Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কাঠামো এবং জলবায়ু-কূটনীতি কেন জরুরি

পাভেল পার্থ । প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

ঘূর্ণিঝড় রেমালের পর এবারও প্রমাণিত হতে চলল আপদবিপদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে আমরা তৎপর, বহুমুখী ও সংবেদনশীল নই। এখনও আমাদের চোখের সামনে প্রথম ভাসে মানুষের মৃতদেহ, মাছের খামার, কৃষিজমি ও লণ্ডভণ্ড ঘরবাড়ি। অথচ ১৯টি উপকূলীয় জেলার জনজীবনকে প্রতিবার যে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচায় তার কথা কোনওবার আমাদের মাথায় থাকে না। এমনকি ঘূর্ণিঝড়ের আগে ও পরে মানুষের জন্যই কেবল সব প্রস্তুতি, বাজেট ও তৎপরতা। কিন্তু বারবার যে নিজে মরে আমাদের রক্ষা করে তার জীবন সুরক্ষার জন্য আমাদের কোনও দুর্যোগ-প্রস্তুতি নাই। বলছি দুনিয়ার সর্ববৃহৎ বাদাবন সুন্দরবনের কথা।

রেমালের আঘাতের পর দেশজুড়ে ১৬জন মানুষের প্রাণহানি, ২ লাখ ঘর বিধস্ত, বনবিভাগের প্রায় সাত কোটি টাকার অবকাঠামোগত ক্ষতিসহ এবারই প্রথম গণমাধ্যমজুড়ে প্রকাশিত হচ্ছে সুন্দরবেনর নিদারুণ ক্ষত। ১২৭টি হরিণ ও ৫টি বুনো শূকরের লাশ পাওয়া গেছে। কটকা অভয়ারণ্যের জামতলায় প্রায় ৩৮, কচিখালীর সুপতি খাল থেকে ১০টি ও অন্যান্য চর থেকে আরও ৩১টি হরিণের লাশ উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। লাশগুলো কটকা অভয়ারণ্য এলাকায় ‘মাটি চাপা (মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রাণি মারা গেলে তাকে কী পুঁতে ফেলা হয় না মাটি চাপা কিংবা সেই সৎকারের নাম আমার জানা নেই বলে এই শব্দটি ব্যবহার করেছি, একইসাথে জানি এই ধরনের প্রবল দৃষ্টিভঙ্গিই মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নকে চাঙ্গা রাখে)’।

এবারই প্রথম গণমাধ্যমজুড়ে প্রকাশিত হচ্ছে সুন্দরবেনর নিদারুণ ক্ষত। ১২৭টি হরিণ ও ৫টি বুনো শূকরের লাশ পাওয়া গেছে।

বুনোপ্রাণির নিজের বনে লাশ সৎকার নিয়ে নানামুখী তর্ক আছে। কারণ একটি গাছ বা প্রাণি বনের ভেতর মারা গেলে সেখানেই তার দেহ সেই বাস্তুতন্ত্রে মিশে যায় বা অন্যপ্রাণির খাদ্য হয়। কিন্তু রেমালের কারণে একক সময়ে বহুপ্রাণির মৃত্যু সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃংখলের জন্য কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এসব মৃতদেহ স্থানীয় বাস্ততেন্ত্র প্রতিবেশগত বিশৃংখলা তৈরি করতে পারে। একইসাথে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় প্রায় ১৩ হাজার গবাদি প্রাণিসম্পদের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারির সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। এর বাইরে গ্রামে গঞ্জে হাটবাজারে ঘুরে বেড়ানো পথকুকুর ও বিড়ালের কী হয়েছে এখনও এই খতিয়ান আমাদের হাতে নাই।

