Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

রুশ তেলে রমরমা ভারত, নেপথ্যে এশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তিটি

এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি।
এশিয়ার শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানি।
[publishpress_authors_box]

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া থেকে কম দামে জ্বালানি তেল কিনে যাচ্ছিল ভারত; আর সেটাই এখন কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চড়িয়েছেন। কারণ হিসাবে ভারতের রাশিয়াকে সাহায্য করার কথা বলছেন তিনি।

যদিও দিল্লি ও মস্কোর বন্ধুত্ব সেই স্নায়ু যুদ্ধের কাল থেকে, তবুও ট্রাম্পের ক্ষোভ মূলত রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনার কারণে।

ট্রাম্প গত ৩০ জুলাই ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লেখেন, “যখন সবাই চায় যে রাশিয়া ইউক্রেনে হত্যা বন্ধ করুক, সেই সময়ে ভারত চীনের মতোই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা। এটা মোটেই ভালো কিছু নয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত ১৯ আগস্ট সিএনবিসিকে বলেছিলেন, ভারতের কিছু ধনী পরিবার এই জ্বালানি আমদানির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী।

হিসাবের খাতা খুললে দেখা যায়, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হলো রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (আরআইএল), যার মালিক এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানি।

আমস্টারডামের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আরআইএল’র জামনগর শোধনাগারের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির মাত্র ৩ শতাংশ ছিল রাশিয়ার তেল। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে জামনগর শোধনাগার রাশিয়া থেকে ১৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যার মূল্য ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

সিআরইএর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে আরআইএলের রাশিয়া থেকে আমদানি করা তেলের পরিমাণ ২০২৪ সালের মোট আমদানির তুলনায় মাত্র ১২ শতাংশ কম।

সিআরইএর ইউরোপীয় ইউনিয়ন-রাশিয়া বিশ্লেষক বৈভব রঘুনন্দন বলেছেন, এই কমে যাওয়ার কারণ রািশয়ার তেল কেনায় মূল্য সীমা বেঁধে দেওয়ার কারণে।

ইউক্রেনে অভিযান চালানোর শাস্তি হিসাবে পশ্চিমা দেশগুলো নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি রাশিয়ার আয় কমাতে তাদের তেলের মূল্য সীমা বেঁধে দেয় শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭।

রঘুনন্দন আল জাজিরাকে বলেন, “এই মূল্য সীমা একদিকে রাশিয়ার রাজস্ব সীমিত করলেও আরেক দিকে ভারত ও চীনের মতো ক্রেতাদের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।”

আল জাজিরার প্রশ্নে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অবশ্য বিস্তারিত কোনও তথ্য দেয়নি।

রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর রিফাইনারি।

রঘুনন্দন বলছেন, মূল্য সীমার স্তর স্থির রাখা হলেও (তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ৬০ ডলারে রয়েছে) তার কার্যকারিতা না থাকায় উদ্দেশ্যটি ব্যাহত হচ্ছে।

বরং এর বিপরীতে ফাঁকি দেওয়ার জন্য রাশিয়া দ্বারা পরিচালিত শত শত জাহাজের বহর ক্রেতাদের মূল্য সীমার চেয়ে বেশি দামেও তেল বিক্রি করছে।

সিআরইএর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৩ শতাংশ এই জাহাজগুলোর মাধ্যমে পরিবহন করা হচ্ছিল। জুনে অবশ্য তা ৫৯ শতাংশে নেমে আসে।

সিআরইএ ২০২১ সাল থেকে গত মাসের শেষ পর্যন্ত জামনগর শোধনাগারে আরআইএলের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং রপ্তানি পর্যবেক্ষণ করেছে।

তারা দেখেছে, জামনগর শোধনাগার ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে গত মাস পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৮৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে।

মজার বিষয় হলো এই রপ্তানির আনুমানিক ৪২ শতাংশ (৩৬ বিলিয়ন ডলার) গেছে সেই দেশগুলোতে, যারা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

আরআইএলের মোট রপ্তানির এক-তৃতীয়াংশ, যার মূল্য ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের তেল ইইউতে গেছে। ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের তেল গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।

মূল্য সীমা কার্যকর হওয়ার পর থেকে ভারতের এই শোধনাগার থেকে একক দেশ হিসাবে আমদানিকাকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ। তালিকায় তাদের ওপরে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর।

