কিচ্ছু ভালো লাগে না? কিছুই করতে যেন শরীর দিচ্ছে না সায়! নেই কোনও উৎসাহ-উদ্দীপনাও। এমন অবস্থায় কাজের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে ‘ডোপামিন মেনু’,” সংক্ষেপে ‘ডোপামেনু’।
‘ডোপামেনু’ হলো নিজের পছন্দের কিছু কাজের তালিকা, যেগুলো করলে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়। আর ডোপামিন হচ্ছে এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যা আমাদের মস্তিষ্কের উদ্দীপনা বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যখন আমরা কোনও কাজ করে আনন্দ পাই বা ভালো বোধ করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ হয়। এই হরমোনই আমাদের মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগায়, নতুন কিছু করার বা শেখার আগ্রহ জাগায়।
সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিভিন্ন কাজ একসঙ্গে করা বা মাল্টিটাস্কিং, পরিকল্পনা, বিভিন্ন শারীরিক কাজ করার সময় সাবলীলতা এবং অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে ডোপামিন এর কোনও তুলনা নেই।
‘ডোপামেনু’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন এরিক টিভার্স। তিনি একজন এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডিজঅর্ডার হাইপারঅ্যাকটিভিটি) কোচ এবং ‘এডিএইচডি রিওয়ায়ার্ড’ পডকাস্টের হোস্ট।
টিভার্স জানান, এডিএইচডি আক্রান্ত মানুষদের নিয়ে কাজ করার সময় এই আইডিয়াটা তার মাথায় আসে। তিনি লক্ষ্য করেন, আক্রান্তদের মোটিভেশন ধরে রাখতে খুব কষ্ট হয়। তখন তিনি ভাবেন, যদি এমন একটা তালিকা তৈরি করা যায় যেখানে কিছু পছন্দের কাজ থাকবে, যা করলে ডোপামিন নিঃসরণ হবে, তাহলে হয়তো তাদের জন্য সুবিধা হবে। এই ভাবনা থেকেই ‘ডোপামেনু’-র জন্ম।
টিভার্স বলেন, “এটা অনেকটা নিজের যত্ন নেওয়ার একটা পরিকল্পনার মতো। যেমন, আমরা যখন অসুস্থ হই, তখন চিকিৎসক আমাদের কিছু পরামর্শ দেন, ঠিক তেমনই, যখন আমাদের মনে হয় যে আমরা একটু হতাশায় ভুগছি বা কিছু করতে ভালো লাগছে না, তখন এই ‘ডোপামেনু’ আমাদের সাহায্য করতে পারে।”
এডিএইচডি এক ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার যাতে ডোপামিন নিঃসরণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তখন অমনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণহীনতা আর কাজ করতে অনীহার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এডিএইচডি শিক্ষা, সম্পর্ক, কাজ—সবকিছুতেই প্রভাব ফেলে। টিভার্সের নিজেও এডিএইচডি-তে আক্রান্ত। তিনি এডিএইচডি আর অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষদের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, এডিএইচডি-তে মস্তিষ্কে প্রাপ্ত উদ্দীপনা বেশিক্ষণ অনুরণিত হয় না। অনেক সময় ভেতরে এলোমেলো চিন্তা আসে। প্রয়োজনীয় বিষয়টির কোনটি আগে এবং কোনটি পরে করবো- সেটি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই এলোমেলো চিন্তা আর কম মনোযোগের কারণে যেকোনও কাজ শুরু করতেই অনেক সমস্যা হয়।
টিভার্স বলেন, এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে এই রোগে আক্রান্ত না হওয়াদের তুলনায় অনুপ্রেরণাগত দিক থেকে পার্থক্য বিস্তর। তার মতে, অনুপ্রেরণাই আসলে ডোপামিন ।
এডিএইচডি যাদের আছে, তাদের আগ্রহ-ভিত্তিক নার্ভাস সিস্টেম থাকে। মানে, তাদের যে জিনিসে আগ্রহ রয়েছে, সেটাতেই কেবল মনোযোগ দিতে পারেন। আর বেশিরভাগ মানুষের থাকে প্রয়োজন-ভিত্তিক নার্ভাস সিস্টেম। মানে, যে কাজটা দরকারি, সেটা তারা করেন। এডিএইচডি আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য একঘেঁয়ে কাজ করা খুব কঠিন। কারণ তাদের মন এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকে না।
‘ডোপামেনু’তে ছোট ছোট কিছু কাজের তালিকা থাকে যা একাগ্রতা ও উদ্দীপনা বাড়ায়। এটি কেবল এডিএইচডি-র জন্য নয়, ডিপ্রেশন বা স্যাড-এর মতো অন্যান্য সমস্যার জন্যও কাজে লাগে। এমনকি যাদের কোনো সমস্যা নেই, তাদের জন্যও এটা খুব কাজে দেয়। কারণ দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় পর আমাদের সবারই একটু উদ্দীপনার দরকার হয়।
ডোপামেনু তৈরির টিপস
১. আগেই তালিকা বানিয়ে ফেলুন: যখন মন খারাপ বা এনার্জি লো, তখন কী করবেন সেটা ভাবার সময় থাকে না। তাই আগে থেকে একটা তালিকা বানিয়ে রাখুন। তাহলে যখন খারাপ লাগবে, তখন শুধু তালিকা দেখে কাজ শুরু করে দেওয়া যাবে।
২. নিজের পছন্দের কাজ রাখুন: আপনার ইন্টারেস্ট আর লাইফস্টাইল অনুযায়ী কাজ বেছে নিন। যেমন- হাঁটা, নাচ, বাইক চালানো, ছবি আঁকা, বন্ধুদের সাথে কথা বলা, গান শোনা বা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া। অন্যরা নিজেদের ভালো রাখতে কী করেন সেটি দেখতে চাইলে গুগলে সার্চ করতে পারেন। মেনুটাকে রেস্টুরেন্টের মেনুর মতো করে সাজান- অ্যাপেটাইজার (যা তাড়াতাড়ি করা যায়), মেইন কোর্স (যেগুলোতে একটু বেশি সময় লাগে), স্পেশাল (যা সবসময় পাওয়া যায় না) আর ডেজার্ট (যা একটু রিল্যাক্সিং)। কিছু মানুষ মেনুর জন্য খরচ আর রেটিংও যোগ করেন। আপনি আপনার মতো করে সব কিছু সাজিয়ে নিতে পারেন।
৩. সময় নিয়ে পরীক্ষা করুন: কখন ‘ডোপামেনু’ ব্যবহার করবেন সেটা আপনার উপর নির্ভর করে। সকালে ওয়ার্কআউট করে দিনটা শুরু করতে পারেন, আবার রাতে ঘুমানোর আগে কিছু করে রিল্যাক্সও করতে পারেন। কখন আপনার বেশি ডোপামিন দরকার সেটি আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।
৪. প্যাটার্ন খুঁজুন: যখন খুশি তখন ‘ডোপামেনু’ ব্যবহার করতে পারেন। তবে নিজের আচরণের দিকে খেয়াল রাখুন। কোন সময় আপনার বেশি খারাপ লাগে সেটি বুঝলে- সেই সময় ‘ডোপামেনু’র কাজগুলো করতে পারেন।
৫. আনন্দ করুন: প্রথম করা ‘ডোপামেনু’টা ঠিকঠাক নাও হতে পারে। এটা একটা শেখার প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষামূলক ব্যাপার। যদি প্রথমবার কাজ নাও করে, তার মানে এই নয় যে এটা কাজে লাগবে না। তালিকা ঠিক করে আবার চেষ্টা করুন। নিজের জন্য একটা উপযুক্ত ‘ডোপামিন মেনু’ তৈরি করতে একটু সময় লাগতে পারে, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে গেলে অবশ্যই ভালো ফল পাওয়া যায়।



