Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

অনিশ্চয়তা কাটেনি, তবে বেড়েছে বিদেশি বিনিয়োগ

ডলার
[publishpress_authors_box]

গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দেখিয়ে আসত আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর তাদের সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে অস্থিরতা চলছিল, তার মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা না কাটলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না বলেই ধারণা দিচ্ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

অথচ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক আগের অর্থ বছরের চেয়ে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ১৪২ কোটি ৫০ লাখ (১.৪২ বিলিয়ন) ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে মোট যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আসে, তা থেকে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাদের মুনাফার অর্থ দেশে নিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাই নিট বিদেশি বিনিয়োগ।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে এভাবে বলা যায়, বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে, নতুন প্রকল্পে টাকা আনে কিংবা শেয়ার কেনে—এসবই মোট বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) হিসেবে গণ্য হয়। এই অর্থ অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলো দেশ থেকে তাদের মুনাফা ফেরত নিয়ে যায়, কখনো আবার শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নেয়—এটি হলো এফডিআই আউটফ্লো বা বহির্গমন।

মোট এফডিআই থেকে আউটফ্লো বাদ দিলে নিট এফডিআই পাওয়া যায়। এই অর্থই শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে থাকে।

অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশে স্থিতিশীলতা আনার দাবি করে গেলেও এক বছরে রাজনীতির দৃশ্যপট যে খুব বদলেছে, তা নয়। অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা যে কেটেছে, তাও নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যে ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, তা সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যেই দেখা যাচ্ছে।

তার মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ কেন বাড়ল, হিসাব পেলেও তার কোনও সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে অনুকূল পরিবেশ। সেই পরিবেশটা থাকলে দেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের দেশে বিনিয়োগ করেন। সেই পথ অনুসরণ করে বিদেশি বিনিয়োগারীরাও ওই দেশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসেন। দেশি বিনিয়োগ না হলে বিদেশিরাও ওই দেশে বিনিয়োগ করতে আসেন না।

“অনিশ্চয়তা-অস্থিরতায় দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা এখন নতুন বিনিয়োগ না করে বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন, পরিবেশের উন্নতি হলে বিনিয়োগ করবেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার কথা নয়।”

তার মধ্যেও বাড়ল কেন- প্রশ্নে তিনি বলেন, “গত অর্থ বছরে নিট এফডিআই বাড়ার যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আমার কাছে একটি কারণ হতে পারে। আর সেটি হলো- ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ। যে বিদেশি ব্যবসায়ীরা আগে চীনে বিনিয়োগ করত, সে এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে।”

গত এপ্রিলে ট্রাম্প শুল্ক যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের হারানো ব্যবসা পেতে শুরু করে বাংলাদেশ।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত কয়েক মাস ধরেই চীনের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে। আগামী দিনগুলোতে তা আরও বাড়তে পারে।

চীনে পাশাপাশি ভারতের পণ্যের ওপরও আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প; যেখানে বাংলাদেশি পণ্যে ২০ শতাংশ।

এই সুবিধা বাংলাদেশ পেলেও দেশে বিনিয়োগ অনুকুল পরিবেশ এখনও নেই বলে সতর্ক করেছেন মির্জ্জা আজিজ। তার মতে, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা চললে দেখা যাবে বাংলাদেশের বিনিয়োগ আবার ভিয়েতনামে চলে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রত্যক্ষ বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ ছিল ১৭১ কোটি ২০ লাখ (১.৭১ বিলিয়ন) ডলার।

অর্থাৎ গত অর্থ বছরে ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারের নিট এফডিআই এসেছে বাংলাদেশে। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবেই গত অর্থ এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ বেড়েছে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থ বছরে নিট এফডিআইর পরিমাণ ছিল ১৭১ কোটি (১.৭১ বিলিয়ন) ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ১৬১ কোটি (১.৬১ বিলিয়ন) ডলারে নেমে আসে।

কোভিড মহামারির মধ্যে ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১৭৭ কোটি ১০ লাখ (১.৭৭ বিলিয়ন) ডলারের নিট এফডিআই এসেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থ বছরের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অর্থ বছরে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে। ওই বছরে ২৬৩ কোটি (২.৬৩ বিলিয়ন) ডলারের নিট এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ।

এর মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে জাপানি কোম্পানি জাপান টোব্যাকো। আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কেনা বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করেছিল তারা।

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে ১১৪%

বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যালেন্ডার বছরের হিসাবেও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস–বিদ্যুতের সঙ্কটসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এফডিআইয়ে মন্দাভাব চলছিল। গত বছরের (২০২৪ সাল) শেষ ছয় মাসে তা ৭১ শতাংশ কমে যায়। তবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি–মার্চ) এফডিআই আসার হার বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে দেশে মোট ১৫৮ কোটি ডলার এফডিআই এসেছে। এর মধ্যে ৭১ কোটি ডলার ফেরত নিয়ে গেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

সেই হিসাবে, গত জানুয়ারি–মার্চ সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ৮৬ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১১৪ শতাংশ বেশি।

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আসা নিট এফডিআই ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। ওই বছরের জানুয়ারি–মার্চে নিট এফডিআই এসেছিল ৮৯ কোটি ডলার। পরের বছরের একই সময়ে সেটি কমে ৬৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। গত বছরের প্রথম তিন মাসে নিট এফডিআই এসেছিল মাত্র ৪০ কোটি ডলারের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নিট নতুন বিনিয়োগ বা ইক্যুইটি এসেছে ২৭ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে ইক্যুইটি এসেছিল ১২ কোটি ডলার।

এছাড়া গত জানুয়ারি–মার্চ সময়ে নিট এফডিআইয়ের ১৯ কোটি ডলার এসেছে পুনর্বিনিয়োগ আয় থেকে। আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে এসেছে ৪০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের এফডিআইয়ের বড় অংশই আগে থেকে দেশে বিনিয়োগ করা কোম্পানির আয় পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে আসে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত