ভারতীয় উপমহাদেশের বিয়েতে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে সোনার গয়না। ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে প্রায় সব ধরনের বিয়েতেই কনে ও বরপক্ষের জন্য সোনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কনে শরীরে থাকা মূল্যবান এই ধাতুন গয়না দিয়ে বিচার করা হতো কনের বাবা কিংবা স্বামীর বাড়ির সামর্থ্য। পাশাপাশি সোনা নারীর পারিবারিক জীবনে নিরাপত্তারও প্রতীক।
সময়ের সঙ্গে বিয়ের অনেক আচারই বদলছে, তবে সোনা আদানপ্রদান বা সোনা উপহারের যে প্রথা তা এখনও টিকে আছে। এখনও মেয়ের বিয়েতে নিজের সঞ্চয় ভেঙে গয়না গড়িয়ে দেন অনেক বাবা, কিংবা ঋণ নিয়ে হলেও নববধূর জন্য জড়োয়া কেনেন স্বামী।
বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা চড়াই-উৎরাইয়ের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্ববাজারে সোনার দাম চড়া। স্বাভাবিকভাবেই যার রেশ পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। বিশেষ করে চলতি বছর সোনার দাম একের পর এক রেকর্ড করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে দেড় লাখ ছাড়িয়ে গেছে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট মানের সোনার দাম।
দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের বাজারে সোনার বিক্রি কমেছে। এমনকি বিয়েতেও সোনা কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে। তার বদলে কনের শরীর আলোকিত করছে কুন্দন-পাথর বসানো, গোল্ড প্লেট করা কিংবা সিটি গোল্ডের গয়না। কনেরাও আগ্রহ নিয়েই সোনার সঙ্গে মিলিয়ে পরছেন এসব গয়না।
বিয়েতে কেন সোনার বদলে কুন্দনের গয়না পরেছিলেন তা জানতে চেয়েছিলাম ফাহিমা কবীরের কাছে। তিনি বলেন, “আমার মায়ের বিয়ের কিছু গয়না আমার আছে। কিন্তু সেগুলো আমি মূল অনুষ্ঠানে পরার জন্য রেখে দিয়েছি। তার বদলে আকদে কুন্দনের সেট পরেছি।
“আমার স্বামী কিছু গয়না কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন এত দাম, বিয়েরও এত খরচ। তাই আমিই কিনতে দিইনি। এর চেয়ে কুন্দনের সেটই ভালো। অল্প খরচে সুন্দর সব গয়না পাওয়া যায়, পোশাকের সঙ্গে, মেকাপের সঙ্গে মিলিয়ে পরা যায়।”
বিয়েতে সোনার সঙ্গে মিলিয়ে কিছু গোল্ড প্লেট করা গয়না পরেছিলেন বলে জানালেন মিহিকা রায়। তিনি বলেন, “আমার শখ ছিল লাল শাড়ির সঙ্গে গা-ভর্তি করে গয়না পরব। কিন্তু সোনার দাম কেমন তা তো দেখছেনই। খুব ধনী না হলে এই শখ মেটানো সম্ভব নয়। সে কারণে সোনার মূল গয়নার সেটটির সঙ্গে ম্যাচিং করে গোল্ড প্লেট করে সীতাহার, টায়রা-টিকলি, ঝাপটা এসব বানিয়ে নিয়েছিলাম।
“আমার গা-ভর্তি গয়নারও শখ মিটল, আবার বাবা কিংবা স্বামীর ওপর বাড়তি চাপও হলো না। তাছাড়া সোনার এত ভারি গয়না তো সাধারণত তেমন পরার সুযোগ হয় না। হয়ত আলমারিতেই পড়ে থাকে। এর চেয়ে সিটি গোল্ড বা পাথর বসানো গোল্ড প্লেটের সেটগুলোই ভালো।”
অনেকেই আজকাল ভারী সোনার গয়না পরতে বা সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করেন না। তারা বরং বিকল্প গয়নাতেই স্বাচ্ছন্দ্য।
তাদেরই একজন আফরোজা মিতু। তিনি জানালেন, নিরাপত্তার কারণে বাড়ির বাইরে যেহেতু সোনার গয়না পরার সুযোগ নেই তাই তিনি বিয়েতে হালকা কিছু গয়না গড়িয়েছিলেন। যার মধ্যে ছিল সবসময় পরার মতো চেইন, ছোট-ছিমছাম নকশার দুল, আংটি, লকেট আর এক গাছা চিকন চুড়ি।
আফরোজা বলেন, “সাধারণত বাইরে কোথাও গেলে ইমিটেশন জুয়েলারি পরে যাই। নিজের বিয়েতেও সব কুন্দন আর গোল্ড প্লেট করা সেট পরেছিলাম। নাকফুল আর আংটি ছাড়া কিছুই সোনার ছিল না।”
সোনা না পরলেও তার বিয়ের সাজ সবাই খুব প্রশংসা করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বাবা আর হবু স্বামী যে পরিমাণ সোনা কিনে দিতে চেয়েছিলেন তাদের সেই বাজেটের চেয়ে কমে আমি নিত্য ব্যবহারের হালকা গয়না বানিয়ে নিয়েছি। এখন পারিবারিক গেটটুগেদার বা ছোটখাটো দাওয়াতে সেগুলো পরি। আর বড় পার্টি বা দাওয়াতের জন্য তো সোনার বিকল্প গয়নাগুলো রয়েছেই।”

