটি ভোটারের সবাইকে আগামী ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে একটি ফরম পূরণ করতে বলা হয়েছে নাম নতুন তালিকায় রাখতে হলে। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুয়ায়ী যাদের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, এমন প্রায় ৩ কোটি মানুষকে অতিরিক্তভাবে তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে।
৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষদের ক্ষেত্রে জন্মতারিখ বা জন্মস্থান সম্পর্কিত কাগজপত্র জমা দিতে হবে। কিন্তু যারা ৪০ বছরের নিচে, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন। তারা ২০০৪ সালের আগে জন্মগ্রহণ করলে তাদের পিতামাতার যেকোনো একজনের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। আর ২০০৪ সালের পর জন্মালে বাবা-মা দুই জনেরই নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে।
আর এই জটিল নিয়মের পেছনে আছে ২০০৩ সালে বিজেপি সরকারের করা নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন। গবেষকরা বলছেন, এই সংশোধনের মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির ভিত্তি হিসেবে শুধু জন্ম নয়, রক্তসূত্র বা পারিবারিক বংশপরম্পরাকেও নির্ধারক করে তোলা হয়েছে।
বিহার ভারতের অন্যতম দরিদ্র ও শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা একটি রাজ্য। এখানে খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ জন্মসনদ কিংবা বিদ্যালয়ের সনদপত্র রাখে। এখন নিজের পরিচয় ও নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে লাখ লাখ মানুষ হন্যে হয়ে ছুটছে আবাসিক সনদ সংগ্রহ করতে। আর সেটা করতে হচ্ছে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে।
এমন একটি জটিল ও গুরুত্বপর্ণ প্রক্রিয়া মাত্র এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অযৌক্তিকতার কারণে সুপ্রিম কোর্টের উচিৎ ছিল প্রক্রিয়াটি অন্তত স্থগিত রাখা।
কিন্তু বিরোধী দলগুলোর নেতা এবং অধিকারকর্মীদের দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত কেবল নির্বাচন কমিশনকে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছে। এর একটি হলো—নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে কি না।

ভবিষ্যতে যদি আদালত রায়ও দেয় যে, এই ক্ষমতা কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের নয়। তবুও ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ ইতোমধ্যেই বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার ফলে যেসব মানুষ প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে পারবে না, তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হবে। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন মানুষদের মধ্যে অধিকাংশই হবে দরিদ্র, প্রান্তিক, দলিত, পশ্চাৎপদ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটার।
এই ধরনের ‘সন্দেহভাজন’ ভোটারদের সঙ্গে রাজ্য সরকার কী করতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ এর আগে আসামে দেখা গেছে।
১৯৯৭ সালে আসামে এমনই একটি ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রথমবার ‘সন্দেহভাজন ভোটার’-এর তালিকা তৈরি করা হয়। তাদের ‘ডি-ভোটার’ বলা হতে থাকে। এরপর এসব মানুষকে তলব করা হয় ট্রাইব্যুনালে। অনেককে তাদের কথা না শুনেই ‘বিদেশি’ ঘোষণা করে দেওয়া হয়।
চলতি গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত, যারা এই রায় চ্যালেঞ্জ করার মতো আর্থিক ও আইনগত সামর্থ্য রাখতেন না, তাদের জন্য ঝুঁকি ছিল। কারণ তাদের বন্দি শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত মে মাস থেকে আসাম সরকার শত শত ডি-ভোটারকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করে দিচ্ছে। সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্ক্রলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিতাড়িতদের মধ্যে রয়েছেন একজন সাবেক সরকারি স্কুলশিক্ষক, একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি যার নাম জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনে (এনআরসি) রয়েছে, একজন ব্যক্তি যিনি হাই কোর্ট থেকে নিজেকে বিতাড়নের হাত থেকে রক্ষার নির্দেশনাও পেয়েছিলেন। এছাড়া আরও অনেকে যাদের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত মামলা এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
তাদের মধ্যে যে বিষয়টি অভিন্ন, তা হলো, তারা সবাই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। তাদের পূর্বপুরুষদের শিকড় অবিভক্ত পূর্ববঙ্গে। অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মাটিতে।
আসামে যদিও বাংলা ভাষাভাষী হিন্দুরাও ডি-ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন এবং অনেকেই বিদেশি ঘোষিত হয়েছেন। কিন্তু যতদূর জানা যাচ্ছে, তাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) তাদের এক ধরনের সুরক্ষা দিচ্ছে। গত বছর সিএএ-এর ভিত্তিতে আসাম সরকার রাজ্য সীমান্ত পুলিশকে নির্দেশ দেয়—বাংলা হিন্দুদের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলো উপেক্ষা করতে। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই একই যুক্তি দেখিয়ে তাদের বিতাড়নের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, বিহারের ‘সন্দেহভাজন’ ভোটাররাও কি ভবিষ্যতে একই ধরনের ধর্মভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হবেন?
এই আশঙ্কা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। এক্ষেত্রে গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ খেয়াল করলে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়।
গত কয়েক মাস ধরে বিজেপিশাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা শত শত শ্রমজীবী মুসলিম অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে কেউ কখনও আসামে ছিলেন না। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কখনও আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল থেকে কোনও তলবও করা হয়নি। তবুও শুধু সন্দেহের বশে, তাদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আটক করা হয়েছে।

উড়িশ্যায় আটক এক অভিবাসী স্ক্রলকে জানান, পুলিশ তাকে বলেছিল: “তুমি বাংলা বলছো মানে তুমি বাংলাদেশি।” তিনি আরও জানান, পুলিশ তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। এতে সন্দেহ জাগে যে, এ ধরনের ধরপাকড় মূলত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্য করেই করা হচ্ছে।
স্ক্রলের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এমনকি যেসব অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের বৈধ পরিচয়পত্র আছে, তারাও পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়েছে দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে। সেখানে কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম পরিবারদের সরাসরি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হস্তক্ষেপে তাদের পুনরায় ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।
এসব আটক ও নির্বাসনের ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী সপ্তাহ নাগাদ প্রকাশ করবে স্ক্রল।
বিহার, আসাম ও ভারতের অন্যান্য অংশে যা ঘটছে, সেসব ঘটনার সূত্রগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে আইন ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে একটি নতুন ধরনের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
এই ব্যবস্থায় যারা হিন্দুত্বের চোখে ‘পর্যাপ্ত ভারতীয়’ নন, তাদের জন্য বিপদের সম্ভাবনা গভীর ও বাস্তব। এই ব্যবস্থার শিকার হলে শুধু ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিই নয়, বরং এক রাতেই দেশ থেকে বিতাড়নের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, সাম্প্রতিক আদালতের রায়গুলো দেখলে মনে হয় এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ।
তথ্যসূত্র : স্ক্রল ডট ইন