পরিমাণের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র জামনগর শোধনাগার থেকে বৃহত্তম আমদানিকারক। মূল্য সীমা কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ৮ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন তেল পণ্য আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০২৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্র এই শোধনাগার থেকে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি।

আরআইএলের পর রাশিয়ার তেলের বড় আমদানিকারক রুশ-ভারত যৌথ বিনিয়োগের কোম্পানি নয়ারা এনার্জি। তাদের ভাদিনার শোধনাগারে এই বছর মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৬৬ শতাংশই রাশিয়ার।

‘পুরোপুরি প্রতারণা’

বিশ্লেষকরা বলছে, অতিরিক্ত শুল্কের খরচ কেবল একটি কোম্পানির সুবিধার জন্য ভারত বহন করছে বলে মনে করাটা সরলীকরণ হবে।

সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির রাচেল জিয়েম্বা বলেন, “আমার কাছে মনে হয় যে বেশিরভাগ লাভ রিলায়েন্সের কাছে গেলেও ভারত সরকার রাশিয়ার সঙ্গে তেল বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়াকে সুবিধাজনক মনে করেছে।

“কারণ একদিকে সস্তা তেল আমদানি ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতি পূরণে সাহায্য করেছে এবং অন্যদিকে (রুশ-পশ্চিম দ্বন্দ্বে) কারও পক্ষে নেই, এমন একটি বার্তাও পাঠানো যাচ্ছে।”

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের মিত্রতা থাকলেও স্নায়ুযুদ্ধকালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট নিরপেক্ষ অবস্থানই বজায় রেখেছিল।

দিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব রুশ তেল আমদানির জন্য ভারতের ওপর ট্রাম্পের বাড়তি শুল্ক আরোপকে এক ধরনের ‘প্রতারণা’ বলে মনে করছেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “পুরো বিষয়টি একটি প্রতারণা, যখন তারা রুশ তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক চীনকে কিছু বলছে না।”

অজয় বলেন, ট্রাম্প চীনকে কিছু বলতে ‘ভয় পান’। আবার যদি তিনি তিনি পুতিনের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে আসেন, তখন দেখা যাবে ভারতের শুল্কের ক্ষেত্রে নতুন অজুহাত বের করবেন।

তার মতে, রাশিয়ার তেল আমদানি এখানে মুল বিষয় নয়, এর সঙ্গে ভারত বাণিজ্য প্রশ্নে ছাড় না দেওয়ার যে অবস্থান নিয়েছে, সেই বিষয়টি জড়িত।

হোয়াইট হাউসে বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদী।
নরেন্দ্র মোদীকে বন্ধু বললেও ভারতের পণ্যে উচ্চ শুল্ক বসিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

অজয় বলেন, রিলায়েন্স রুশ তেলের মূল্য সীমা থেকে লাভবান হতে পারে। তবে এটি এটি একটি বেসরকারি কোম্পানি হওয়ার কারণেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে, কারণ স্বাভাবিকভাবেই ধনীদের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে।

মূল্য সীমা কার্যকর হওয়ার পর থেকে গত মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা জ্বালারি মিশ্র উপাদানের ৩৮ শতাংশ, জেট আমদানির ৪ শতাংশ এবং পেট্রোল আমদানির ২ শতাংশ জামনগর শোধনাগার সরবরাহ করেছে।

তবে এখন এক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। কেননা ইইউ রুশ অপরিশোধিত তেল থেকে প্রক্রিয়াজাত পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

একে ‘গুরুত্বপূর্ণ নীতি পরিবর্তন’ অভিহিত করে রঘুনন্দন বলছেন, “যদি এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এর বেশ প্রভাব পড়বে।”

এই নিষেধাজ্ঞা জানুয়ারিতে শুরু হবে।

আরআইএলের জেট জ্বালানি রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি ইইউতে গেছে। ফলে তাদের এই বাজার হারানোর একটি ঝুঁকি তৈরি হবে।

এই অবস্থায় আরএইএলের রপ্তানি কৌশল ঢেলে সাজাতে হবে বলে মনে করেন রঘুনন্দন।

আরআইএল এরই মধ্যে রাশিয়ার কোম্পানি রোজনেফটের সঙ্গে একটি ১০ বছরের চুক্তিতে সই করেছে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এতে পড়বে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত