বাইসাইকেল রপ্তানি করে আয় বাড়তে বাড়তে ২০২১-২২ সালে যখন ১৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার এসেছিল, তখন তা নতুন পণ্য হিসাবে বেশ আশা জাগিয়ে তুলেছিল। দেশের বাইসাইকেল নির্মাতারা বিনিয়োগ বাড়িয়েছিলেন।
কিন্তু পরের বছরেই রপ্তানিতে পতন সেই আশা দিয়েছিল ভেঙে। ২০২২-২৩ সালে রপ্তানি আয় নেমে আসে ১৪ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ডলারে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সাইকেল রপ্তানি আগের বছরের অর্ধেকে নেমে আসে আয় (৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার)।
গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে অবশ্য কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়; ১১ কোটি ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা এসেছিল সাইকেল রপ্তানি থেকে। আগের আর্থিক বছরের চেয়ে বেশি এসেছিল ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ।
তিন বছর পর পরিবেশবান্ধব এই দ্বিচক্র যান রপ্তানিতে ফের চমক দেখাচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে (প্রথম প্রান্তিক, জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৩ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার ডলারের সাইকেল রপ্তানি হয়েছে।
এই অঙ্ক গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬৩ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের এই তিন মাসে আয় হয়েছিল ২ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
সবশেষ সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি আয় প্রায় ১০০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে এই সেপ্টেম্বরে প্রায় দ্বিগুণ বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। এই মাসে সাইকেল রপ্তানি থেকে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার আয় হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই অঙ্ক ছিল ৭৫ লাখ ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে এই খাত থেকে আয় কমেছিল ৪২ শতাংশ। তার আগের বছরে (২০২২-২৩) কমেছিল ১৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বাইসাইকেল রপ্তানি করে এলেও সর্বাধিক আয় এসেছিল ২০২১-২২ অর্থ বছরেই। তখনকার বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২০ টাকা) হিসাবে টাকার অঙ্কে তা ছিল ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ওই অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ আগের অর্থ বছরের চেয়ে রপ্তানি আয় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল।
তার আগে ২০২০-২১ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল আরও বেশি ৫৮ শতাংশ; ওই অর্থ বছরে ১৩ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার আয় হয়েছিল। এর আগের অর্থ বছরে (২০১৯-২০) আয়ের অঙ্ক ছিল ৮ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
বাড়তে থাকার পর ২০২২-২৩ অর্থ বছর থেকে কমতে থাকার জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করেছিলেন রপ্তানিকারকরা। কারণ বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানির মূল বাজার ইউরোপ। যুদ্ধের কারণে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি বেশ চাপের মুখে পড়েছিল; মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল; তার প্রভাব পড়েছিল সাইকেল রপ্তানিতে।
বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান এখন বাইসাইকেল রপ্তানি করে। একটি হচ্ছে- মেঘনা গ্রুপ। আরেকটি প্রাণ-আরএফএলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
দুটি প্রতিষ্ঠানই গত কয়েক বছরে বাইসাইকেল রপ্তানি বাড়াতে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছে; বাড়িয়েছে বিনিয়োগ।
মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশই রপ্তানি করে মেঘনা গ্রুপ। এই গ্রুপের পরিচালক লুৎফুল বারী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বেশ ভালোই চলছিল। প্রতি বছরই রপ্তানি বাড়ছিল; আমরা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছিলাম। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সব তছনছ করে দিয়েছিল। রপ্তানি একেবারেই কমে গিয়েছিল। আশার কথা হচ্ছে, সেই ধাক্কা কেটে গেছে। ফের বাড়তে শুরু করেছে রপ্তানি।”
রপ্তানিতে ধাক্কার জন্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করে তিনি বলেন, “আমাদের সাইকেলের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় অর্থনীতি বেশ সংকটের মধ্যে পড়েছিল। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছিল; অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্য কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল সাইকেল রপ্তানিতে।
“এখন সে সংকট কেটে গেছে। মানুষ আগের মতোই সব পণ্য কিনছে। তাই সাইকেল রপ্তানিও বাড়ছে।”

এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই আশা করছেন লুৎফুল বারী। তিনি বলেন, “আমরা প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি। উৎপাদন বাড়িয়েছি। আশা করছি, গত অর্থ বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে ২৫-৩০ শতাংশ বেশি রপ্তানি হবে।”
একই কথা বলেছেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন বিভাগের পরিচালক কামরুজ্জামান কামালও।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “করোনা মহামারীর মধ্যেও বেশ ভালো রপ্তানি করেছিলাম আমরা। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের টালমাটাল অবস্থায় রপ্তানি কমে গিয়েছিল। এখন আগের অবস্থা ফিরে এসেছে।”
রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের বছরে ১০ লাখ বাইসাইকেল তৈরির সক্ষমতা আছে। যার এক-তৃতীয়াংশ ইউরোপে রপ্তানি করা হয়। বাকিটা দেশের বাজারে বিক্রি হয়।
“পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রপ্তানি বাড়াতে আমরা বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়িয়েছি; পাশাপাশি নতুন বাজার খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি,” বলেন কামরুজ্জামান কামাল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যানবিষয়ক সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৃতীয় এবং বিশ্বে অষ্টম বাইসাইকেল রপ্তানিকারক দেশ।
বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া বাইসাইকেলের ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। বাকিটা যায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে। একক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সাইকেলের বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি।
যখন থেকে শুরু
৩০ বছর আগে ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে তাইওয়ানের কোম্পানি আলিতা বাংলাদেশ লিমিটেড স্বল্প পরিসরে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু করে। পরে এই ধারায় যুক্ত হয় মেঘনা গ্রুপ।
ইপিবির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথম দিকে এ খাত থেকে তেমন আয় না হলেও ২০০৮ সাল থেকে বাড়তে শুরু করে রপ্তানি।

রপ্তানিকারকরা জানান, বর্তমানে ফ্রিস্টাইল, মাউন্টেন ট্রেকিং, ফ্লোডিং, চপার, রোড রেসিং, টেন্ডমেড (দুজনে চালাতে হয়) ধরনের বাইসাইকেল রপ্তানি হচ্ছে।
এসব সাইকেল তৈরির জন্য কিছু যন্ত্রাংশ বাংলাদেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হলেও এখন বেশিরভাগ দেশেই তৈরি হচ্ছে। বিশেষত চাকা, টিউব, হুইল, প্যাডেল, হাতল, বিয়ারিং, আসন তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
১৯৯৬ সালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি বাইসাইকেল তৈরির প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয় মেঘনা গ্রুপ। এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে রপ্তানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে রেড, ফেরাল ও ইনিগো- এই তিন ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ইউরোপ ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার কঙ্গো, গ্যাবন ও আইভরি কোস্টে সাইকেল রপ্তানি করছে তারা।
১০০ থেকে শুরু করে ৫০০ ডলার মূল্যের সাইকেল রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি। গাজীপুরে অবস্থিত মেঘনা গ্রুপের বাইসাইকেল কারখানার বিভিন্ন বিভাগে ১০ হাজারের মতো কর্মী কাজ করে।
সাইকেলের রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারকে সামনে রেখে ১০০ কোটি টাকার বড় বিনিয়োগ করেছে রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হবিগঞ্জ ইন্ড্রাস্টিয়াল পার্কে অবস্থিত এই কারখানাটিতে ২০১৫ সালে উৎপাদন শুরু হয়েছে।
রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ২০২৪ সালে ৭ লাখ সাইকেল রপ্তানি করেছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা কামরুজ্জামান কামাল।
ইউরোপের বাজার
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যানবিষয়ক অফিস ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে যেখানে ইউরোপের বাজারে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নবম, সেখানে ২০১০ সালে পঞ্চম স্থানে উঠে আসে। এখন তৃতীয় স্থানে।
২০০৮ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশ যথাক্রমে ৩ লাখ ৭১ হাজার ও ৪ লাখ ১৯ হাজার বাইসাইকেল রপ্তানি করে। ২০০৭ সালে যে সংখ্যাটি ছিল ৩ লাখ ৫৫ হাজার।
২০১০ সালে রপ্তানি বেড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০১১ ও ২০১২ দুই বছরেই সাড়ে ৫ লাখ করে সাইকেল রপ্তানি হয় ইউরোপের দেশগুলোতে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রপ্তানি ছাড়িয়ে যায় ৬ লাখ।
২০২১-২২ অর্থ বছরে দুই প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ বাইসাইকেল রপ্তানি করে। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ দুই অর্থ বছরেই রপ্তানি কমেছে। তবে কতটি রপ্তানি হয়েছে, সে তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪-২৫ অর্থ বছরের তথ্যও পাওয়া যায়নি।
ইউরোপের বাজারে রপ্তানির শীর্ষে আছে তাইওয়ান। পরের অবস্থানে আছে থাইল্যান্ড।
বাহন হিসাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাইসাইকেল এমনিতেই পছন্দ করেন অনেকে। একদিকে স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব– এ দুটো কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাইকেলের চাহিদা বাড়ছে।

ইউরোপের দেশগুলো একসময় বাইসাইকেল বেশি আমদানির করত চীন থেকে। কিন্তু চীন থেকে আমদানি করা বাইসাইকেলের ওপর ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপ করে ইউরোপের দেশগুলো ১৯৯৩ সাল থেকে।
এই শুল্ক হার প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ২০১৩ সাল থেকে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন থেকে আমদানি করা সাইকেলের ওপর।
এর ফলে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায় বাংলাদেশের জন্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রতিবছর ২ কোটির মতো সাইকেল বিক্রি হয়। এর মধ্যে ইউরোপ বাংলাদেশ থেকে ৮ শতাংশ সাইকেল আমদানি করেছে বলে ইউরোস্ট্যাট তথ্য দিয়েছে।
রপ্তানি আরও বাড়ার আশা
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বাইসাইকেলের ডিজাইন পাঠানো হয় বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে। তারপর সে ডিজাইন অনুযায়ী সাইকেল বানিয়ে ইউরোপে রপ্তানি করা হয়।
ইউরোপে বর্তমানে যত সাইকেল বিক্রি হয় তার সংখ্যা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ইউরোপিয়ান সাইক্লিস্ট ফেডারেশন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ইউরোপে প্রতি বছর ৩ কোটি সাইকেল বিক্রি হবে।
অর্থাৎ এখন যা বিক্রি হচ্ছে তার চেয়ে আরও এক কোটি বেশি বিক্রি হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি আরও বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতি বছর এ চাহিদা ক্রমাগত বাড়বে। আমরা যদি সেই বাজার ধরতে পারি তাহলে আমাদের রপ্তানিও বাড়বে।”


