অভ্যুত্থানে ‘ফ্যাসিবাদী’ শক্তিকে বিদায় করা হলেও দেশে যে সঙ্কট চলছে, তার অবসানে নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।
শুক্রবার ঢাকায় দলটির ত্রয়োদশ কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই অবস্থান তুলে ধরে বলা হয়, নির্বাচিত সরকার ছাড়া দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না।
সিপিবি সভাপতি শাহ আলম দলীয় অবস্থান তুলে ধরে বলেন, “যারা সামনের নির্বাচন নিয়ে নানা কৌশলে বিতর্ক তুলছে এবং জাতীয় সঙ্গীত পাল্টে দিতে হবে, ৭২ এর সংবিধান বাতিল করতে হবে, চার মূলনীতি বাতিল করতে হবে বলে দাবি করছে, তারাই এখন গণতন্ত্রের শত্রু।”
নির্বাচন হলে সিপিবি ক্ষমতায় যাবে, এমন সম্ভাবনা না থাকলেও তিনি বলেন, “নির্বাচন যদি না হয়, এই খেলা চলতে থাকবে। আর নির্বাচন হলে একটা সেন্টারে ক্ষমতা আসবে। তাই আমাদের বর্তমানের স্লোগান হলো- অতি সত্বর দরকার, নির্বাচিত সরকার।”
“নির্বাচন না হলে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং মৌলবাদী শক্তির আরও বেশি উত্থান হবে,” হুঁশিয়ার করেন তিনি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে।
বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চাইলেও জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামী দল এবং অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ি জুলাই সনদ প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। জামায়াত সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিও জানাচ্ছে। অন্যদিকে এনসিপি জোর দিচ্ছে সংস্কারে।
দেশকে সঙ্কটমুক্ত করতে আশু নির্বাচনের দাবি জানালেও নির্বাচনই যে সার্বিক সমস্যার সমাধান দেবে, তা মনে করেন না সিপিবি সভাপতি শাহ আলম।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার, শ্রেণী চরিত্রের কোনও পরিবর্তন হয় নাই। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিদায় হয়েছে, নির্বাচনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রে ফিরবে দেশ, এরপর শোষণ-বৈষম্যহীন দেশ গড়ার লড়াই করতে হবে।
জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হওয়া নিয়ে সমালোচনার জবাবে শাহ আলম বলেন, “আমরা সঠিকভাবেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলাম।”
তবে অভ্যুত্থানের পর সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটেছে স্বীকার করে সেজন্য বামপন্থিদের বিভাজনকে দায়ী করেন তিনি।
শাহ আলম বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশে দক্ষিণপন্থী উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান। বামদের সুবিধাবাদ, বিভেদ এবং হটকারিতা আর রাজনীতির দেউলিয়াত্বের কারণেই আজকে র্যাডিক্যাল ইসলামের উত্থান হয়েছে বাংলাদেশে।”
‘সমাজ বদলের লক্ষ্যে শোষণ-বৈষম্যহীন বাম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা কর’- স্লোগান নিয়ে চার দিনব্যাপী কংগ্রেস শুরু করেছে সিপিবি। কংগ্রেস উদ্বোধন হয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি-রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নীতিনিষ্ঠ বাম গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলা এবং বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সরকার গঠন এখনকার জরুরি কর্তব্য।
“দেশে সংস্কার নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হলেও জনজীবনের সঙ্কট সমাধানসহ ব্যবস্থা বদলের জন্য মৌলিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। এসব বিষয়ে কংগ্রেসে আমরা আলোচনা করে সুনির্দিষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করব।”
এবারের কংগ্রেসে অংশ নিচ্ছেন সারাদেশ থেকে আসা ৫৫০ জন প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকসহ ৬ শতাধিক সিপিবি সদস্য। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে কংগ্রেসের উদ্বোধনী দিনের আয়োজনের পর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর তোপখানা রোডের বিএমএ মিলনায়তনে কাউন্সিল অধিবেশন হবে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া উদ্বোধন অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন দলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মিহির ঘোষ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই অভ্যুথানসহ বিভিন্ন ঘটনা এবং দেশে-বিদেশে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের শুভেচ্ছাবার্তা পড়ে শোনান কংগ্রেসের আন্তর্জাতিক উপপরিষদের আহ্বায়ক মানবেন্দ্র দেব।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দলের প্রবীণ নেতা ও সদস্যদের বিশেষ সম্মাননা দেয় সিপিবি।



