ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় বছর পর হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবারের এই নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। কোনও ধরনের গুজবে কান না দিয়ে নির্বিঘ্নে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।
ডাকসুতে এবার ২৮টি পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ৪৭১ জন। আর ১৮টি হল সংসদে নির্বাচন হবে ১৩টি করে পদে। হল সংসদের ২৩৪টি পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এবার ভোটারদের ৪১টি ভোট দিতে হবে।
ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে লড়ছেন ৪৫ জন প্রার্থী, তাদের মধ্যে ৫ জন নারী। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৯ জন, আর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে আছেন ২৫ জন প্রার্থী।
সদস্য পদে মোট ২১৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ২৩ জন।
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন কোনও ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য নেই। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য হলগুলোর আসন বণ্টনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকটা।
এমন প্রেক্ষাপটে এবারের ডাকসু ভোটে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে অন্তত ১০টি প্যানেল অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন প্রার্থীদের আরেকটি অংশ। রবিবার আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে প্রার্থীদের। ভিন্ন ভিন্ন ইশতেহার আর প্রচারণায় আলোচনায় এসেছেন অনেক প্রার্থী।
মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আটটি কেন্দ্রে ডাকসু ও হল সংসদের ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪। এর মধ্যে ১৩টি ছাত্র হলে ভোটার সংখ্যা ২০ হাজার ৯১৫ এবং পাঁচটি ছাত্রী হলে ১৮ হাজার ৯৫৯।

অন্যবারের তুলনায় এবার ডাকসুতে ব্যালটের আকার বেড়েছে। এবার ডাকসুতে থাকছে পাঁচ পৃষ্ঠার ব্যালট। আর হল সংসদের থাকছে এক পৃষ্ঠার ব্যালট। এ ভোট দিতে হবে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিটে।
গত ২৬ আগস্ট শুরু হয় এই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর প্রচার চলেছে ১৩ দিন। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ডাকসু ভোটে স্থগিতাদেশ এলে প্রচারে কয়েক ঘণ্টার বিঘ্ন ঘটে। প্রচারের এই সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বড় কোনও অভিযোগ ওঠেনি।
নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থীরা। তারা আরও বলেছেন, সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন। ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচনকে ঘিরে সৌহার্দ্য–সম্প্রীতির এমন পরিবেশ ভোটগ্রহণ থেকে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত বজায় থাকুক, এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
কার সঙ্গে কার লড়াই
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সংগঠনগুলোর অনুপস্থিতিতে এবার ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে তাদের বিরোধীদের মধ্যে; যারা ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকার পতন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় ছিল।
এবারের নির্বাচনে রয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস), সাতটি বাম ছাত্র সংগঠনের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, জুলাই আন্দোলনের নেত্রী উমামা ফাতেমার ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’, ছাত্রশিবির, তিন বাম সংগঠনের ‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ অন্তত ১০টি প্যানেল।
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় প্যানেলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ে ওই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে নিয়েছে। এই নতুন বাস্তবতা মাথায় রেখে জ্যেষ্ঠদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের প্রধান তিন পদ- ভিপি, জিএস ও এজিএস প্রার্থী করেছে ছাত্রদলও। জুলাই আন্দোলনে তাদের সক্রিয় ভূমিকাও বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।
ভিপি পদে মনোনীত আবিদুল ইসলাম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জিএস পদে শেখ তানভীর বারী হামিম সম্প্রতি ঘোষিত কবি জসীম উদ্দীন হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আর এজিএস পদের তানভীর আল হাদী মায়েদ বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক।
জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকায় থাকাদের প্রতিষ্ঠিত বাগছাসের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের এবং এজিএস প্রার্থী আবু বাকের মজমুদার ওই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। এই প্যানেলের এজিএস প্রার্থী আশরেফা খাতুনও জুলাই আন্দোলন সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন। এখন তিনি বাগছাসের মুখপাত্র।
