এক যুগ আগে ঢাকার শাপলা চত্বরে অভিযানের নামে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে হেফাজতে ইসলামের মামলায় শেখ হাসিনাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দুটি আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুধবার এই পরোয়ানা জারির আদেশ দেয়।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি অন্য যাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির আদেশ হয়েছে, তারা হলেন- গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক পুিলশ প্রধান বা আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার ও বেনজীর আহমেদ।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই আন্দোলনের মুখপাত্র ছিলেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইমরান।
নারী উন্নয়ন নীতির বিরোধিতাকারী হেফাজতে ইসলাম তখন শাহবাগ আন্দোলনের বিরোধিতায় নেমেছিল। ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ওই বছরের ৫ মে মতিঝিলে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডেকেছিল তারা। সেই সমাবেশ ঘিরে সংঘাত-সহিংসতা ঘটে। এরপর রাতে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে হেফাজতকর্মীদের মতিঝিল থেকে তুলে দেওয়া হয়।
শেখ হাসিনার সরকারে তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। হাসান মাহমুদ খন্দকার ছিলেন তখন আইজিপির দায়িত্বে। বেনজীর তখন ছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটার পর তার দেড় দশকের শাসনকালে নির্যাতন-নিপীড়নের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে যে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার সরকার গঠন করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের পর সেখানে তার বিচারে অভিযোগ জমা পড়তে থাকে।

হেফাজতে ইসলামও ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে অভিযানে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ জমা দেয় গত বছরের আগস্টেই। তদন্ত সংস্থার কাছে দেওয়া সেই অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ১৯ জনকে গণহত্যার জন্য দায়ী করেন হেফাজত নেতারা।
জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দুই মামলায় গত অক্টোবরেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে। বুধবার হেফাজতের মামলায়ও একই আদেশ এল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে গ্রেপ্তারি আবেদনের শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।
মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করা হয়েছিল জানিয়ে মিজানুল সাংবাদিকদের বলেন, “চারজন বিভিন্ন মামলায় জেলহাজতে থাকায় তাদেরকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছি। উভয় আবেদন ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেছেন। যে ৫ জন গ্রেপ্তার হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।”
কারবন্দি চারজন হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক পুলিশ প্রধান এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম।
তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ এসেছে।
প্রসিকিউটর মিজানুল বলেন, “শাপলা চত্বরে গণহত্যার ঘটনায় আরও অনেকের বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে, তদন্তের স্বার্থে আমরা এখনই তাদের নাম প্রকাশ করছি না। এদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি।”
আগামী ১২ মে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
সরকারের কোনও দায়িত্বে না থাকার পরও ইমরানের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল বলেন, “শাপলা চত্বরে গণহত্যায় ইমরান এইচ সরকারের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে আমরা ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।
“আমরা আদালতে বলেছি- শাপলা চত্বরে গণহত্যার পটভূমি তৈরি করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। শুধু তাই নয়, এই গণজাগরণ মঞ্চ বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়ের কৃষ্টি-কালচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। একই সঙ্গে হেফাজতের কর্মীদের হত্যাকাণ্ডের সময় এই গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা সশরীরে অংশগ্রহণ করেছে বলে আমাদের তদন্ত সংস্থা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।”

শাপলা চত্বরে অভিযানের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতের সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ৫ মে দিনভর সংঘাত-সহিংসতায় এক পুলিশসহ ১১ জন নিহত হওয়ার খবর তখন সরকারি প্রেসনোটে দাবি করা হয়েছিল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যমে নিহতের সংখ্যা এসেছিল ৩৯ জন।
হেফাজত তখন তাদের শত শত কর্মী নিহত হওয়ার দাবি করেছিল। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তখন ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছিল। তা অতিরঞ্জিত দাবি করে তখন অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। আদিলুর এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল বলেন, “যাদেরকে হত্যা করা হয়, তারা অধিকাংশ মাদ্রাসার ছাত্র। পরবর্তীকালে তাদেরকে অজ্ঞাত কবরে কবর দেওয়া হয়। তাদের সংখ্যা নিরূপর করতে দেওয়া হয়নি। পরিবারের কাছে চাপ সৃষ্টি করা হয়, যাতে তারা সন্তানদের ব্যাপারে মুখ না খোলেন।”
ওই সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের পক্ষে লড়েছিলেন তাজুল।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসের বাক পরিবর্তনের একটি ঘটনা ছিল শাপলা চত্বরের গণহত্যা। এই গণহত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিবাদের সর্বশেষ আশার প্রদীপ ধর্মীয়গরিষ্ঠরা তাদের ধর্মীয় অধিকারের ব্যাপারে যে সোচ্চার ছিল, তা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।”



