Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ডিজিটাল ব্যাংক খুলতে এখন লাগবে ৩০০ কোটি টাকা

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি
[publishpress_authors_box]

ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য ন্যূনতম মূলধন লাগবে ৩০০ কোটি টাকা। এর আগে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। এখন তা ১৭৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত ২১ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, “ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ১৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে শাখাবিহীন ডিজিটাল ব্যাংক-কোম্পানি স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করিল।”

রবিবার (২৪ আগস্ট) প্রজ্ঞপনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এটি সার্কুলার আকারে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, “ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ১৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে শাখাবিহীন ডিজিটাল ব্যাংক-কোম্পানি স্থাপনের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষণে, ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে জারি করা প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি আপনাদের অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হলো।”

২০২৩ সালের ১৫ জুন ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যে নীতিমালা ঘোষণা করেছিল, তাতে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকার কথা বলা হয়েছিল।

নতুন প্রজ্ঞাপনে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি করা ছাড়া আগে জারি করা নীতিমালার অন্য সব শর্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

নতুন করে আবার ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আবেদন চাওয়া হবে। আগামী ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

তার আগে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হলো।

অবশ্য গত ১৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ বিষয়ে আলোচনা উঠলে কোনও কোনও সদস্য ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স না দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

অন্যদিকে বিগত সরকারের সময়ে অনুমোদন পাওয়া নগদ ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকে বিনিয়োগ করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের তথ্য না থাকায় তাদের লাইসেন্স নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে গত বছরের জুনে নগদ ব্যাংক পিএলসি নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে নগদ ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির নামে এলওআই (Letter of Intent) দেওয়া হয়।

তবে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর পাচারের টাকায় বিদেশে কোম্পানি খুলে এসব ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অভিযোগ সামনে আসে। যে কারণে নগদ ব্যাংক পিএলসির লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর কড়ির নামে এখনও লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি।

জানা গেছে, ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, বাংলাদেশে এখনও তা প্রস্তুত হয়নি। আবার বর্তমানে কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এসব কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালকদের কেউ কেউ নতুন আবেদন না চাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের আগামী সভায় এ বিষয়টি এজেন্ডাভুক্ত করার কথা রয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে যে প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়, তা ছিল রাজনৈতিক। সরকার পতনের পর দেখা যাচ্ছে, নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত পাঁচ কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত ফিনক্লুশন ভেঞ্জারস পিটিই লিমিটেড এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত চার কোম্পানি ব্লু হেভেন ভেঞ্চারস, অসিরিস ক্যাপিটাল পার্টনার্স, জেন ফিনটেক এবং ট্রুপে টেকনোলজিস।

গত বছরের ১৮ আগস্ট বিনিয়োগকারী পাঁচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুরে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও ঠিকানা, গঠনকালীন মালিকানা কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, বর্তমান মালিকানা ও তাদের নাগরিকত্ব, গত তিন বছরের করপরবর্তী নিট মুনাফা ও নিট সম্পদ এবং হোল্ডিং কোম্পানির ক্ষেত্রে সাবসিডিয়ারি কোম্পানির তথ্য চাওয়া হয়।

প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া অপর প্রতিষ্ঠান কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসিরও একই সমস্যা। সরকার পতনের পর এই প্রতিষ্ঠান যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধনই নিতে পারছে না। মূলত এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত চার কোম্পানির বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই ব্যাংকের মূল উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি টেকনোহেভেন, যার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হাবিবুল্লাহ নেয়ামুল করিম সাবেক অর্থ সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনের স্বামী।

দেশে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ২০ জুন আগ্রহীদের থেকে আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আবদন চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ৫২টি আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে তিন ধাপে আবেদন মূল্যায়ন করে ৯টি প্রস্তাব পাঠানো হয় পরিচালনা পর্ষদের সভায়।

তবে নগদ ও কড়ি ছাড়া বাকি সাতটি আবেদনের মধ্যে স্মার্ট ডিজিটাল ব্যাংক, নর্থ ইস্ট ডিজিটাল ব্যাংক এবং জাপান-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংককে পরে এলওআই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

আর বিকাশ, ডিজি টেন এবং ডিজিটাল ব্যাংককে আলাদা লাইসেন্স না দিয়ে ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং উইং’ খোলার অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আবেদন নাকচ করা হয়।

ডিজিটাল ব্যাংক কী

ডিজিটাল ব্যাংক পরিচালনার জন্য প্রধান কার্যালয় থাকবে। তবে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এটি হবে স্থাপনাবিহীন। অর্থাৎ এই ব্যাংক কোনও ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) সেবা দেবে না। এর নিজস্ব কোনও শাখা বা উপশাখা, এটিএম, সিডিএম অথবা সিআরএমও থাকবে না। সব সেবাই হবে অ্যাপনির্ভর, মুঠোফোন বা ডিজিটাল যন্ত্রে।

একটি ডিজিটাল ব্যাংকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই সেবা মিলবে। গ্রাহকদের লেনদেনের সুবিধার্থে ডিজিটাল ব্যাংক ভার্চ্যুয়াল কার্ড, কিউআর কোড ও অন্য কোনও উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য দিতে পারবে। তবে লেনদেনের জন্য কোনও প্লাস্টিক কার্ড দিতে পারবে না। অবশ্য এই ব্যাংকের সেবা নিতে গ্রাহকেরা অন্য ব্যাংকের এটিএম, এজেন্টসহ নানা সেবা ব্যবহার করতে পারবেন।

ডিজিটাল ব্যাংক কোনও ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারবে না। বড় ও মাঝারি শিল্পেও কোনও ঋণ দিতে পারবে না। শুধু ছোট ঋণ দিতে পারবে।

নীতিমালা

২০২৩ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের লক্ষ্যে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তা অনুমোদন করে। ওই নীতিমালার ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব আহ্বান করে।

নীতিমালায় বলা হয়েছিল, ডিজিটাল ব্যাংকের কোনও শাখা, উপশাখা, এটিএম বুথ বা কোনও স্থাপনা থাকবে না। মুঠোফোন অথবা ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করেই গ্রাহকদের ব্যাংক সেবা দেওয়া হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী চলবে এই ডিজিটাল ব্যাংক।

ব্যাংক স্থাপনের শর্ত

বাংলাদেশে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক করতে প্রয়োজন হয় ৫০০ কোটি টাকার মূলধন। ২০২৩ সালের নীতিমালায় শর্ত ছিল একেকটি ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য ন্যূনতম মূলধন লাগবে ১২৫ কোটি টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে এই ব্যাংককে দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বা শেয়ার ছাড়তে হবে। আইপিওর পরিমাণ হতে হবে স্পন্সরের প্রাথমিক অবদানের ন্যূনতম পরিমাণের সমান।

শর্তে আরও বলা হয়েছিল, এই ব্যাংক স্থাপনে উদ্যোক্তাদের অর্ধেককে হতে হবে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, উদীয়মান প্রযুক্তি, সাইবার আইন ও বিধিবিধান বিষয়ে শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। বাকি অর্ধেককে হতে হবে ব্যাংকিং, ই-কমার্স এবং ব্যাংকিং আইন ও বিধিবিধান বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।

ডিজিটাল ব্যাংককে কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকের মতো সময়ে সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ন্যূনতম নগদ জমা (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) বজায় রাখতে হবে।

কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা তার পরিবারের কোনও সদস্য প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবেন না। এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ কতজন পরিচালক হতে পারবেন, তা ঠিক হবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী।

ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) ব্যাংকিং পেশায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, রেগুলেশন, গাইডলাইন, সার্কুলার ইত্যাদি ক্ষেত্রে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found