উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত জিহাদ কায়েম এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ, বাস্তবায়নে ছিল নব্য জেএমবির সদস্যরা- গুলশান হামলার মামলার রায়ে একথা বলেছিল বিচারিক আদালত।
২০১৯ সালে ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমানের দেওয়া রায়ে সাতজনকে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড।
নিম্ন আদালতের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল হলে ২০২৩ সালে হাই কোর্ট রায়ে সাজা কমিয়ে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়। তবে সেই রায়েও বিচারকরা বলেছিলেন, নিষিদ্ধ জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়েছিল।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানের ওই রেস্তোরাঁয় হামলার সেই ঘটনা গোটা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তুলেছিল ঝড়। সশস্ত্র বন্দুকধারীরা সেখানে ঢুকে সবাইকে জিম্মি করে, তারপর রাতভর দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করে। তার মধ্যে নয়জন ইতালির নাগরিক, সাতজন জাপানের নাগরিক, একজন ভারতের নাগরিক এবং তিনজন বাংলাদেশি। জিম্মিদের মুক্ত করতে গিয়ে বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা।
সারাবিশ্বের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো বাহিনী চালায় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’, তাতে জঙ্গিমুক্ত হয় হলি আর্টিজান বেকারি, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ তরুণ।
গুলশান হামলার পর জঙ্গি দমনে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছিল পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তাতে জঙ্গি নেতা হিসাবে চিহ্নিত অনেকেই নিহত হয়েছিল, যাদের কেউ কেউ গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী বলে তখন দাবি করা হয়।
তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ; তারা জঙ্গি দমনে সফলতার দাবিও করে আসছিল। পুলিশ কর্মকর্তারাও বলে আসছিলেন, জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আইএস দুর্বল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর পর বাংলাদেশেও জঙ্গিদের তৎপরতা কমে আসে। বড় ধরনের কোনও অভিযানে আর নামতে হয়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বছর গড়ানোর আগে গুলশান হামলার বর্ষপূর্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর এক বক্তব্য সেই ঘটনার সঙ্গে বিচারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলল।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রশ্নে তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশে কোনও জঙ্গি নেই।
তার ভাষ্যে, “আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে। কীসের জঙ্গি?”
তাহলে গুলশান হামলার ঘটনাটি কী ছিল- এই প্রশ্নে তার উত্তর আসে, “ওটা সম্পর্কে আমি জানি না; তবে বাংলাদেশে কোনও জঙ্গি নাই। বাংলাদেশে পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে।”
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি চাকরিতে ফিরিয়ে এনে গত বছরের নভেম্বরে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার করা হয় সাজ্জাত আলীকে। অভ্যুত্থানের পর পুলিশের শীর্ষ পর্যায় ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় এই পদে আসেন বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের এই কর্মকর্তা।
সাজ্জাত আলীর বক্তব্য নয় বছর আগের গুলশান হামলা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে দিল। তারই বাহিনীর করা তদন্তের ভিত্তিতে আদালতের রায়কেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিল।
তবে গত বছরের অভ্যুত্থানের পর আদালতের আগের রায় উল্টে যাওয়ার কিছু নজির এরই মধ্যে সামনে আসছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলার রায় বাতিল হয়ে গেছে; যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম খালাস পেয়ে বেরিয়ে এসেছেন।
দেশে জঙ্গিবাদের একাল-সেকাল
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতার খোঁজ মেলে চার দশক আগে, যখন আফগানিস্তানে তালেবানের হয়ে লড়াই করতে যান কেউ কেউ। সেখান থেকে ফিরে তারা বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলেন, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি (হুজি), শাহাদাৎ-ই আল হিকমা নামে কিছু সংগঠনের আত্মপ্রকাশের খবর পাওয়ার পর সেগুলো নিষিদ্ধও হয়। এরপর আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আল কায়দার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েও কিছু সংগঠন গড়ে ওঠে।
জঙ্গিরা তাদের অস্তিত্বের জানান প্রথম বড় আকারে দিয়েছিল ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে। জেএমবির নামেই সেই হামলা হয়েছিল।
একই সময়ে রাজশাহীর বাগমারায় সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইর নেতৃত্বে জাগ্রত মুসলিম জনতা নামে আরেকটি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় হয়ে ওঠে।