বাংলাদেশে সোনার বিকল্প গয়নার বাজারটি ক্রমেই বড় হচ্ছে। ঢাকার চাঁদনি চকের জুয়েলারি মার্কেটের একটি অংশজুড়ে গড়ে উঠেছে গোল্ড প্লেটিং করা গয়নার বড় বাজার। সেখানে পাথর-কুন্দন বসানো নানা বৈচিত্র্যময় নকশার গয়না পাওয়া যায়। এসব গয়নার বড় অংশ আসে ঢাকার সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়ন থেকে। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে চলে আসছে গয়না গড়ার কাজ। যে কারণে এটি গয়নার জনপদ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
ভাকুর্তায় মূলত তৈরি হয় পিতল ও তামার গয়না। নেকলেস, সীতাহার, বালা, চুড়ি, ব্রেসলেট, টিকলি, টায়রা, কানপাশা, ঝুমকাসহ নানা ধরনের গয়নার বেস তৈরি করেন এই ইউনিয়নের কারিগররা। তারপর তা পাইকারদের হাত ধরে ছড়িয়ে যায় সারা দেশে। ঢাকার তাঁতীবাজারসহ বেশ কয়েকটি স্থানে এসব গয়নার ওপর করা হয় পালিশ, বসানো হয় কুন্দন-পাথরসহ নানা অনুষঙ্গ। তারপর সেসব গয়নাই শোভা পায় বড় বিপণিবিতানের আলো ঝলমলে দোকানে।
এছাড়া ভারত ও পাকিস্তান থেকেও প্রচুর গয়না আমদানি করা হয়। বিশেষ করে বিয়ের কনের পরার মতো জড়োয়া গয়না। ভারতের জয়পুরী ও পাকিস্তানের মুলতানী গয়না এখন কনেদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। দেশি গোল্ড প্লেট গয়নার চেয়ে এসব গয়নার দাম তুলনামূলক বেশি। তবে নকশার বৈচিত্র্য ও নিখুঁত কাজের কারণে এসব গয়নাও কিনছেন অনেকে।
সোনার বিকল্প গয়নার বড় বাজার চাঁদনি চক
চাঁদনি চক রাজধানী ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত বাজার। নিউ মার্কেটের উল্টোদিকে নীলক্ষেতের পাশে অবস্থিত এই বাজার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজসহ আশপাশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের পাশাপাশি ঢাকার মেয়েদের পছন্দের মার্কেট এটি। এখানে সব ধরনের পোশাক, গয়না, জুতা, প্রসাধনী সামগ্রী ইত্যাদির দোকান রয়েছে।
এই চাঁদনি চকের জুয়েলারি মার্কেটের একটি অংশজুড়ে গড়ে উঠেছে গোল্ড প্লেটিং করা গয়নার বড় বাজার। সেখানে পাথর-কুন্দন বসানো নানা বৈচিত্র্যময় নকশার গয়না পাওয়া যায়। ভাকুর্তার পাশাপাশি আরও কয়েকটি জেলা থেকে এসব গয়নার বড় অংশ আসে ।
সরেজমিন দেখা যায়, ফুটপাট থেকে শুরু করে চাঁদনি চক কমপ্লেক্সে জমে উঠেছে সোনার বিকল্প গয়নার বাজার। অনেক জুয়েলারি দোকানে সোনার গহনার পাশাপাশি পাথর-কুন্দন বসানো নানা বৈচিত্র্যময় নকশার গয়না বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাতে কম দামে হয়না পাওয়া গেলেও মাকের্টের ভেতরে গয়নার দাম বেশি।
চাঁদনি চক কমপেক্সের দ্বিতীয় তলায় আব্রু ফ্যাশন অ্যান্ড জুয়েলারিতে গিয়ে দেখা যায়, মেয়েদের বিভিন্ন পোশাকের পাশাপাশি সোনার বিকল্প গয়না সীতাহার, টায়রা-টিকলি, ঝাপটার পাশাপাশি সবসময় পরার চেইন, ছোট-ছিমছাম নকশার দুল, আংটি, লকেট, চুড়িসহ নানা ধরনের গহনা বিক্রি হচ্ছে। অনেকে হিজাবের সঙ্গে মিলিয়ে গোটা সেট কিনছেন; কেউ আবার শাড়া বা সালোয়ার কামিজের সঙ্গে মিলিয়ে কিনছেন।
আব্রু ফ্যাশন অ্যান্ড জুয়েলারির বিক্রয় প্রতিনিধি কাকলী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের দোকানে সব সময়ই ভালো বিক্রি হয়। তবে এখন বেশ জমজমাট। এর কারণ হচ্ছে সামনে ঈদ। কয়েক দিন পরে এই এলাকায় ঢোকাই যাবে না। সে কারণে রোজা শুরু থেকেই অনেকে ঈদের কেনাকাটা সেরে ফেলছেন।”
সোনার বিকল্প গহনার বিক্রি আগের থেকে বেড়েছে কিনা-জানতে চাইলে কাকলী বলেন, “সেটা একটু বেড়েছে। সোনার দাম অনেক বেড়ে গেছে। সে কারণে অনেকেই এখন ভালো ভালো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্যও সোনার বিকল্প গয়না কিনছেন।”
দাম কেমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “বিভিন্ন দামের আছে। আমাদের দোকানে নেকলেস, হাত, কান, নাকসহ পুরো একটা সেট দেড় হাজার টাকা থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।”
আব্রু ফ্যাশন অ্যান্ড জুয়েলারির পাশেই মা জুয়েলার্স। এখানে সোনার গয়নার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সোনার বিকল্প গয়নাও বিক্রি হয়। এই দোকানের বিক্রি প্রতিনিধি জসিম উদ্দিন বলেন, “সোনার বাইরে যে গয়না আমরা বিক্রি করি সেটাকে সিটি গোল্ড নামেই বেশি পরিচিত। এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, দেখলে একদম মনে সোনারই গহনা। আমরা বিভিন্ন ক্যারেন্টের সোনার গহনার পাশাপাশি সিটি গোল্ডের গহনাও বিক্রি করি।”
বিক্রি মোটামুটি ভালোই হয় বলে জানান জসিম।
সোনার ভরি দেড় লাখ টাকার বেশি
এক ভরি সোনার গহনা কিনতে এখন হাতেগুণে দেড় লাখ টাকার বেশি দিতে হয়। বাজুসের সবশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, বুধবার থেকে দেশের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট সোনার ভরি বিক্রি হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯ টাকায়। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ওঠা-নামার মধ্যেই রয়েছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম। তবে যে পরিমাণ কমছে, বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি।
বর্তমানে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি সোনা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনা কিনতে লাগবে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৬ টাকা। ১৮ ক্যারেটে লাগবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৭০৯ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৩০৩ টাকায়।
এক বছর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ২২ ক্যারেটের প্রতিভরি সোনার দাশ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ১৫৮ টাকা। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এক বছরের ব্যবধানে প্রতিভরি এই মানের সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। অন্যান্য মানের সোনার দামও প্রায় একই হারে বেড়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পাশাপাশি সোনার দামও পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকায় জুয়েলারি ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। সোনার অলংকার এখন সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মুদ্রার উল্টো পিঠ হচ্ছে, দাম বেড়ে যাওয়ায় পুরোনো সোনা কিংবা অলংকারের সম্পদমূল্য বেড়েছে। ফলে যাদের সিন্দুকে বা লকারে গচ্ছিত পুরোনো অলংকার রয়েছে, তারা দাম কতটুকু বাড়ল সেই হিসাব কষছেন।
দেশের বাজারে সোনার মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণ বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর মূল্যবৃদ্ধি। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে গত বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিক থেকে সোনার দাম দফায় দফায় বাড়ছে।
অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম বিশ্ববাজারে প্রথমবারের মতো ২ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রতি আউন্স সোনার দাম ২ হাজার ৯১৫ ডলার ৩৬ সেন্ট।
গোল্ড পাইসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দর বেড়েছে ৩৩৪ ডলার ২৭ সেন্ট বা ১৩দশমিক শূন্য সাত শতাংশ। আর বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৭৩৫ ডলার ৪৫ সেন্ট। শতাংশ হিসাবে যা ৩৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববাজারে প্রতিআউন্স সোনার দাম কমতে কমতে ২ হাজার ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে এখন সোনার দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের পর বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতার কারণে সোনার দাম বাড়ছে।
ক্ষমতায় বসার পরপরই চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নানা কৌশলে পাল্টা জবাবের ঘোষণা দিয়েছে বেইজিংও। পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধ আরও জোরদার হয়েছে।
পাল্টা জবাবের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ নেবে তারা।
