Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

অর্থের অভাবে ডেঙ্গুর ‘ডেথ রিভিউ’ বন্ধ

IEDCR-18062025
[publishpress_authors_box]

অর্থের অভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের ‘ডেথ রিভিউ’ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বুধবার ডেঙ্গু রোগের বাহকের কিটতাত্ত্বিক জরিপের (২০২৪-২৫) ফলাফল প্রকাশ এক অনুষ্ঠানে অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশীদ একথা জানান। রাজধানী ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সম্মেলন কক্ষে এ অনুষ্ঠান হয়।

গত বছর প্রায় ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে। তার আগেও প্রতিবছরই ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এত মানুষের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যায়নি।

এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঠিক কী কী কারণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে- তা জানতে সরকারের পক্ষ থেকে ডেথ রিভিউ কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ডেথ রিভিউ কমিটি কত মৃত্যু নিয়ে কাজ করেছে, কেন এত মানুষের মৃত্যু ঘটলো- সেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার এ নিয়ে প্রশ্ন তোলো হলেও কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক বলেন, “গত বছরে (২০২৪) আমি আসার পরে ডেঙ্গুর ডেথ রিভিউ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ১২৪ রোগীর ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। কমিটিও করা হযেছিল। কয়েকটি বৈঠকও করেছিলাম আমরা, সেখানে একটা স্ট্রাকচা’ দাঁড় করানো হয়েছিল যে কী কারণে মৃত্যু হচ্ছে।

“কিন্তু আর আমি আগাইতে পারি নাই। আপনারা বুঝতে পারছেন যে ৮ থেকে ১০ জন মানুষ নিয়ে যদি মিটিং করি, সেখানে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে খুব বেশিদিন কন্টিনিউ করা যায় না। আমার ফান্ড একদম জিরো। তবে যে স্ট্রাকচার দাঁড় করানো হয়েছিল সেখানে বেশিরভাগই কজ অব ডেথ ছিল ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম। আর এর মধ্যে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২১ থেকে ৩০ বছরের ভেতরে; এই বয়সেই বেশি মৃত্যু হয়েছে।”

তাহলে কি অর্থের অভাবে ডেথ রিভিউ কমিটির কাজ বন্ধ হয়ে গেছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা কন্টিনিউ করা যাচ্ছে না আসলে।” ‍

ডেঙ্গু রোগীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজতে আইইডিসিআর ওই ডেথ রিভিউ কমিটি বা মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটির হাসপাতালের দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট, রোগীর শারীরিক অবস্থা, অন্যান্য কোমর্বিডিটি এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করার কথা।

আইইডিসিআর ২০১৯ সালে এ কমিটি গঠন করার সময়ই এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বুধবারের অনুষ্ঠানে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এইডিস মশার বিস্তার নিয়ে জরিপ করা হয়েছে। সর্বশেষ জরিপ হয়েছে গত মে মাসে।

এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (সিডিসি) প্রতিবছর আইইডিসিআর এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে এইডিস মশার বিস্তার ও ঝুঁকি মূল্যায়নে মোট তিনটি জরিপ করে থাকে।

প্রাক-বর্ষা, বর্ষাকালীন এবং বর্ষার পরবর্তী সময়ে। বর্ষার আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে প্রাক-বর্ষা জরিপ সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসে হয়; ফলাফল প্রকাশ হয় মে মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা জুনের প্রথম সপ্তাহে।

বর্ষাকালীন জরিপ হয় জুন-জুলাই মাসে, যখন জমে থাকা পানিতে মশা জন্মানোর ঝুঁকি বাড়ে। এরপর আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে হয় বর্ষা পরবর্তী জরিপ, যা বর্ষার পর পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সহায়তা করে।

তবে এবারে প্রাক বর্ষা জরিপ করেনি স্বাস্থ্য বিভাগ, গত বছর হয়নি বর্ষা পরবর্তী জরিপ। তবে মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আইইডিসিআর এবারের জরিপ করেছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকায় আইইডিসিআর এই জরিপ পরিচালনা করে। পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ ও মাগুরা পৌর এলাকাও ছিলে তাদের জরিপের এলাকা।

জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন।

তিনি জানান, রাজধানী ঢাকার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ বহুতল ভবনে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে; যেখানে গত বছরের মে মাসে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ। অর্থ্যাৎ গত বছরের তুলনায় লার্ভার হার বেড়েছে ১৬ শতাংশ। 

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টি ওয়ার্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২, ৮, ১২, ১৩, ২২ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪, ২৩, ৩, ৪৬, ৪৭, ৩১ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স ২০ এর বেশি।

এইডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ নামে পরিচিত। এই ‘ব্রুটো ইনডেক্স’-এ লার্ভার ঘনত্ব ২০ শতাংশের বেশি অর্থ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

জরিপে দেখা গেছে, এইডিস মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে বহুতল ভবনে ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ ছাড়া ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবনে, একক বাড়িতে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ফাঁকা স্থানে ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ঝিনাইদহ, মাগুরায় এইডিস মশার ঘনত্ব বেশি

জরিপের ফলাফল তুলে ধরে তাহমিনা শিরীন বলেন, ঢাকার বাইরে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে এইডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি।

ঝিনাইদহ পৌরসভায় ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৬০ শতাংশ, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটা মাগুরায় ৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পিরোজপুরে ২০ শতাংশ আর পটুয়াখালী পৌরসভায় ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলা ইতোমধ্যেই হটস্পট হয়ে উঠেছে। সেখানে হাসপাতালে বেড সঙ্কটের কারণে রোগীদের থাকতে হচ্ছে মেঝেতে, সিঁড়ির পাশে, বাথরুমের পাশে। রয়েছে জনবল ও ওষুধ সঙ্কট।

অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হাসান মো. মঈনুল আহসান বলেন, চিকিৎসক সঙ্কট ছিল; নতুন করে পদায়ন করা হয়েছে। দরকার হলে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সেখানে আরও চিকিৎসক-নার্স পদায়ন করা হবে। ওষুধসহ স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছে কয়েকদিন।

তবে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবু জাফর বলেন, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্যের বিষয় নয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনের অংশগ্রহণ ছাড়া মশা নিধন করা যাবে না। মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি মশা নিধন ও ওষুধের কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ আছে, এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ নিয়ে লুকোচুরি করা হয়েছে।

এ নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনকে কথা বলার অনুরোধ জানান স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক।

ডা. মুশতাক তখন বলেন, “যেকোনো আউটব্রেকের সময় প্রস্তুতি নিতে হয়। সবচেয়ে বড় মানসিক প্রস্তুতি। প্রথমে কেউ ধাক্কা খেলেও পরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

“যখন সাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সিগনাল দেওয়া হয়, তখন কিন্তু মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য এই সিগনাল দেওয়া হয় না। দেওয়া হয় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য, প্রস্তুত হওয়ার জন্য।”

স্বাস্থ্য খাতেও একই ধরনের সতর্কতা, প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ডা. মুশতাক বলেন, “কর্তৃপক্ষকে বলবো- একটা রক্ষণশীলতা কাজ করে আমাদের ভেতরে যে এটা বলা যাবে না, প্যানিক হয়ে যাবে। কিন্তু যত দেরিতে বলবো, তত বেশি প্যানিক হয়ে যাবে। এতে করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি করে।

“মন্ত্রণালয় থেকে শুরু একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত যারা রয়েছেন…তাদেরকে জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি অবশ্যই অবহিত করতে হবে। যত দ্রত মানুষকে জানানো যাবে, তত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।”

অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি এইডিশ মশা বাহিত চিকুনগুনিয়া ও জিকা প্রশ্নে অধ্যাপক তাহমিনা শিরিন বলেন, একই প্রক্রিয়াতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাস শনাক্ত করা যায় একসঙ্গে একই পরীক্ষায়; এজন্য আলাদা করে কোনও পরীক্ষা করতে হয় না। গত বছরে জিকাতে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়, তবে এই বছরে কোনও রোগী শনাক্ত হয়নি।

তিনি বলেন, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে কিছু চিকুনগুনিয়ার রোগীও পাওয়া গেছে। এবারও ৪০০ এর মতো রোগী পাওয়া গেছে। তবে চলতি বছরে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত