Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং কেন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেল

Nobel_Physics_31011
[publishpress_authors_box]

কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে, কোনও কণিকা কখনও এমন এক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারে, যা সে সাধারণত অতিক্রম করার মতো শক্তি রাখে না। এটা অনেকটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে না গিয়ে সরাসরি পাহাড়ের বুক ভেদ করে চলে যাওয়া। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “টানেলিং”। এটি পারমাণবিক ও পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে বহুল পরিচিত একটি ঘটনা।

২০২৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জন ক্লার্ক, মিশেল দেবোরে ও জন মার্টিনিস দেখিয়েছেন, এই ধরনের আচরণ কেবল উপপরমাণবিক কণিকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি একটি বৈদ্যুতিক বর্তনিতেও ঘটতে পারে। তাদের এই আবিষ্কার নতুন প্রযুক্তির দুয়ার খুলে দিয়েছে, যা আমাদের চারপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, বোঝা ও ব্যবহার করার পদ্ধতিকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে।

জোসেফসন জংশন কী

নোবেল পুরস্কারজয়ী এই গবেষণার মৌলিক উপাদান ছিল একটি যন্ত্র, যার নাম “জোসেফসন জংশন”। এখানে দুটি সুপারকন্ডাক্টরকে খুবই পাতলা একটি ইনসুলেটর দিয়ে আলাদা করা হয়। গবেষক দল জানতে চেয়েছিলেন, পুরো সার্কিটের একটি নির্দিষ্ট প্যারামিটার, এই ক্ষেত্রে জংশনের ফেজ ডিফারেন্স কি একক কোয়ান্টাম কণিকার মতো আচরণ করতে পারে?

তাদের পরীক্ষার ফল ছিল স্পষ্ট, “হ্যাঁ”। তারা তাদের সার্কিটে একই সঙ্গে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং এবং বিচ্ছিন্ন শক্তিস্তর উভয়ই পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন।

সুপারকন্ডাক্টরে বহু ইলেকট্রন একত্রে জোড়ায় জোড়ায় গঠন করে এবং প্রতিরোধ ছাড়াই চলাচল করে। জোসেফসন জংশনে গুরুত্বপূর্ণ ভেরিয়েবলটি হলো এই ইলেকট্রন জোড়াগুলির ফেজ পার্থক্য। সহজভাবে বলতে গেলে, এই “সুপারকন্ডাক্টিং অর্ডার প্যারামিটার” হলো একটি ম্যাক্রোস্কোপিক ভেরিয়েবল, যা ট্রিলিয়ন সংখ্যক ইলেকট্রন জোড়া একসঙ্গে ভাগ করে নেয় এবং পুরো সিস্টেমের অবস্থাকে বর্ণনা করে।

তত্ত্ব অনুযায়ী, জংশনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্ট এই প্যারামিটারের মানের ওপর নির্ভর করে এবং এটি জংশনের ওপর প্রয়োগ করা ভোল্টেজ অনুযায়ী সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।

বিজ্ঞানীরা যখন জোসেফসন জংশনের মধ্য দিয়ে কারেন্ট পাঠালেন, তারা দেখলেন, যদি কারেন্টটি খুব ছোট হয়, তবে ইলেকট্রন জোড়াগুলির প্রবাহ আটকে যায় এবং সার্কিট কোনও ভোল্টেজ তৈরি করে না। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানে এই অবস্থা স্থায়ী থাকত, প্রবাহ কখনও পুনরায় শুরু হতো না। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে, সেই ইলেকট্রন জোড়াগুলির সামান্য সম্ভাবনা থাকে হঠাৎ করে “টানেল” করে সেই বাধা পার হয়ে অন্য পাশে গিয়ে মুক্তভাবে প্রবাহিত হওয়ার, যার ফলে পরিমাপযোগ্য ভোল্টেজ সৃষ্টি হয়।

সার্কিট এত ভঙ্গুর কেন ছিল

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে কয়েকটি গবেষণা দল এই টানেলিং প্রক্রিয়াটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল। তারা জংশনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্ট পরিবর্তন করে দেখছিলেন, কোন মানে গিয়ে সেটি ভোল্টেজ তৈরি করে।

যদি ইলেকট্রন জোড়াগুলি শুধু তাপীয় কম্পনের কারণে বাধা পার হয়ে যেত। যেমন পাহাড়ের ওপরে উঠতে গরমে শক্তি পেয়ে লাফিয়ে যাওয়া, তাহলে যন্ত্রটি যত ঠান্ডা করা যেত, তত বেশি কারেন্ট দরকার হতো ভোল্টেজ উৎপন্ন করতে।

অন্যদিকে, যদি ইলেকট্রন জোড়াগুলি সত্যিই টানেল করে পার হতো, তবে তাপমাত্রা কমলেও সেই “পার হয়ে যাওয়ার হার” অপরিবর্তিত থাকত।

যন্ত্রটি দেখতে সহজ হলেও সমস্যা ছিল বাইরের মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন থেকে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব। সামান্যতম বাহ্যিক তরঙ্গও সার্কিটের আচরণ বদলে দিতে পারত, যার ফলে তাপমাত্রা-স্বাধীন আচরণের প্রমাণ পাওয়া কঠিন ছিল। তাই পরীক্ষকদের খুব সতর্কভাবে পরিবেশগত শব্দ কমাতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল।

বার্কলে ইউনিভার্সিটির জন ক্লার্কের নেতৃত্বে ডেভোরে ও মার্টিনিসের দল এই সমস্যার সমাধান করেন। তারা সার্কিট এমনভাবে পুনর্গঠন করেন যাতে কোনও বাহ্যিক সিগন্যাল ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। তারা বিশেষ ফিল্টার ও শিল্ডিং ব্যবহার করে অবাঞ্ছিত মাইক্রোওয়েভ আটকান এবং পুরো সিস্টেমকে অত্যন্ত ঠান্ডা ও স্থিতিশীল রাখেন।

এরপর তারা খুব হালকা কিন্তু নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোওয়েভ পালস পাঠিয়ে সার্কিটের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করেন। যখন সিস্টেমকে তারা যথেষ্ট নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করলেন, তখন সার্কিটের আচরণ ঠিক কোয়ান্টাম টানেলিং তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী দেখা গেল।

সার্কিট কীভাবে কোয়ান্টাম প্রভাব দেখাল

বিজ্ঞানীরা আরও জানতে চাইলেন, সার্কিটের আটকে থাকা অবস্থা কি সত্যিই একক কোয়ান্টাম সিস্টেমের মতো আচরণ করছে, যার শক্তিস্তরগুলি বিচ্ছিন্ন, না কি এটি ক্লাসিক্যাল সিস্টেমের মতো ধারাবাহিক?

তারা বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ জংশনের ওপর প্রয়োগ করেন এবং একই সঙ্গে কারেন্ট সামঞ্জস্য করেন। দেখা যায়, যখন মাইক্রোওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক দুটি শক্তিস্তরের ব্যবধানের সঙ্গে মিলে যায়, তখন সার্কিট সহজে তার “আটকে থাকা” অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। যত উচ্চতর শক্তিস্তর, তত দ্রুত এই “পলায়ন” ঘটে।

এই ধরণটি প্রমাণ করে যে, সার্কিটটি কেবল নির্দিষ্ট শক্তি প্যাকেট গ্রহণ বা নির্গমন করতে পারে। যেমন একটি কোয়ান্টাম কণিকা করে। অর্থাৎ, পুরো সার্কিটটি একটি বিশাল “পরমাণুর” মতো আচরণ করছে।

সব মিলিয়ে এই ফলাফল দুটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরে। একটি হলো, একটি ম্যাক্রোস্কোপিক বৈদ্যুতিক সার্কিট, যা খালি চোখেও দেখা যায়, তা পরিবেশ থেকে যথেষ্ট আলাদা রাখলে কোয়ান্টাম আচরণ প্রদর্শন করতে পারে। আর অন্যটি হলো, সার্কিটের ম্যাক্রোস্কোপিক কোঅর্ডিনেটগুলোকে প্রচলিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপকরণ দিয়েই বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

এই পরীক্ষাগুলো দেখিয়ে দেয় কীভাবে এই ধরনের কোয়ান্টাম অবস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিমাপ করা যায়। এতে “বায়াস কারেন্ট”, হালকা মাইক্রোওয়েভ এবং যথাযথ সুরক্ষা ব্যবহার করে সার্কিটকে বাইরের রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করা হয়। এই কাঠামোটি ভবিষ্যতের জন্য একটি টেমপ্লেট তৈরি করে দেয়, যা নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম পরিমাপের পথ খুলে দেয়।

