কোনও কারখানায় ২০ জন শ্রমিকের সমর্থন পেলেই ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দেওয়ার বিধান নিয়ে আপত্তি তুলেছে দেশের রপ্তানি অয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সেই সঙ্গে শ্রমিকের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনার দাবি তুলেছে এই দুই সংগঠন।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা।
শ্রমিকের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনার দাবি করে ওভেন পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘‘আমরা চাই না, শ্রমিকের নামে বাইরের কেউ, কোনও বাড়িওয়ালা, মেস ব্যবসায়ী, ঝুট ব্যবসায়ী বা অন্য কেউ সহজেই শ্রমিক সংগঠন করে ফেলতে পারে।”
তিনি বলেন, “পোশাক খাতে ঝুট ব্যবসা এখন একটা বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই না, বাইরের কেউ এসে শ্রমিক সংগঠন করার সুযোগটি নিয়ে শিল্পকে অস্থিতিশীল করুক।”
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে ৩০ শতাংশ শ্রমিকের সম্মতি থাকার বিধান রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন মোট শ্রমিকের অনুপাতের শর্তের বদলে ন্যূনতম শ্রমিক সংখ্যা বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছে। সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রতিষ্ঠানিক খাতে ন্যূনতম ৫০ জন এবং জাতীয়ভিত্তিক ইউনিয়নের জন্য ন্যূনতম ৪০০ জন শ্রমিকের সম্মতির সুপারিশ করে কমিশন।
তবে গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আইনের যে খসড়া অনুমোদন পেয়েছে, তাতে ন্যূনতম শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে ২০ জন করা হয়েছে দাবি করে মাহমুদ হাসান খান বলেন, “উপদেষ্টা পরিষদের সভায় একতরফাভাবে সেটি পরিবর্তন করে ২০-৩০০ শ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ধাপ করা হয়েছে ৫টি।
“এ সিদ্ধান্ত বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ মাত্র ২০ জন শ্রমিক দিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠন করা হলে কারখানাগুলোতে এমন ব্যক্তিরা ট্রেড ইউনিয়ন করবেন, যারা ওই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।
“এটি অন্তঃদ্বন্দ্ব ও শিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে ও উৎপাদন ব্যাহত করবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হবেন।”
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ভারতে ১০ শতাংশ বা ন্যূনতম ১০০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন করা যায়। পাকিস্তানে ট্রেড ইউনিয়ন করতে সম্মতি লাগে ২০ শতাংশ শ্রমিকের।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান আরও বলেন, “এটা স্পষ্ট যে, আমাদের প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০ জন শ্রমিকের ভিত্তিতে ইউনিয়ন গঠন দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল ও অস্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা নেতিবাচক বার্তা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে।”
খসড়া আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞায় ‘কর্মচারী/কর্মকর্তা’ থাকায় বিজিএমইএর আপত্তি রয়েছে তিনি বলেন, তাতে করে শ্রমিক না হয়েও কর্মকর্তারা শ্রমিকের দাবি আদায় করবে।
“এর ফলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্তর ও শ্রমিক স্তরের মধ্যে বিভাজন ভেঙে যাবে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, দায়িত্ব বণ্টনে বিভ্রান্তি তৈরি হবে এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে।”
শ্রম আইন সংস্কার, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনসহ পোশাক খাত নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চার মাস ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাক্ষাৎ পাননি বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
তিনি বলেন, “কারও সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে হলে তার সঙ্গে বসতে হয়। তিনি যদি সময় না দেন তাহলে কীভাবে নেগোসিয়েশন করব? আমরা বারবার সময় চেয়েও সময় পাইনি।”
বিজিএমএই সভাপতি বলেন, “আমরা গত চার মাস ধরে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ চেয়েও পাইনি। অথচ স্টারলিংকের কোম্পানি স্পেসএক্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট এলে তার সঙ্গে উনি দেখা করেন। যে কোম্পানি ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। অথচ তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) ৪০ বিলিয়ন ডলারের খাতের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করেন না।”
শ্রমিকের সংজ্ঞা আগের মতোই রাখার দাবি জানিয়ে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “সংস্কার কমিশনের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শ্রমিক অর্থ শিক্ষাধীনসহ কোনও ব্যক্তি- তাহার চাকুরির শর্তাবলি প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন, যিনি কোনও প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোনও ঠিকাদার যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, ইহার মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে কোনও দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক-কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা করণিক কাজে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তি; তবে ২(৪৯) (খ) নিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতীত সকল ব্যক্তি ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।
“অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর তা হয়- শ্রমিক অর্থ শিক্ষাধীনসহ কোনও ব্যক্তি, তাহার চাকুরির শর্তাবলি প্রকাশ্য বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন, যিনি কোনও প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোনও ঠিকাদার, যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, ইহার মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে কোনও দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা করণিক কাজে নিযুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারী হিসাবে কোনও ব্যক্তি যে নামেই অভিহিত হউক না কেন, তবে ২(৪৯) (খ) নিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতীত সকল ব্যক্তি ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ব্যবসায়ীদের চেয়ে বিদেশিদের কথায় বেশি গুরুত্ব দেয় অভিযোগ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সরকারকে জানাতে চেয়েও বারবার ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর মুনাফায় রয়েছে। প্রতিবছর এই বন্দরে ভালো মুনাফা হচ্ছে। সর্বশেষ বছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে এই বন্দর। তারপরও সরকার বিভিন্ন পণ্য সেবার মাশুল একলাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ৫-১০ শতাংশ বাড়ানো যেত, কিন্তু একলাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোনও পক্ষের কাছে বন্দর ছেড়ে দেওয়ায় পরিচালন ব্যয় যদি না কমে, তাহলে সেটি করায় আমাদের স্বার্থ কী? বিদেশি একটি পক্ষকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, এতে খরচ তো কমার কথা। উল্টো মাশুল বাড়ানো হচ্ছে। এটি তো হওয়ার কথা নয়।”
চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চলতি মাসেই বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য ১৯৮০ সাল থেকে চলে আসা মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চট্রগ্রাম বন্দরের মাশুল ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি হচ্ছে দাবি করে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “আমরা বলেছি, “আগে কনটেইইনার ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানো হোক। আমরা উপকারটি আগে পাই, তারপরে চার্জ বাড়ানো যেতে পারে। একসঙ্গে না বাড়িয়ে ধারবাহিকভাবে ১০ শতাংশ হারে বাড়ানো যেতে পারে।”
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর সেবা ফি নেওয়া হয় ডলারে। ১৯৮৬-৮৭ অর্থ বছরে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ২৯ দশমিক ৮৯ টাকা। বর্তমানে তা ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় গত ৪০ বছর ধরে টাকার অঙ্কে তা ৩০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।”
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, “প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে টিকফা, এফটিএ এর মতো কয়েকটি চুক্তি করতে হবে। এগুলো করা হোক, নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। এজন্য তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি করছি।”
গত এক বছরে ২৫৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “নানা কারণে তা বন্ধ হয়েছে। এটি চলমান প্রসেস, এটি হয়। কারখানাওয়াইজ বিশ্লেষণ করে বলা যাবে, কারণগুলো কী।”



