Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

লাল গালিচা বিছিয়ে পুতিন-মোদীকে চীনে নিলেন শি

ফাইল ছবিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এসসিও সম্মেলনে আবার এক হচ্ছেন তারা।
ফাইল ছবিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এসসিও সম্মেলনে আবার এক হচ্ছেন তারা।
[publishpress_authors_box]

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিমুখ হয়ে চীনের আতিথ্য নিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। লাল লালিচা বিছিয়ে তাদের বরণ করে নিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

তিয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মোদী ও পুতিন এরই মধ্যে চীনে পৌঁছেছেন। রবিবার এই সম্মেলন শুরু হচ্ছে।

বিপরীত মেরুর মোদী ও পুতিনকে একসঙ্গে আতিথ্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে শি দৃশ্যত বৈশ্বিক নেতা হিসাবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নেওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছেন; কেননা এদের একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসাবে পরিচিত, আরেকজন বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকার প্রধান।

এশিয়ার এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা চীনের বন্দরনগরী তিয়েনজিনে এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিভিন্ন দেশের অসন্তুষ্ট হওয়ার প্রেক্ষাপটে চীনা কর্মকর্তারা এসসিওর সবচেয়ে বড় এই সম্মেলনকে বিশ্বে শিকে শক্তিশালী বিকল্প নেতা হিসাবে তুলে ধরার মঞ্চ হিসাবে দেখছেন।

এই সম্মেলনটি হচ্ছে বেইজিংয়ে একটি বড় সামরিক প্যারেডের কয়েক দিন আগে হচ্ছে। ফলে এর মধ্যদিয়ে চীনের বিকাশমান সামরিক শক্তির বার্তাও পাওয়া যাচ্ছে। এই প্যারেডে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন এবং মিয়ানমারের মিন অং হ্লাইংয়ের পাশাপাশি পুতিনের সঙ্গে সার্বিয়ার আলেক্সান্দার ভুচিচ এবং স্লোভাকিয়ার রবার্ট ফিকোও যোগ দেবেন।

এই শীর্ষ সম্মেলন পুতিনও থাকবেন আলোচনায়। আলাস্কায় ট্রাম্পের সঙ্গে তার শীর্ষ সম্মেলনের মাত্র দুই সপ্তাহ পর তিনি চীনে গেলেন, আবার ইউক্রেনে আক্রমণ বন্ধ করার আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে চলেছেন।

তিয়ানজিনে লাল গালিচায় পা রাখার আগে পুতিন চীন-রাশিয়া অংশীদারত্বকে বিশ্বে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ‘স্থিতিশীল শক্তি’ হিসাবে তুলে ধরেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়াকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তারা একটি ন্যায়সঙ্গত, বহু-মেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐক্যবদ্ধ।

এসসিও’র সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভারত ছাড়াও রয়েছে ইরান, পাকিস্তান, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান। বিশ্বের জ্বালানি তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ যাদের, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ এই দেশগুলোরই।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ অন্যান্য নেতারা তিয়ানজিনে পৌঁছেছেন ইতোমধ্যে। শনিবার থেকে শি তাদের সঙ্গে একের পর এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করছেন।

দ্বন্দ্ব ও মিত্রতা

শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায়ও রয়েছে বিশাল ফারাক। আর এই দূরত্বই চীনকে বড় সুযোগ করে দিচ্ছে।

পাকিস্তানের লাহোর ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিকিউরিটি, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ’র পরিচালক রাবিয়া আখতার বলেন, “বেইজিং ইঙ্গিত দিতে চায় যে ইউরেশিয়ার অপরিহার্য সমন্বয়কারী এখন চীন। তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের একই টেবিলে বসাতে এবং বৃহৎ-শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আন্তঃনির্ভরশীলতায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম।”

নানা বৈরিতার মধ্যে সাত বছর পর মোদীর চীন সফর বেইজিং আয়োজিত এই সম্মেলনের উচ্চতাই বাড়িয়ে দেয়। গত বছর কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলন এড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন শুল্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বৈরিতার দিকে গড়ানোর মধ্যে তিয়ানজিনে হাজির হলেন তিনি।

বেইজিং ও দিল্লির উত্তেজনা প্রশমনের পদক্ষেপ চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের নানা প্রচেষ্টাকে অকার্যকর করে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এসসিওর এবারের সম্মেলনে ১৬টি সদস্য দেশ ছাড়াও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক দেশ থেকেও প্রতিনিধি দল আসার কথা রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েত, সেইসঙ্গে রয়েছে ন্যাটো সদস্য তুরস্কও।

বেইজিং কয়েকটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় নেতাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও উপস্থিত হয়েছেন এই সম্মেলনে।

এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তিয়ানজিন শহর ছেয়ে গেছে ইংরেজি, রুশ ও চীনা ভাষায় ব্যানারে।

এবারের সম্মেলনস্থলটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছে চীন। এই বন্দর নগরী ১৯ শতকে ঔপনিবেশিক শক্তি চালু করেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান তা দখলও করেছিল।

এই সম্মেলন শেষে বেইজিংয়ে সামরিক প্যারেডে পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ বিভিন্ন নেতার থাকার কথা রয়েছে।

এই প্যারেডে কমিউনিস্ট চীন যেমন তার সামরিক শক্তির মহড়া দেবে, তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মিত্র বাহিনীর অংশ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী জাপানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা তুলে ধরবে।

এসসিও কী

২০০১ সালে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও), এরপর তার পরিসর বাড়তেথাকে।

এসসিও সদস্যরা সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ মহড়া পরিচালনা করে। সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থাসহ নানা বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে এবং শিক্ষা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করে।

এই জোটের দেশগুলো মনে করে, তারা একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্যও ঐক্যবদ্ধ, যা কোনও একক পরাশক্তি এবং তার মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত নয়।

২০২৩ সালে ইরানের এবং এক বছর পর বেলারুশের এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে বেইজিং ও মস্কোর পশ্চিমাবিরোধী শক্তি সমাবেশের প্রচেষ্টা হিসাবে দেখা হয়। মস্কো, বেইজিং ও তেহরানের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হওয়াটা ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের।

এখন ট্রাম্পের নীতির কারণে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তা এই সম্মেলনে চীনকে তার নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই শীর্ষ সম্মেলন সদস্য দেশগুলোর নিজেদের নানা দ্বন্দ্ব ছাপিয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।

সাংহাই-ভিত্তিক কটৈনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক শেন দিংলি বলেন, “সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের মিশন কী হওয়া উচিৎ এবং এটি কীভাবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এবং বাহ্যিক দেশগুলোর সাথে সদস্যদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের উৎসগুলো সমাধান করতে পারে, তা গভীরভাবে সমাধান না করলে এসসিও কেবল একটি লোকদেখানো ব্যাপার।”

এমনকি এই জোট নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা হুমকি মোকাবেলার কথা বললেও এর শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে এখনও ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে কোনও যৌথ বিবৃতিই দেয়নি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত নিরসনেও এই জোটের কোনও ভূমিকা দেখ যায়নি। তবে গত জুনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়েছিল তারা।

তথ্যসূত্র : সিএনএন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found