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে বিভক্তির জেরে বাগছাস থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন অনেকে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জিএস পদে ভোটে নেমে পদ খুইয়েছেন এনসিপি নেতা মাহিন সরকার। পরে বাগছাসের প্রার্থী বাকেরকে সমর্থন দিয়ে মাহিন ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ালেও বিভিন্ন পদে এখনও স্বতন্ত্র হিসেবে রয়েছেন বেশ কয়েকজন।
সাতটি বাম ছাত্র সংগঠন মনোনীত ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ তাদের ভিপি প্রার্থী করেছে শেখ তাসনীম্ আফরোজ ইমিকে; জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই নেত্রী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে শামসুন নাহার হলের ভিপি ছিলেন।
প্রতিরোধ পর্ষদ তাদের জিএস প্রার্থী করেছে ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসুকে। আর এজিএস পদে প্রার্থী জাবির আহমেদ জুবেল বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। জুলাই আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্দোলনে তাদের ভূমিকার কথা আলোচনায় আছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের থেকে বাছাই করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে প্যানেল গড়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা। একসময় ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিবও ছিলেন তিনি। প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এ শিক্ষার্থীর প্যানেলে ২৮ পদেই প্রার্থী রয়েছে।

উমামার প্যানেলে জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি। ২০১৯ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মাস্টার দা সূর্যসেন হলের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকতার সূত্রে ক্যাম্পাসে পরিচিতির পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন আল সাদী ভূঁইয়া। জুলাইয়ে সরকার পতন আন্দোলনের আগে কোটা পুনর্বহাল করে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে যে দুই ছাত্র আপিল করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন তিনি। উমামার প্যানেলের এজিএস প্রার্থী জাহেদ আহমদ পাঠচক্রের প্ল্যাটফর্ম ‘গুরুভার আড্ডা’র সংগঠক।
জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকায় থাকা আবু সাদিক কায়েম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি, তা জানা ছিল না আন্দোলনের সংগঠকদের অনেকের কাছেও। পরে তার পরিচয় প্রকাশ্যে এলে হতবাক হন অনেকে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক সাদিককে ডাকসুতে ভিপি প্রার্থী করেছে ছাত্রশিবির।
জিএস পদে ছাত্রশিবিরের প্রার্থী এস এম ফরহাদ এখন সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। জসীম উদ্দীন হল ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট ডিবেটিং সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।
গোপনে ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালানো ছাত্রশিবির নেতা ফরহাদের ছাত্রলীগে নাম লেখানোর ঘটনা গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। এক সময় সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট শাখার ছাত্রলীগের সম্পাদক পদধারী হিসেবে তার নামের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরলেও তিনি এটা অস্বীকার করে আসছেন।
ছাত্রশিবির মনোনীত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের এজিএস প্রার্থী মুহাঃ মহিউদ্দীন খান সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক।
ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশ এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল-বাংলাদেশ জাসদ) নিয়ে ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল ১৩ জন প্রার্থী দিতে পেরেছে।
এ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয় বিসিএল-জাসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি। ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক এনামুল হাসান অনয় এ প্যানেলের জিএস এবং ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব অদিতি ইসলাম এজিএস প্রার্থী।
সুন্দর বাচনভঙ্গি ও ভিন্নধর্মী ইশতেহার দিয়ে এবার ভোটের মাঠে আলোচনা তৈরি করেছেন ভিপি পদপ্রার্থী শামীম হোসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী; থাকেন বিজয় একাত্তর হলে। অতীতে ছাত্রলীগ নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দেখা গেছে তাকে।
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ডাকসু ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ এবার ভিপি প্রার্থী করেছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লাকে। জিএস হিসেবে সাবিনা ইয়াসমিনকে এবং এজিএস পদে লড়বেন ছাত্র অধিকারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলামকে প্রার্থী করেছে সংগঠনটি।
মুখে সিগারেট ও অভিনব ইশতেহার দিয়ে আলোচনায় এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান। মাস্টারদা সূর্য সেন হলের এ আবাসিক শিক্ষার্থী এবার ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। ফেইসবুক পোস্ট দিয়ে শুরুতেই বেশ আলোচনা তোলা এই প্রার্থী এখন ভোটের মাঠে কেমন করছেন, তা নিয়ে নানান আলোচনা রয়েছে।
শেষ দিনের প্রচার
ভোটের প্রচারের শেষ দিনে রবিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় শপথ পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছাত্রদলের প্যানেল। সেখানে ডাকসুর ২৮টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছাত্রদলের প্রার্থীরা ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ১৮টি হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সংগঠনটির প্রার্থীরাও। সব মিলিয়ে ছাত্রদলের ২০৫ জন প্রার্থী আটটি বিষয়ে শপথ নেন। শপথ পাঠ করান ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান।

রবিবার দুপুরে হুইলচেয়ারে করে মধুর ক্যান্টিনের সামনে নিজ প্যানেলের সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু। তিনি হাসপাতাল থেকে সরাসরি ক্যাম্পাসে আসেন। বামপন্থী সাতটি ছাত্রসংগঠন সমর্থিত প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা ভোট দিতে এলে এখানে স্বাধীনতাবিরোধীরা একটা পোস্টেও জিতে আসতে পারবে না।”
গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ-সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ রবিবার বিকালে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সেখানে এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের বলেন, যারা খাওয়াচ্ছেন বা টাকা খরচ করছেন, তাদের দেখে শিক্ষার্থীরা যেন প্রভাবিত না হন। তিনি আরও বলেন, “আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশের বিবেক। আপনার ভোট আপনার বিবেক দিয়ে দিন। কে অতীতে আপনার জন্য লড়েছে, কে আপনার সমস্যায় পাশে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে সিদ্ধান্ত নিন।”
ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের প্রার্থীরা রবিবার ক্যাম্পাসে প্রচারপত্র বিলি করেন। রাত ১০টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। সেখানে এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ বলেন, সব দল–মতের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তারা স্বপ্নের ক্যাম্পাস গড়তে চান।
অন্যদিকে উমামা ফাতেমার নেতৃত্বাধীন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলের প্রার্থীরাও রবিবার সকাল থেকে প্রচার চালিয়েছেন। আর প্রচারের শেষ দিনে ক্যাম্পাসে মিছিল করেছে বামপন্থী তিনটি ছাত্রসংগঠন সমর্থিত প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’। মিছিল করেছেন আরও একটি প্যানেলের প্রার্থীরা।
প্রচারের শেষ দিন রবিবার বিকালে কলাভবনের সামনে ঐতিহাসিক বটতলায় ‘ডাকসু প্রার্থীদের ভাবনা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তির লড়াই’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যত বড় বড় অর্জন সেটা পানি পান করিয়ে, লাইব্রেরিতে বই দিয়ে বা ডাইনিংয়ের খাবারের মান উন্নত করে আসেনি। এসেছে সমাজের মুক্তির আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।
একই অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্রসংগঠন অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেছে, শিক্ষার্থীরা তাদের গ্রহণ করেনি।
ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি
ডাকসু নির্বাচনে জিতলে শিক্ষার্থীদের জন্য কী কী করবে, তা ইশতেহার আকারে প্রকাশ করেছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও স্বতন্ত্র প্যানেলগুলো। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া ব্যক্তিরাও আলাদাভাবে ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। এসব ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম সংস্কৃতির স্থায়ী অবসানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাদ্য ও পরিবহন সমস্যার সমাধান, রেজিস্ট্রার ভবনে ভোগান্তির অবসানের জন্য ডিজিটালাইজেশন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রার্থীরা।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ১০ দফা ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এর প্রথম দফায় শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক, আনন্দময় ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দমন-পীড়নের মতো ঘৃণিত চর্চা বন্ধ করে ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ছাত্রদল। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে কাজ করার কথাও বলেছে তারা।
শিবিরের প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট ৩৬ দফা ইশতেহার দিয়েছে। তাদের প্রথম দফা হলো ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবছর নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করা। তাদের দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি—ক্যাম্পাসকে ফ্যাসিবাদের দোসরমুক্ত করা। শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করার কথাও বলেছে তারা।