পরবর্তী কয়েক দশকে (১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে) গবেষকরা এই ধারণাগুলিকে আরও বিকশিত করেন। তারা সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট তৈরি করেন। সেগুলোকে মাইক্রোওয়েভ রেজোনেটরে সংযুক্ত করেন, এবং তাদের কোহেরেন্স বা কোয়ান্টাম অবস্থা ধরে রাখার ক্ষমতা উন্নত করেন।

এই কাজের ব্যবহারিক প্রয়োগ কী

এই একই পদার্থবিজ্ঞানের মূলনীতি থেকেই প্রযুক্তিগত প্রয়োগের জন্ম। একটি জোসেফসন জংশনযুক্ত সার্কিট এমনভাবে নকশা করা যায় যে সেটি একটি “পরমাণুর” শক্তিস্তরগুলোর অনুকরণ করে। মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে সার্কিটকে এক শক্তিস্তর থেকে আরেকটিতে উত্তরণ করানো যায়। আবার রেজোনেটরের সঙ্গে যুক্ত করে সার্কিটের অবস্থা পরিমাপ করা যায় কোনওরকম বিঘ্ন না ঘটিয়েই।

এই স্থাপত্যকে বলা হয় “সার্কিট কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স, যা আজকের সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলির ভিত্তি।

রেজোনেটরকে এখানে ভাবা যায় এক ধরনের “মাইক্রোওয়েভ প্রতিধ্বনি চেম্বার” হিসেবে। সার্কিট ও রেজোনেটর একত্রে সংযুক্ত হলে তারা নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি বিনিময় করতে পারে, ফলে বিজ্ঞানীরা সরাসরি সার্কিটে না গিয়েও রেজোনেটরের আচরণ দেখে তার অবস্থা অনুমান করতে পারেন।

আজকের দিনে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম প্রভাব ব্যবহার করা এই ধরনের সুপারকন্ডাক্টিং সার্কিটগুলোই বহু উদীয়মান প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো কোয়ান্টাম অ্যাম্প্লিফায়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা খুবই ক্ষীণ সংকেতকে কোনও বাড়তি শব্দ যোগ না করেই বৃদ্ধি করতে পারে। এটা চিকিৎসা নির্ণয় থেকে শুরু করে ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া এগুলো দিয়ে অতি নির্ভুলভাবে কারেন্ট ও ভোল্টেজ পরিমাপ করা সম্ভব। মাইক্রোওয়েভ-টু-অপটিক্যাল কনভার্টার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, যা কোয়ান্টাম প্রসেসরকে ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে।

এগুলো কোয়ান্টাম সিমুলেটর হিসেবে জটিল পদার্থ বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার পরমাণু-পরমাণু স্তরে মডেল তৈরি করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই যন্ত্রগুলোর কাজ করার ক্ষমতা মূলত নির্ভর করে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারের ওপর। সেটা হলো: সার্কিটের মধ্যে যে ফেজ পার্থক্য আর সুপারকারেন্ট (অর্থাৎ, প্রতিরোধ ছাড়া চলা বিদ্যুৎ) আছে, তারা বাইরের প্রভাবের প্রতি খুবই সংবেদনশীল।

মানে বাইরে থেকে সামান্য কিছু পরিবর্তন; যেমন তাপমাত্রা, চৌম্বক ক্ষেত্র, বা কোনও মাইক্রোওয়েভ সিগন্যালের ছোট নড়াচড়া হলেই সার্কিটের ভেতরে বড় পরিবর্তন ঘটে। আর সেই পরিবর্তন সহজেই পরিমাপ করা যায়। অর্থাৎ, এই সার্কিট এতটাই সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যে ছোট্ট প্রভাবও বড় ও স্পষ্ট সংকেতে রূপ নেয়, এটাই এর শক্তি।

নোবেলজয়ীদের কৃতিত্ব হলো, তারা এই সংবেদনশীলতাকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে, বরং একে শক্তিতে পরিণত করেছেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found