২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে এজলাসে বোমা মেরে দুই বিচারককে হত্যার দুই সপ্তাহের মধ্যে ২৯ নভেম্বর গাজীপুরে আরেক বোমা হামলায় সাতজন নিহত হয়। সেটাই বাংলাদেশে প্রথম আত্মঘাতী বোমা হামলা বলে মনে করা হয়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে জঙ্গিদের উত্থানের পর সেই সরকার আমলেই ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হন বাংলাভাই এবং জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান।

তারপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার কয়েক বছর পর লেখক, ব্লগারদের কুপিয়ে হত্যার কয়েকটি ঘটনা জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি আবার সামনে আনে।
এরমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক, সিরিয়ার বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়ে আইএস; তাদের মতাদর্শে বিশ্বের নানা দেশে গড়ে ওঠে উগ্রবাদী ইসলামি সংগঠন।
বাংলাদেশে ২০১৬ সালে গুলশান হামলার মধ্যদিয়ে এদেশেও আইএসের অনুসারী থাকার বিষয়টি সামনে আনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। কেননা হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় জড়িতরা আইএসের পতাকা বহন করছিল।
তবে বাংলাদেশ পুলিশ তখন বলত, এদেশে আইএস নেই, উগ্রবাদী যারা রয়েছে, তারা এদেশীয়। তাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আইএসের কোনও যোগাযোগ নেই।
দুই রায়ে কী ছিল
হলি আর্টিজান বেকারিতে কমান্ডো অভিযানে হামলাকারী পাঁচ তরুণই নিহত হয়েছিলেন। তারা হলেন- নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামিহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।
তাদের পরিচয় প্রকাশের পর জঙ্গি সম্পর্কে সাধারণ ধারণাটি একেবারে বদলে যায়। দেখা যায়, এদের মধ্যে পায়েল ছাড়া কেউই মাদ্রাসায় পড়া গরিব ঘরের কেউ নয়। চারজনই নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া ধনী পরিবারের সন্তান, তাদের কেউ কেউ পড়াশোনা করছিলেন বিদেশেও।
মারা যাওয়ায় তাদের বাদ দিয়েই ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আটজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির। হামলার পরদিনই গুলশান থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলাটি করেছিলেন ওই থানার এসআই রিপন কুমার দাস।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান বহুল আলোচিত এই মামলার রায় দেন।
তাতে জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজিব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে র্যাশ, সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মামুনুর রশিদ রিপন, শরিফুল ইসলাম খালিদ- এই সাতজনের মৃত্যুদণ্ড হয়। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান নামে অভিযুক্ত আরেকজন খালাস পান রায়ে।
রায়ে বিচারক বলেন, বাংলাদেশ তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ও দানবীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।
কলঙ্কজনক এ হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হরণের চেষ্টা হয়েছিল বলেও রায়ে বলেন বিচারক।

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিচারক বলেন, তাতে ভাগ্যহত মানুষের স্বজনেরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।
এই মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) এবং আপিলের শুনানি নিয়ে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেয় হাই কোর্টের বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ। এই বছরের ১৭ জুন পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয়।
এই রায়েও বলা হয়, তদন্তকালে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক, ডিএনএ ও ইমিগ্রেশন রিপোর্ট এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা গেছে, নিষিদ্ধ জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতৃত্বে অতি উগ্র অংশ নব্য জেএমবি পরিচয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায়।
হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নৃশংসতা, ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে সন্ত্রাসীদের সামগ্রিক নিষ্ঠুর আচরণের বিষয়টি উঠে আসে হাই কোর্টের রায়েও; এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কথাও বলা হয়।
অভিযানে মারা যাওয়া পাঁচজনকে নিয়ে হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, ২২ জন নাগরিককে হত্যা করেছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্য থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অপরাধে ওই পাঁচজন সন্ত্রাসী অপরাধী। ওই ৫ সন্ত্রাসীর মধ্যে যদি কেউ বেঁচে থাকতেন, তাহলে তাকে এই আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেত।
দণ্ডিত সাত আসামিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থ ও অস্ত্র সংগ্রহ, হামলাকারী বাছাই করে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ঘটনাস্থলে না থাকায় তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড করে হাই কোর্ট।