আট দফার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ–সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে প্রথম অগ্রাধিকারে রেখেছে তারা। এ ছাড়া আবাসিক হলে গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি চিরতরে মুছে ফেলার অঙ্গীকার করেছে তারা। নারীদের জন্য বিশেষ সাইবার নিরাপত্তা সেল গঠন ও আইনি সহায়তা দেওয়া, ‘ওয়ান কার্ড অল সার্ভিস’-এর মাধ্যমে পাঠাগারসুবিধা, স্বাস্থ্য ও পরিবহনসেবাসহ বেশ কিছু বিষয় তাদের ইশতেহারে রয়েছে।
১১ দফা ইশতেহার দিয়েছে উমামা ফাতেমার ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল। শতভাগ আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যায্য বেতনে পার্টটাইম (খণ্ডকালীন) চাকরির সুযোগ তৈরি করা এবং নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এই প্যানেল।
বামপন্থী সাত সংগঠনের প্রতিরোধ পর্ষদ ১৮ দফা ইশতেহার দিয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণায় অগ্রাধিকার, সব হলে সন্ত্রাস-দখলদারি বন্ধ করা, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, হলগুলোতে ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্যানটিনের পরিবর্তে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ক্যাফেটেরিয়া চালু করার কথা বলেছে তারা।
ভোটগণনা সরাসরি দেখানো হবে : নির্বাচন কমিশন
এই নির্বাচন স্বচ্ছ করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণের আগে সাংবাদিকদের সামনে ফাঁকা ব্যালট বাক্স সিলগালা করা হবে। পরে ভোটকেন্দ্রের সামনে ভোট গণনা ‘সরাসরি’ এলইডি স্ক্রিনে দেখানো হবে।
ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।
অন্য একটি বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন বলেছে, ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা ব্যাগ, মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ, যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, পানির বোতল ও তরল কোনো পদার্থ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না।

নিরাপত্তা নিয়ে কোনও আশঙ্কা নেই : ডিএমপি কমিশনার
ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং কোনও আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
সোমবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) স্থাপিত ডিএমপির অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বাইরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
ডাকসু নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে, নিরাপত্তার ভেতরে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি।
“আমরা আশা করতেছি নিরাপত্তার কোনও আশঙ্কা নেই। গত সাতদিন ধরে নিরাপত্তা ভালো ছিল এবং আগামীকালও ভালো থাকবে। ১০ তারিখেও ভালো থাকবে।” বলেন ডিএমপি কমিশনার।
কোনও কারণে কেউ যেন নিজের হাতে আইন তুলে না নেন, সে বিষয়ে আহ্বান জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশের জন্য আটটি চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
রবিবার রাত ৮টা থেকে ১১ তারিখ দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
ডাকসু নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসে না : সেনাবাহিনী
ডাকসু নির্বাচনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের গুজব ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ এসেছে।
ডাকসু ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আগের দিন সোমবার সেনাবাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের কোনও প্রশ্নই আসে না।”
এর আগেও সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের সম্পৃক্ত না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করেছিল বলে এবারের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময় থেকেই বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে রয়েছে প্রতিরক্ষা বাহিনী।
এই প্রেক্ষাপটে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে সেনা মোতায়েন চেয়েছিল ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে জানানো হয়, ছাত্র সংসদের নির্বাচনে সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত হচ্ছে না।
এরপরও সেনাবাহিনীকে নিয়ে অপপ্রচার চলার বিষয়টি তুলে ধরে সোমবারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “তারপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্রমাগত মিথ্যা ও ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অপচেষ্টা মাত্র।”
ডাকসুসহ বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়ে তা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যও উদাহরণ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।
“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আশা করে, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিতব্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন যেন সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে।”
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা এরই মধ্যে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই নির্বাচনে সেনাবাহিনীও মোতায়েন থাকবে।