এর আগে চীন থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে তা কার্যকর হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বাণিজ্য পরিস্থিতির কারণে সোনার দাম বাড়ছে। নিরাপদ বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সোনার চাহিদা বেড়ে গেছে। সে কারণেই দাম বাড়ছে।
প্রতি আউন্স সোনার দাম এ ধাক্কায় ৩ হাজার ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে রয়র্টার্সের প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে।
দেশের সোনার ব্যবসায় মন্দা
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সব ধরনের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায় সেই প্রভাব কিছুটা বেশি। গত কয়েক মাসে সোনার অলংকারের বেচাবিক্রি গড়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
সোনার দামের সঙ্গে চাহিদা ও জোগানের সম্পর্কও আছে। সোনার চাহিদা মূলত দুই ভাবে তৈরি হয়। যেমন গয়নার চাহিদা ও সোনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি। গয়না হিসেবে সোনা বেশি ব্যবহৃত হয় চীন ও ভারতে। পশ্চিমা দেশগুলোয়ও গয়নার ভালো চাহিদা আছে। চাহিদার মতো সরবরাহ নিশ্চিত হয় দুইভাবে—খনি থেকে নতুন উত্তোলন এবং পুরোনো সোনা বিক্রি থেকে। যদিও খনি থেকে সোনা উত্তোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের সোনার বাজার খুবই ছোট। সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও দেশে বছরে প্রায় ২০ থেকে ৪০ টন সোনার চাহিদা রয়েছে বলে জানান জুয়েলার্স ব্যবসায়ীরা। তার মাত্র ১০ শতাংশ চাহিদা পুরোনো অলংকার দিয়ে মেটানো হয়। বাকিটা ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে আসে। অবৈধভাবেও সোনা আসে। জুয়েলারি ব্যবসায় স্বচ্ছতা ফেরাতে সোনা আমদানির লাইসেন্স দেওয়া হয়। শুরুতে কিছু আমদানি হলেও নানা জটিলতায় পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সোনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ভেনাস জুয়েলার্স। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান গঙ্গাচরণ মালাকার সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সোনার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গয়না বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ছোট ও হালকা ওজনের গয়না তুলনামূলক বেশি বিক্রি হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে লেনদেন বেশি হলেও আগের চেয়ে পরিমাণের দিক থেকে সোনার গয়নার বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে।”
সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় অলংকার তৈরির ক্রয়াদেশ কমেছে জুয়েলারি দোকানে। তার প্রভাবে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে স্বর্ণশিল্পীর সংখ্যাও দিন দিন কমছে। গত দুই দশকের ব্যবধানে স্বর্ণশিল্পীর সংখ্যা চার ভাগের এক ভাগে নেমেছে বলে দাবি করেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় বিয়েশাদি ছাড়া সোনার অলংকার বর্তমানে আর কেউ কেনে না।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সহসভাপতি মাসুদুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিত্যপণ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। অন্যদিকে সোনার দামও বেশি। সব মিলিয়ে গত কয়েক মাসে সারা দেশের জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রি ৬০-৭০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে।”
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে গত কয়েক মাস ধরে সব খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ। তার প্রভাব জুয়েলারি খাতেও ব্যাপকভাবে পড়েছে।
“এখন নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। দেশে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সোনার দোকানে লুটপাট ও ডাকাতি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা হামলার শিকার হচ্ছে। আতঙ্ক ও ভয়ে অনেক এলকায় সোনার দোকান বন্ধ রাখ হচ্ছে।”
সব মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানালেন মাসুদুর রহমান।

