চিরবিদায় নিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর; তবে তার আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দি দিয়ে গেছেন তিনি।
সেখানে তিনি নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য শেখ হাসিনাকে অভিযুক্ত করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে দমনের দোষ দিয়েছেন শেখ হাসিনাকে। রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান অসম্ভব বলে মত দিয়ে যান তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গণহত্যার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচারের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষী হিসাবে জবানবন্দি দেন বদরুদ্দীন উমর।
এই বাম তাত্ত্বিক, লেখকের মৃত্যুর পরদিন সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের কাছে তার সেই জবানবন্দি প্রকাশ করেন। সেই জবানবন্দির বক্তব্য একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেছে বাসস।
এক সময়ের পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা বদরুদ্দীন উমর জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে ৯৪ বছর বয়সে রবিবার মারা যান।
গত বছর ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, সেই জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান ছিল বদরুদ্দীন উমরের।
জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, “এই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ছাত্রদের ভূমিকা। তারাই এই আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল। ইতিহাসে ছাত্ররা বারবার নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু এবারের আন্দোলনে তারা যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছে, তা বিরল।”
এর আগে দেড় দশক শেখ হাসিনা নির্বাচনগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছিলেন বলে অভিযোগ করে যান তিনি।
“শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল নির্বাচনগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনই তিনি ম্যানিপুলেট করেছেন। এগুলো সম্ভব হয়েছে, কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র-সব কিছুর ওপর সে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রথম থেকেই শেখ হাসিনা ঠিক করেছিলেন যে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবেন।”
নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শেখ হাসিনা বাতিল করেছিলেন দাবি করে উমর বলেন, “কারণ তিনি বুঝেছিলেন যে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে পরবর্তীবার তারা আর জিততে পারবে না। সুতরাং নির্বাচনে জিততে হলে তাকে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে।
“কোনও নীতিবোধ বা নৈতিক লজ্জাবোধ তার ছিল না। তিনি প্রশাসনকে দুইভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন— প্রথমত ঘুষ, টাকা-পয়সা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এবং দ্বিতীয়ত হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে।”

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনেও শেখ হাসিনা নিষ্ঠুর ছিলেন দাবি করে উমর বলেন, “কোনও রাজনৈতিক দল যাতে কার্যকরভাবে নড়াচড়া করতে না পারে, সে জন্যও নির্যাতন করা হয়েছে। প্রচুর মানুষকে গ্রেপ্তার করে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে বিনা কারণে। ‘আয়না ঘর’ নামে টর্চার সেল তৈরি করা হয়েছে, যেটা শেখ মুজিবের আমলেও ছিল না।
“শেখ মুজিব বিরোধীদের সরাসরি হত্যা করতেন। শেখ হাসিনা শুধু হত্যা করতেন না, নির্যাতনও করতেন এবং এতে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতেন।”
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করেন এক সময়ে চীনপন্থি হিসাবে পরিচিত পাওয়া বাম তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর।
“বাংলাদেশ নিজেই একটি ‘গণঅভ্যুত্থানের দেশ’। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৯০ সালের ঘটনাগুলো তার উদাহরণ। তবে এইসব অভ্যুত্থানের মধ্যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে বিস্ফোরক, সবচেয়ে রূপান্তরমূলক।
“ভাষা আন্দোলনের (১৯৫২) মধ্য দিয়ে ভাষার স্বীকৃতি এসেছিল, ১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল, ১৯৯০-এ এরশাদের পতনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এসব আন্দোলনে এমন সর্বগ্রাসী ভাঙন, এমন পলায়নপর সরকার বা দল দেখা যায়নি।”
অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে বদরুদ্দীন উমর বলেন, “শুধু তিনিই নন, তার মন্ত্রিসভা, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা, এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও দেশ ছেড়ে পালায়। এই রকম ব্যাপক দলীয় পতন, আতঙ্ক ও আত্মগোপন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনও ঘটেনি।
“শেখ হাসিনা পালানোর পরদিন থেকেই সারা দেশে শেখ মুজিবের মূর্তি ও মুরাল সাধারণ মানুষ নিজেরা ভেঙে ফেলে। কেউ কোনও নির্দেশ দেয়নি, তবুও এটি ঘটেছে। এটি এক ধরনের ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’, যার বহিঃপ্রকাশ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় হয়েছে। বহু বছর ধরে নির্যাতিত, অবদমিত জনগণের ক্রোধ এই অভ্যুত্থানে বিস্ফোরিত হয়েছে।”
স্বাধীনতার পর নিজের রাজনৈতিক সঙ্গী সিরাজ সিকদারের নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে বদরুদ্দীন উমর বলেন, “শেখ মুজিব নিজেই এক সময় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘সিরাজ শিকদার কোথায়?’ যেটা ছিল একটি অমানবিক ব্যঙ্গ। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিশোধ হয়েছিল ওই বছরেরই আগস্টে, যখন মানুষ বলেছিল, ‘শেখ মুজিব কোথায়?’ এভাবে ইতিহাসে অনেক সময় ঘটনাগুলো পুনরাবৃত্তি হয় প্রতিশোধের রূপে।”

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিষেধাজ্ঞায় থাকা আওয়ামী লীগ আর কখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না বলে মত প্রকাশ করে গেছেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “এই অভ্যুত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতা থেকে বিতাড়িতই হয়নি, তারা জনগণের বিশ্বাস থেকেও বিতাড়িত হয়েছে।
“মুসলিম লীগের পতনের মতোই এবারের গণঅভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিণতি তৈরি করেছে। ভারতের সহায়তায় তারা হয়ত কিছু অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাতে পারে, কিন্তু জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের পুনঃউত্থান অসম্ভব বলেই মনে হয়।”
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালে চলা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জবানবন্দি দেন বদরুদ্দীন উমর।
প্রসিকিউটর গাজী তামীম সাংবাদিকদের বলেন, “প্রয়াত বদরুদ্দীন উমর শেখ হাসিনার মামলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন। উনি ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারলেন না।
“তবে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উনি ওনার সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের ১৯(২) ধারা অনুযায়ী কোনও সাক্ষী যদি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দিয়ে মারা যান, সেক্ষেত্রে প্রসিকিউসনের আবেদনে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া সাক্ষ্যকে গ্রহণ করতে পারেন।”



