প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে বিমানবন্দরে হেনস্থার শিকার হলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা আখতার হোসেন।
সোমবার বিকালে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে একদল ব্যক্তিকে এই কাণ্ড ঘটাতে দেখা গেছে সোশাল মিডিয়ায় আসা বিভিন্ন ভিডিওতে।
দেশে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রবাসী নেতা-কর্মীরা সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচি ডেকে জড়ো হয়েছিল।
গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. ইউনূস এনিয়ে দ্বিতীয়বার সরকার প্রধান হিসাবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে গেলেন।
এবার তিনি সফরসঙ্গী করেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন নেতাকে।
এনসিপির প্রতিনিধি হিসাবে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হন দলটির সদস্য সচিব, ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার এবং দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনিম জারা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও রয়েছেন এই দলে।

নিউ ইয়র্ক পৌঁছনোর পর ডিপ্লোমেটিক পাসপোর্টধারী ড. ইউনূস অন্য পথ দিয়ে বের হলেও সাধারণ পাসপোর্টধারী ফখরুল, আখতারসহ অন্যরা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় পড়েন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তোপের মুখে।
তাসনিম জারা এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আজ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর আমাদের দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর হামলা হয়েছে। তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছে, গালিগালাজ করা হয়েছে।”
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মির্জা ফখরুল, আখতার ও তাসনিম জারা বিমানবন্দর টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পরপরই তাদের ঘিরে ধরে গালাগালি করতে শুরু করে একদল ব্যক্তি। তাদের কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণও করছিল।
একজন ‘ডিম মারছে রে, পচা মারছে’ বলে চেঁচিয়ে উঠছিলেন। সাদা পাঞ্জাবির ওপর নীল রঙের কোট পরা আখতারের পিঠে দেখা যায় ভেঙে পড়া ডিমের ছোপ। তবে এরপরও তিনি অবিচলভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
ফখরুল ও তাসনিম জারার পেছনে ছিলেন আখতার। কয়েকজন তাদের ঘিরে সামনের দিকে নিয়ে গাড়িতে তোলে।
ওই সময় হামলাকারীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিল। আবার ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেও স্লোগান তুলছিল।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কালো রঙের হাফ শার্ট, নীল জিন্সের প্যান্ট, মাথায় কালো রঙের টুপি পরা এক ব্যক্তি তা হাতে ধরা একটি ডিম দেখানোর পর তা আখতারের পিঠের দিকে ছুড়ে মারেন।
ওই ব্যক্তিকে পরে নিউ ইয়র্ক পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলে সোশাল মিডিয়ায় আসা কিছু ভিডিওতে দাবি করা হয়।

প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীরা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে উঠেছেন। সেখানেও বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।
এই হামলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তাসনিম জারা ফেইসবুকে লিখেছেন, “এটি ব্যক্তি আখতার হোসেনের ওপর আক্রমণ নয়, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে করা হয়েছে। কারণ তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সেই দলকে, যে দল ফ্যাসিবাদের কাঠামো ভেঙে দিতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
“এই হামলা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিল যে পরাজিত শক্তির ভয় ও হতাশা কতটা গভীর। আমি নিশ্চিত, এই আক্রমণ আখতার হোসেনকে এক বিন্দুও দুর্বল করবে না, তার দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দেবে।”
আখতার নিজেও এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এই প্রজন্ম হাসিনার ছোড়া বুলেটে ভয় পায় নাই৷ ওদেরই ছোড়া ডিমে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
দেশে থাকা এনসিপি নেতারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দলটির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “হাসিনার পুলিশ লীগ, কোর্ট-কাচারিও আখতারকে দমন করতে পারেনি। আর এসব উচ্ছিষ্ট, জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত দালালরা বিদেশে বসে প্রতিবাদের প্রতীক আখতারকে দমন করতে পারবে?
“আওয়ামী দালালদের পক্ষে টকশো আর যুগলবন্দী কলামে যারা ‘সম্মতি’ উৎপাদন করে, তাদেরও কেন প্রত্যাখ্যান করা উচিৎ— এটা না বুঝলে, কিছুদিন পর এই আক্রমণের শিকার হতে আপনি প্রস্তুত থাকুন।”
আখতারের ওপর হামলার প্রতিবাদে এনসিপি বিকালে ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কে আখতারসহ রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তায় গাফিলতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনাও করছে এনসিপির নেতারা।
ড. ইউনূসের সফরসঙ্গী হওয়ার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তাননিম জারা এর আগে বলেছিলেন, “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছি।
“আমাদের দলের পক্ষ থেকে সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও আমি সফরে অংশ নিচ্ছি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চলমান প্রচেষ্টা ও সবার অংশগ্রহণের ইতিবাচক উদাহরণ বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করব।”