আবারও প্রমাণিত হয়েছে সর্বঅবহেলিত সুন্দরবনই এবারও রেমালের সাথে দুই দিন লড়েছে। প্রায় দুই দিন লবণপানিতে দমবন্ধ হয়ে ডুবেছিল সুন্দরবন। ২০০৭ সনে সিডরের পর থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সুন্দরবনের ভূমিকা ও অবদানকে আমরা কিছুটা আলোচনায় আনতে পেরেছি। কিন্তু এখনও রাষ্ট্রীয় কোনও সম্মননা বা নথি দলিলের মাধ্যমে সুন্দরবনের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। চলতি লেখাটি ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে সংঘটিত সুন্দরবনের সামগ্রিক ইকোনমিক ও নন-ইকোনমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের দাবি করছে। পাশাপাশি এই ক্ষত কাটিয়ে ওঠতে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সংবেদনশীল তৎপরতা ও বাজেট বরাদ্দের দাবি জানাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়সহ সকল আপদবিপদে সুন্দরবনের জানমালের সুরক্ষাকে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনায় যুক্ত করার দাবি জানিয়ে আলাপটি শুরু হচ্ছে।

সুন্দরবনের অবদান এখনও অস্বীকৃত
আমাদের কি ১৯৯১ সনের প্রলয়ংকরী ঘর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কথা মনে আছে? মহেশখালীর মূলভূখণ্ডকে সেসময় নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছিল সোনাদিয়া ম্যানগ্রোভ বন। কিন্তু মানুষ বনের সেই অবদানকে মনে রাখেনি। ২০০২ সালের জুন মাসে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সোনাদিয়া বন পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে তৈরি করে বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের। যদিও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই এলাকাকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। কক্সবাজারের চকরিয়া প্যারাবনকে আমরা আস্ত রাখিনি। মুখে মুখে আওড়ালেও এক একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর আমাদের আর সুন্দরবনের অবদানের কথা মনে থাকে না। ঘর্ণিঝড় থেকে জীবন জনপদ সুরক্ষায় সুরন্দরবনের অবদানের কথা সিডরের আগে কাউকে বলতে শুনিনি। সিডরের পর সুন্দরবন থেকে ফিরে একটা লেখা লিখেছিলাম। ‘বীর সুন্দরবন: জীবন দিয়ে বাঁচালো স্বদেশ’। ২০০৭ সনের ২০ নভেম্বর দৈনিক সমকালে লেখাটি ছাপা হয়। এরপর আপদবিপদ ও  ঝুঁকি মোকাবেলায় অরণ্যের ভূমিকা আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি। কেবল বন নয়, জলাভূমি কি কৃষিজমিনসহ সকল বাস্তসংস্থানই আমাদের ঝুঁকিসমূহ সামাল দিয়ে চলে জীবন দিয়ে। সিডরের ১৩ বছর পর সেই একই ফরিয়াদ আবারও লিখেছিলাম ২০২০ সনে, ‘সুন্দরবন আবারো বাঁচালো স্বদেশ’। সুন্দরবনের এই ন্যারেটিভটি গণপরিসরে বেশ প্রচলিত হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় বিভাগ ও বিদ্যায়তনেও সুন্দরবনের এই অবদান নিয়ে এখন গুরুত্ব দিয়ে আলাপ হয়। কেবল সিডর বা রেমাল নয়, আইলা কি মহাসেন, ফণী কি বুলবুলেও সুন্দরবনই ছিল উপকূলের সুরক্ষাপ্রহরী।

আমরা কি সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশ কি বিশ্ব কল্পনা করতে পারি? তাহলে উপকূলের আরও বিস্তৃত বহু ম্যানগ্রোভ বন কেন আমরা বিনাশ করলাম? প্রজাতি হিসেবে মানুষ এমনই স্মৃতিবিমুখ যে, বাদাবনের এই বীরগাথা কিছুদিনের ভেতর বেমালুম ভুলে যায়। একের পর এক জাহাজ ডুবে তেল কি রাসায়নিক ছড়িয়ে যায় বনে সুন্দরবনে। কোনও বিচার নাই।

আজ আমরা কি এমন কোনও শ্যামনগর, শরণখোলা, কয়রা, দাকোপ, মোংলা চিন্তা করতে পারি যেখানে বাদাবন নেই। আমরা কি সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশ কি বিশ্ব কল্পনা করতে পারি? তাহলে উপকূলের আরও বিস্তৃত বহু ম্যানগ্রোভ বন কেন আমরা বিনাশ করলাম? প্রজাতি হিসেবে মানুষ এমনই স্মৃতিবিমুখ যে, বাদাবনের এই বীরগাথা কিছুদিনের ভেতর বেমালুম ভুলে যায়। একের পর এক জাহাজ ডুবে তেল কি রাসায়নিক ছড়িয়ে যায় বনে সুন্দরবনে। কোনও বিচার নাই।

একের পর এক বিনাশী উন্নয়ন প্রকল্পে দম আটকে আসে বাদাবনের। দিনে দিনে কমতে থাকে বন্যপ্রাণির পরিসংখ্যান। অথচ সুন্দরবনের চারধারে বাড়তে থাকে মানুষের বসতি আর কারখানা। বাঘের শরীর বিক্রি হয়ে যায় বহুজাতিক বাজারে আর বিশ্বসেরা ক্রিকেটাররা হরিণের চামড়ায় বসে বিয়ের কৃত্য সাজান কিংবা বড়লোকদের খাওয়ার জন্য উপকূলের কৃষিজমিতে তৈরি করেন ‘নরম খোলের কাঁকড়া ঘের’।

কোনও রা নেই। কেবল ঘূর্ণিঝড় এলেই আমরা হা করে চেয়ে থাকি রক্তলাগা এই বনের দিকে। রাষ্ট্র সংবিধানের ১৮.ক অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুন্দরবন সুরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। মহামান্য আদালত নদীকে জীবন্ত ব্যক্তিসত্তা ঘোষণা করেছে। প্রতিবছর পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র মানুষকে পদক ও সম্মাননা দেয়। সুন্দরবনের দুযোর্গ মোকাবেলার এই অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। রাষ্ট্র একটি দিনকে সুন্দরবনের জন্য জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে পারে। রাষ্ট্রের এই তৎপরতা নতুন প্রজন্মেকে সুন্দরবনের প্রতি দায়বদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

রাষ্ট্র সংবিধানের ১৮.ক অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সুন্দরবন সুরক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। মহামান্য আদালত নদীকে জীবন্ত ব্যক্তিসত্তা ঘোষণা করেছে। প্রতিবছর পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র মানুষকে পদক ও সম্মাননা দেয়। সুন্দরবনের দুযোর্গ মোকাবেলার এই অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। রাষ্ট্র একটি দিনকে সুন্দরবনের জন্য জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে পারে। রাষ্ট্রের এই তৎপরতা নতুন প্রজন্মেকে সুন্দরবনের প্রতি দায়বদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

লবণপানিতে তলিয়ে থাকার দুঃসহ অভিজ্ঞতা
বাদাবন দিনে চারবার রূপ বদলায়। দিনে ২ বার ভাটা ও ২ বার জোয়ার হয়। জোয়ারে লবণপানিতে তলিয়ে যায় বনতলের প্রায় পুরো অংশই, আবার ভাটার সময় জেগে ওঠে কাদাময় বনতল। জোয়ারের পানিতে ভেসে আসা ফল, বীজ আটকে যায় কাদায়। অংকুরিত হয়ে অবিরাম চলে বনের প্রাকৃতিক বিকাশ।

বনবিভাগও গণমাধ্যমে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে দীর্ঘসময় জলোচ্ছ্বাস থাকায়, ১০ ফুট পানির তলায় সুন্দরবন ডুবে থাকায় রেমালের মতো বন্যপ্রাণির এতো ক্ষতি আগে সুন্দরবনে হয়নি।

২০০৯ সনের আইলার সময় জোয়ারের পানি বাঁধ ভেঙে গ্রামে ঢুকে তলিয়ে যায় জীবন ও বসত। জলাবদ্ধ হয় জনপদ। এবার রেমালে একইরকম ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের জীবনে। প্রায় দুই দিন লবণপানিতে তলিয়ে ছিল এই বন। এবার জোয়ারের উচ্চতা বেশি ছিল। বনবিভাগও গণমাধ্যমে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে দীর্ঘসময় জলোচ্ছ্বাস থাকায়, ১০ ফুট পানির তলায় সুন্দরবন ডুবে থাকায় রেমালের মতো বন্যপ্রাণির এতো ক্ষতি আগে সুন্দরবনে হয়নি।

২০০৯ সনের আইলার সময় জোয়ারের পানি বাঁধ ভেঙে গ্রামে ঢুকে তলিয়ে যায় জীবন ও বসত। জলাবদ্ধ হয় জনপদ। এবার রেমালে একইরকম ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের জীবনে। প্রায় দুই দিন লবণপানিতে তলিয়ে ছিল এই বন। এবার জোয়ারের উচ্চতা বেশি ছিল। বনবিভাগও গণমাধ্যমে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে দীর্ঘসময় জলোচ্ছ্বাস থাকায়, ১০ ফুট পানির তলায় সুন্দরবন ডুবে থাকায় রেমালের মতো বন্যপ্রাণির এতো ক্ষতি আগে সুন্দরবনে হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডও (পাউবো) জানাচ্ছে, ২০০৭ সনে সিডরের সময় কেবল জোয়ারের উচ্চতা ছিল ১০-১২ ফুট। এরপরের ঘূর্ণিঝড়ে জোয়ারের উচ্চতা ৯ থেকে ১০ ফুটের ভেতর ছিল। ১৭ বছর পর রেমালের সময় জোয়ারের উচ্চতা সিডরের মতোই ১০ থেকে ১২ ফুট ছিল। সুন্দরবনের জীবনে জলোচ্ছ্বাসের লবণপানিতে এভাবে দীর্ঘসময় তলিয়ে থাকার অভিজ্ঞতাটি সমকালে নতুন। এমন জলোচ্ছ্বাসে ও জলাবদ্ধ লবণপানিতে হরিণের মতো অতি নাজুক প্রাণিরা দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারেনি।

একারণেই হরিণের মৃত্যু ঘটেছে বেশি। একই ঘটনা বুনো শূকরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এছাড়া উদ, বেজি, ব্যাঙ, গুইসাপ ও অন্যান্য সরীসৃপরাও বিপদে আছে। বনতল ও বনের মাঝারি স্তরের পাখিরা খুবই বিপন্ন হয়েছে। কারণ জোয়ারের পানিতে বহু পাখির বাসা ভেসে যাওয়ার কথা। পাখির বাসার ডিম ও ছানা পাখির হয়তো মৃত্যু ঘটেছে। এই সময়টা সুন্দরবনের মধু মওসুম। বহু মৌমাছির চাক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কথা। খলিশা, গোল, গরান, হেন্তালর ঝোপে যেসব চাক আছে বা বনের মাঝারি উচ্চতার গাছের ডালে ও খোঁড়লে যেসব চাক আছে সেসব বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। প্রচুর রানী মাছি মারা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সব মৌমাছিদের চাক ত্যাগ করা হয়তো সম্ভব হয়নি। তুলনামূলকভাবে বানর ও বাঘেরা হয়তো নিজেদেও জীবন বাঁচাতে বেশি তৎপর থাকতে পেরেছে। রিমালের কারেণ সুন্দরবেনর ভেতরে থাকা মিষ্টিপানির পুকুরগুলো লবণপানিতে  তলিয়ে গেছে। মৌমাছি থেকে শুরু করে হরিণ ও বাঘসহ সকল বন্যপ্রাণির তীব্র খাবার পানির সংকট তৈরি হবে। একইসাথে সকল বন্যপ্রাণির বিচরণঅঞ্চল এবং খাদ্যউৎসেও সংকট তৈরি হবে। 

আর্থিক ও অ-আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি
সবসময় ক্ষয়ক্ষতিকে কেবল অর্থনীতির বিচারে মাপা হয়, যা সুন্দরবনের মতো এক ঐতিহাসিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য সঠিক পদ্ধতি ও পন্থা নয়। আগুন লাগলে হিসাব হয় কত ঘণফুট কাঠ পুড়েছে বা কত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলো। কিন্তু সব ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতির বিচারে মাপা যায় না। বিশেষ করে প্রতিবেশগত নানামুখী সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক বিন্যাসগুলো। মৌমাছির চাক তলিয়ে যাওয়া বা মৌপোকাদের মৃত্যু কিংবা পাখির বাসা থেকে ছানা ও ডিম হারিয়ে যাওয়া বা গুইসাপের গর্ত তলিয়ে যাওয়া বা কোনও বনজীবীদের নানা খালে নানাবিধ স্মৃতিবিস্মৃতি এসব কী অর্থনীতির বিচারে কেবল টাকার অংকে হিসাব করা সম্ভব? কত টাকার পাখির ডিম নষ্ট হয়েছে তা কে হিসাব করতে পারবে? তাই সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ইকোনমিক ও নন-ইকোনমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করতে হবে।

সুন্দরবন এলাকায় ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আমরা বন্ধ করতে পারব না। জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলে এর প্রকটতা ও জটিলতা আরও বাড়বে। তাই আগেভাগেই আমাদের জোরালো ব্যবস্থাপনাগত প্রস্তুতি না থাকলে কোনওভাবেই এই প্রাকৃতিক ঢালকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারব না।

সুন্দরবনের মতো এক জটিল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এক জটিল ও দুঃসাধ্য কাজ। কাজটি করার জন্য আমাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সকলস্তর থেকে সহযোগিতা দরকার। রাষ্ট্রীয় পাবলিক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি সমন্বয় করতে পারে। স্থানীয়সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠনদের যুক্ত করা জরুরি। বনের সর্বস্তরের উদ্ভিদ, প্রাণি ও অণুজীবের জীবনে কেমন ক্ষতি হয়েছে তা সামগ্রিকভাবে জানাবোঝা জরুরি।

সুন্দরবনের মতো এক জটিল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এক জটিল ও দুঃসাধ্য কাজ। কাজটি করার জন্য আমাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সকলস্তর থেকে সহযোগিতা দরকার। রাষ্ট্রীয় পাবলিক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি সমন্বয় করতে পারে। স্থানীয়সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠনদের যুক্ত করা জরুরি। বনের সর্বস্তরের উদ্ভিদ, প্রাণি ও অণুজীবের জীবনে কেমন ক্ষতি হয়েছে তা সামগ্রিকভাবে জানাবোঝা জরুরি।

পতঙ্গ, পাখি, উভচর, স্তন্যপায়ী, মাছ, সরীসৃপ থেকে শুরু করে শৈবাল, ছত্রাক, লাইকেন, অণুজীব সবাইকে বিবেচনায় রাখতে হবে। নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ও ধরণ, তাদের বিচরণঅঞ্চল ও ভৌগলিক ভিন্নতা, বয়স সবকিছু বিবেচনায় রাখতে হবে। কারা বেঁচেছে কারা মরেছে এবং এর সম্পর্কিত কারণগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সুন্দরবন এলাকায় ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আমরা বন্ধ করতে পারব না। জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলে এর প্রকটতা ও জটিলতা আরও বাড়বে। তাই আগেভাগেই আমাদের জোরালো ব্যবস্থাপনাগত প্রস্তুতি না থাকলে কোনওভাবেই এই প্রাকৃতিক ঢালকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারব না। আর এই ঢাল না থাকলে বিপদজনক দুঃসহ প্রভাব সামাল দিতে আমরা পারব না। সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো অর্থনীতি, উৎপাদন, রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক সংস্কৃতি কিছুই দুনিয়ার কোথাও এখনও গড়ে ওঠেনি।

