কার্যকর বাজার তদারকির মাধ্যমে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক সংলাপে।
মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে এই সংলাপ হয়।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিসিসিআই জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শোয়েব, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান বক্তব্য রাখেন।
ডিসিসিআই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী স্বাগত বক্তব্যে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও বাজারে পণ্যের মূল্য কারসাজি, কৃত্রিম সংকট, নিম্নমানের পণ্য এবং হয়রানির কারণে ভোক্তাসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। এরফলে ভোক্তাদের আস্থা কমছে এবং সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তিনি একটি সমন্বিত বাজার তদারকি কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতাপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা তৈরির ওপর জোর দেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের অভিমত
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন। এসময় তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
মোহাম্মদ আলীম আখতার খান জানান, জনবল সংকটের কারণে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টিতেই অধিদপ্তরটির কার্যালয় নেই। ফলে কার্যকর তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। তিনি ভোক্তা অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন আইন ও অধ্যাদেশের সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের পক্ষে মত দেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, পণ্য পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে নিত্যপণ্যের মূল্য বেশি বাড়ছে। অল্প সংখ্যক অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে বৃহৎ বেসরকারি খাতের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
এই অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে সৎ ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সমন্বিত বাজার মনিটরিং জোরদারের করতে হবে।
ডিজিটাল পদ্ধতির মনিটরিং সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ভোক্তাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্যও সুফল বয়ে আনবে।
পণ্য সরবরাহ সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত তথ্য প্রাপ্তি ও গবেষণা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মত দেন।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনা ও উদ্বেগ
ঢাকার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ গোলাম মওলা বলেন, দেশের ১৮টি সরকারি চিনিকলের বেশিরভাগই কার্যকর না থাকায় এবং ভোজ্যতেল রিফাইনারি কমে যাওয়ায় কিছুসংখ্যক আমদানিকারকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
তিনি পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে অতি মুনাফা রোধে খুচরা পর্যায়ের মুনাফার হার নির্ধারণের প্রস্তাব করেন।
বাংলাদেশ পল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি খন্দকার মনির আহমেদ ডিম সংরক্ষণে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেন, যা উদ্যোক্তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, দেশের পোল্ট্রি খাতে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং ৬০ লক্ষ লোক কর্মরত, তাই এই বৃহৎ শিল্পকে সরকারের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।
চিনি ও তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসেম বন্ধ সরকারি চিনিকলগুলো আবারও চালু করার আহ্বান জানান। পাশপাশি চিনির ওপর আরোপিত কর কমানোর প্রস্তাব করেন।
এছাড়া পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি ও ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা নিয়ে কথা বলেন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিবৃন্দের সমন্বয়ে একটি কার্যকর মনিটরিং সেল স্থাপনের প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক গোলাম সারওয়ার বলেন, এ বছর আলুর দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি আলুর সঠিক মূল্য নির্ধারণে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান, যাতে আগামীতে ফলন হ্রাস ও উচ্চ মূল্য এড়ানো যায়।



