Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

কেমন হলো ডাকসু ভোট; প্রার্থীদের কে কী বললেন

উৎসবমুখর পরিবেশে মঙ্গলবার ডাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ছবি : হারুন অর রশীদ
উৎসবমুখর পরিবেশে মঙ্গলবার ডাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ছবি : হারুন অর রশীদ
[publishpress_authors_box]

তেমন কোনও আশঙ্কা ছিল না, তেমন কিছু ঘটেওনি। নির্বিঘ্নেই হয়েছে ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।

ভাদ্র মাসের শেষে এসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে উৎসবের আমেজেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের আটটি কেন্দ্রে একটানা ভোটগ্রহণ চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সঙ্গে হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণও হয়।

ছয় পৃষ্ঠার ওএমআর শিটের ব্যালট পেপারে এবার ভোট দেয় শিক্ষার্থীরা। এই ব্যালট গণনা করা হবে ১৪টি মেশিনে।

গণনা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন থেকে ফল ঘোষণা করা হবে। তাতে জানা যাবে কোন পদে কারা কারা জিতলেন।

ডাকসুতে এবার ২৮টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিল ৪৭১ জন। ১৮টি হল সংসদে নির্বাচন হয় ১৩টি করে পদে। হল সংসদের ২৩৪টি পদের বিপরীতে প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এবার ভোটারদের ৪১টি ভোট দিতে হয়।

ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী ৪৫ জন, তাদের মধ্যে ৫ জন নারী। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন ১৯ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২৫ জন। সদস্য পদে মোট ২১৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাদের মধ্যে নারী ২৩ জন।

ডাকসু নির্বাচনে এবার ভোটার ছিল ৩৯ হাজার ৮৭৪ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ১৩টি ছাত্র হলে ভোটার ২০ হাজার ৯১৫ জন এবং পাঁচটি ছাত্রী হলে ভোটার ১৮ হাজার ৯৫৯ জন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পাহারার মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশেই ভোট দিতে পারার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ভোটের সকালেই ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বৈশাখী মুখার্জী ডাকসু নির্বাচনে প্রথম ভোট দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলতে তুলতে বলেন, “ভোট যে উৎসব, এই ফিলটা পাচ্ছি।”

বৈশাখী বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। টিএসসি কেন্দ্রটি এই ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল।

কোনও ধরনের গোলযোগ না ঘটলেও বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা পাল্টাপাল্টি কিছু অভিযোগ করেছেন। শিক্ষার্থীরা বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের প্রচার নিয়ে।

ডাকসু নির্বাচন এবং এর ফল প্রকাশে স্বচ্ছতায় কোনও ঘাটতি নেই দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান বিকালে সিনেট ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, “কার্জন হলে ভুলক্রমে একটি ছোট সমস্যা হয়েছে। তার জন্য আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। তবু এই ঘটনার আমরা পুনরায় তদন্ত করে কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেব।”

কার্জন হলে এক ভোটারকে দুটি ব্যালট দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠলে পোলিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

বিভিন্ন প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, তাদের পোলিং এজেন্টদের বুথে থাকতে দেওয়া হয়নি।  

টিএসসির ভোটকেন্দ্রে ক্যাফেটেরিয়া কক্ষে আগে থেকেই ‘ক্রস’ চিহ্ন দেওয়া (ভোট দেওয়া) একটি ব্যালট পেপার পাওয়ার অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্যের ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক প্রার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তার সঙ্গে ভোট দিতে যাওয়া তার বন্ধুকে যে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়েছিল, তাতে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবু সাদিক কায়েম ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী এস এম ফরহাদের নামের পাশে আগে থেকেই ‘ক্রস’ চিহ্ন দেওয়া ছিল।

ওই কক্ষের পোলিং কর্মকর্তা রুমানা পারভীন এ্যানীর কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন প্রথম আলোর সাংবাদিক। তখন রুমানা বলেন, “ওই শিক্ষার্থী ব্যালট পেপার নিয়ে বুথে প্রবেশ করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বের হয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, তার পেপারে আগে থেকেই দাগ দেওয়া ছিল। পরে তাকে সেটি বদলে দেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, “পরে সবগুলো ব্যালট পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। কিন্তু কোনোটাতেই এমন কোনও দাগ দেওয়া নেই। এটি ওই ছাত্রীর ভুলও হতে পারে।”

এই নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহে থাকাকাল তরিকুল ইসলাম নামের এক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। কার্জন হল ভোটকেন্দ্রের সামনে দুপুরে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, তবে বাঁচানো যায়নি।

এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন না হলেও পুলিশের সঙ্গে কাজ করে বিজিবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসানো হয়। ভোটকেন্দ্রেও শিক্ষার্থীরা ঢোকেন আর্চওয়ের মধ্যদিয়ে।

প্রার্থীরা কে কী বললেন

সকালে টিএসসি কেন্দ্রে গিয়ে ভোটগ্রহণে দেরির অভিযোগ তোলেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা।

তিনি বলেন, “ভোটারদের লাইনটা খুবই আস্তে আস্তে যাচ্ছে। আবার পোলিং এজেন্ট সংক্রান্ত অনেক ঝামেলা হয়েছে। কেন্দ্রের ভেতরে প্রচুর আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।”

জয়ের বিষয়ে আশাবাদী ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা।

ছাত্রদলের প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম দুপুর ২টার দিকে ভোট দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং মানুষের বাক্‌স্বাধীনতাকে হরণ করার নতুন খেলার অপচেষ্টা চলছে।

“ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছি মাত্রই। কিন্তু পরিস্থিতি সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না।”

ভোটগ্রহণ শেষে আবিদুল মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে এসে কারচুপির অভিযোগ তুলে বলেন, “কারচুপির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ছেড়ে দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।”

সকালে আবিদুলের বিরুদ্ধে নিয়ম ভেঙে শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে ঢোকার অভিযোগ তুলেছিলেন অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা। পরে আবিদ কার্জন হল কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েই তিনি ঢুকেছিলেন। প্রার্থী হিসাবে কেন্দ্র পরিদর্শনের অধিকার তার রয়েছে।

ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী পাল্টা অভিযোগ করেন, প্রার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কোনও কার্ড করেনি। সে কারণে তাকে মেয়েদের হলের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছিল ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল হাসানের বিরুদ্ধে, তবে তিনি তা নাকচ করেন।

সকালের শুরুতে উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে আবিদ সাংবাদিকদের বলেন, “আজকের এই নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি নতুন দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—আপনারা কেউ ঘরে বসে থাকবেন না। সবাই আসুন ভোটকেন্দ্রে, নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন।”

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’র ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম সকাল থেকে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে বেলা সোয়া ১১টার দিকে কার্জন হল কেন্দ্রে এসে সাংবাদিকদের বলেন, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক ও সুন্দর রয়েছে।

তবে এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি জি এম ফরহাদ অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনে বেশ কয়েকটি ব্যত্যয় হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে জানানো হলেও তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে।

অনেক অভিযোগের জবাব দিতে হয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’র ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েমকে।

এদিকে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা প্রশাসনের মদদে ছাত্রশিবিরের পক্ষে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছে।

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের দুপুরে এক ফেইসবুক পোস্টে বলেন, “আমরা এমন ডাকসু নির্বাচন চাই নাই, যেখানে শিবির-ছাত্রদল আর বিএনপি-জামাত মিলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করবে।

“নির্বাচন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভাগাভাগি করে শিবির-ছাত্রদলকে নির্বাচনে কারচুপি করতে, অনিয়ম করে সহযোগিতা করেছে।”

বাম সমর্থিত সংগঠনগুলোর একটি পানেল প্রতিরোধ পর্ষদের এক ফেইসবুক পোস্টে বলা হয়, “এখন পর্যন্ত নির্বাচন জালিয়াতির যেসব প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ঘটনাটার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, এমনকি যে ঘটনার প্রেক্ষিতে একজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে খবরে এসেছে–সেগুলোর সবই একটা নির্দিষ্ট প্যানেলের পক্ষে। সকলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চোখ কান খোলা রাখুন।”

প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেলের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু দুপুরে হুইল চেয়ারে এসে ভোট দিয়ে শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রে সাংবাদিকদের বলেন, ডাকসু নির্বাচনের ব্যালটে প্রগতি পক্ষের যে শক্তিগুলো আছে, সেই শক্তিগুলোর জয় হবে।

দুদিন আগেই হাসপাতাল ছেড়ে আসা প্রতিরোধ পর্ষদের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু ভোট দিতে আসেন হুইল চেয়ারে।

বামদের আরেকটি প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’র এজিএস প্রার্থী অদিতি ইসলাম দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো প্রশাসনকে জানিয়েও কোনও ফল পাওয়া যায়নি। অনেক প্রার্থী বুথে ঢুকেও পড়েন, কিন্তু প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান বলেন, যে সব বুথে কারচুপি হয়েছে, সেই সব বুথে ভোট কারচুপির অভিযোগে ছাত্রশিবিরের ভিপি ও জিএস প্রার্থী সাদিক কায়েম ও ফরহাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হোক।    

ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী খায়রুল হাসান সকালে অভিযোগ করেন, ভোটকেন্দ্র থেকে তাদের পোলিং এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এই বাধা দিচ্ছে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। 

স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শামীম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সোশাল মিডিয়াসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে অপপ্রচারের মাধ্যমে তার ভোট কমানোর চেষ্টা চলছে।

ভিপি প্রার্থী কাদের ভিন্ন রকম বললেও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের জিএস প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার সকালে নির্বাচনের পরিবেশ দেখে সন্তোষ জানান।

তিনি বলেন, “আশা করি সুন্দর একটি ফলাফল পাব। শিক্ষার্থীরা যে রায় দেবেন, সব প্রার্থী সেটি মেনে নেবেন বলে আশা রাখি।”

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের জিএস প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার আশা করছেন, ভোটের ফল সবাই মেনে নেবেন।

এবারের ডাকসু নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে অন্তত ১০টি প্যানেল অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন প্রার্থীদের আরেকটি অংশ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found