বনবিভাগের সূত্রমতে ২০০৭ সনে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর সুন্দরবনে ৪০টি হরিণ, ১টি বাঘ ও ১টি তিমির লাশ পাওয়া যায়। হয়তো তখন বুনো শূকর, বেজি, গুইসাপ বা পাখির মৃত্যু বিবেচনায় আসেনি। ঠিক যেমন এবার রেমালের পর আমরা এখন অব্দি হরিণ আর শূকরের লাশ গুণতে পারছি। আড়ালে থেকে যাচ্ছে শত সহস্র বুনো ক্ষতবিক্ষত শরীর। হয়তো একসময় সবাইকে জানাবোঝার দক্ষতা এবং যোগ্যতা তৈরি হবে আমাদের। সিডরের পর ২০০৯ সালে আইলার সময় ৩টি হরিণ ও ১টি শূকরের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সুন্দরবনের প্রাণি মৃত্যুর তেমন কোনও খতিয়ান নেই। তবে বনজীবীদের সাথে দীর্ঘ আলাপে জানতে পারি প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়। করোনা মহামারীর সময় আবারও ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের ক্ষত নিয়ে কিছু আলাপ তৈরি হয়। ২০২১ সনে ইয়াসের পর ৪টি হরিণের লাশ পাওয়া যায়। এবারই রেমালের পর শতাধিক বন্যপ্রাণির মৃতদেহর দেখা মিলেছে। সিডর ও আমপানে গাছের মৃত্যু ঘটেছিল ব্যাপক কিন্তু রেমালে গাছের ক্ষতি তেমন হয়নি। বনবিভাগ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের প্রায় ১১ বর্গকিলোমিটার গোলপাতা বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সুন্দরবনের জন্য দুর্যোগ প্রস্তুতি
কেবল মানুষ ও কিছু গবাদি প্রাণিসম্পদের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু রেমাল আমাদের সতর্ক করল সুন্দরবনের জন্য আমাদের সক্রিয় দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি দরকার। দ্রুত লবণপানিতে তলিয়ে যাওয়া পুকুর গুলির পানি সেচে ফেলে বৃষ্টির পানি ভরতে হবে। আরও পুকুর খনন করতে হবে। কিছু পুকুর বনতল থেকে ১২ থেকে ১৫  ফুট উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে। সুন্দরবনে ‘বাঘের কিল্লা’ নামে ১২টি উঁচু জায়গা আছে। জোয়ার জলোচ্ছ্বাসের সময় বন্যপ্রাণিরা যাতে সেসব কিল্লায় উঠে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারে। এমন উঁচু কিল্লার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং সকল প্রাণিই যেন নিজ নিজ বিচরণ অঞ্চলে এমন নিরাপদ জায়গা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

কেবল মানুষ ও কিছু গবাদি প্রাণিসম্পদের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু রেমাল আমাদের সতর্ক করল সুন্দরবনের জন্য আমাদের সক্রিয় দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি দরকার।

রেমাল পরবর্তী সময়ে সুন্দরবনের মৌমাছিদের জন্য মিষ্টিপানি ও ফুলের রসের সংকট দেখা দিবে। বহু মৌমাছি বন ও নদী পেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসবে জীবন বাঁচাতে। সুন্দরবন এলাকার বহুগ্রামে এই সময়ে মৌবাক্স নিয়ে বহু মৌচাষী অবস্থান করছেন। এই সময়টাতে মৌচাষীদের সুন্দরবনের প্রান্তসীমানায় মৌবাক্স না বসানোর জন্য অনুরোধ করা যায়। কারণ মৌপতঙ্গ কমে গেলে পরাগায়ণ ও বীজ বিস্তারে প্রভাব পড়বে। পাখিসহ বন্যপ্রাণিদের জীবনে জলাবদ্ধতা ও জোয়ার এক মানসিক ট্রমাও তৈরি করেছে। রেমালের আগে সুন্দরবনকে এ বছর তীব্র দাবদাহ সামাল দিতে হয়েছে। মৌমাছিসহ বন্যপ্রাণিদের ভেতর দাবদাহের পর আবার এই জলোচ্ছ্বাস এক নিদারুণ যন্ত্রণা। এর উপর আবার পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের একটা বড় অংশ মানুষের লাগানো আগুনে এবারও পুড়েছে।

এই সময়েও সুন্দরবনের গাছের অংকুরোদগম ও কিছু প্রাণির প্রজনন হয়। প্রজনন ঋতুর আগে তীব্র দাবদাহ ও ঘূর্ণিঝড় ও লবণ পানিতে তলিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা এবার বন্যপ্রাণির প্রজননে ব্যঘাত তৈরি করবে। কী পরিমাণে নারী ও পুরুষ বন্যপ্রাণি মারা গেছে তা আমরা জানিনা। এই সংকট কাটাতে কিছুদিন সুন্দরবনে বাণিজ্যিক নৌযান ও পর্যটনকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। যদিও বনবিভাগ আগামী তিন মাস সুন্দরবনে সকল ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।

সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে যুক্ত করতে হবে। সর্বশেষ দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে গঠিত বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। সুন্দরবনের দুযোর্গ মোকাবেলায় বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল একটা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আর বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রীয় জলবায়ু-কূটনীতি জোরদার করতে হবে এবং একইসাথে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সুন্দরনের সামগ্রিক ইকোনমিক ও নন-ইকোনমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এবারও গোলপাতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ কারণে সিডরের সময়ের মতো গোলপাতা আহরণ নিষিদ্ধ করা যাবে না। কারণ বনজীবীদের লোকায়ত গোলপাতা আহরণবিদ্যা অনুযায়ী গোলপাতা আহরণ না হলে এগুলি বিনষ্ট হবে। তাই বনজীবীদের জন্য বনে প্রবেশাধিকার শিথিল রাখার বিষয়টি নিয়ে আলাপ হতে পারে। কারণ বনজীবীরা সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্রের অংশ। যদি বনজীবীদের প্রবেশাধিকার নিষেধ হয় তবে অবশ্যই তাদের বাস্ততন্ত্রভিত্তিক কোনও আয়রোজগারের উপায় কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের জন্য এসময় কোনও ভাতা বা প্রণোদণার ব্যবস্থা করতে হবে। মৌয়ালী, বাওয়ালী, জেলে, বাগদী সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবনজীবিকা এই বনের ওপরই নির্ভরশীল। তাই নন-ইকোনমিক ক্ষয়ক্ষতির এক বিশাল অংশ জড়িয়ে আছে বনজীবীদের জীবনসংস্কৃতির সাথে।

সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ জাতীয় ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে যুক্ত করতে হবে। সর্বশেষ দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে গঠিত বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। সুন্দরবনের দুযোর্গ মোকাবেলায় বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল একটা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। আর বৈশ্বিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিল আদায়ে রাষ্ট্রীয় জলবায়ু-কূটনীতি জোরদার করতে হবে এবং একইসাথে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সুন্দরনের সামগ্রিক ইকোনমিক ও নন-ইকোনমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। লোকায়ত জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমন্বয়ে এই কাঠামো সুন্দরবনের মতো জটিল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সচেষ্ট হতে পারে।

লেখক: প্রাণ ও প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষক ও লেখক।
ইমেইল: animistbangla@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত