মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্বজনদের ভিড় যেন থামছেই না। ইতোমধ্যে সেখানে চিকিৎসাধীন ১৩ জন মারা গেছে। সেখানে এখনও চিকিৎসাধীন আছে ৪২ জন; যাদের মধ্যে অন্তত ছয় জনের জীবন রয়েছে সঙ্কটে।
সোমবার ২১ জুলাই সোমবারের ওই ঘটনার পর প্রতিদিনই সকাল সন্ধ্যার এই প্রতিবেদক যাচ্ছেন জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। গত মঙ্গলবার ইনস্টিটিউটের চারতলায় আইসিইউর (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সামনে দেখা মেলে আইসিইউর ভেতরে থাকা সব রোগীর স্বজনদের।
তাদের অনেকের উদ্বেগের কারণ মাহতাব; স্কুলে বিমান পড়ে যার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। আইসিইউর ১১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন ছিল সে।
এই মাহতাবের কথা একটু চিন্তা করলেই অনেকের মনে পড়বে। সেদিন মাইলস্টোন স্কুলে ঘটনার পরপরই প্রায় খালি গায়ে যে ছেলেটি দৌড়াচ্ছিল, সেই ছেলেটিই মাহতাব। ১৪ বছরের মাহতাব রহমান ভুইয়ার সেই পোড়া ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মঙ্গলবার আইসিইউর সামনে অপেক্ষারত স্বজনদের মধ্যে কারও কারও বাবা-মা, ভাই-বোন ছিল। সবচেয়ে বেশি মানুষ অপেক্ষায় ছিল মাহতাবের জন্য। যার কাছে জানতে চাওয়া হয়- রোগী কে? প্রত্যেকেরই উত্তর ছিল- “মাহতাব।”
সেখানে মাহতাবের বাবা-মা ও দুই বোনের পাশাপাশি ছুটে এসেছিল তার দূরের সব আত্মীয়রা।
এত মানুষ এসেছে মাহতাবের জন্য- সকাল সন্ধ্যার এমন বিস্ময়সূচক প্রশ্নে সেদিন তার মামা হামিদুর রহমান বলেছিলেন, “আমাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে একটাই ছেলে; মাহতাব। যার কারণে সবার ভীষণ আদরের সে। ওর পুড়ে যাওয়ার খবর শুনে আমাদের ভেতরে এমন কেউ নেই যে এখানে আসছে না।”
হামিদুর রহমান তখন আইসিইউর সামনের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর বাম হাতে বুকের সঙ্গে ধরে রেখেছিলেন এক কিশোরীকে।
তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কানে এলো, সেই কিশোরী বলছে, “মামা, ভাইয়া কি ফিরবে না; ডক্টর কী বলেছেন তোমাদের?”
ভাগ্নীর এমন প্রশ্নে উদ্ভ্রান্ত, হতবিহ্বল মামা হামিদুর তখন চোখ ফেরালেন অন্যদিকে; যেন কিছু লুকাতে চাইলেন তিনি।

কিছুটা সময় নিয়ে এই প্রতিবেদককে হামিদুর রহমান বলেন, “মাহতাবরা দুই বোন এক ভাই। বড় বোনও মাইলস্টোন স্কুলে পড়ে, সেদিন বোনটি স্কুলে যায়নি। কিন্তু গিয়েছিল সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি মাধ্যমের মাহতাব। আর তাতেই আমাদের কপাল পুড়লো।”
সোমবার বিমান বিধ্বস্তের পর মাহতাবকে সরাসরি জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়। তার শরীরের ৮৫ শতাংশই দগ্ধ হয়েছিল। মাহতাবের অবস্থার অবনতি হলে গতকাল বুধবার রাতে তাকে আইসিইউ থেকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার দুপুর ১ টা ৫০ মনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বজনরা ধরে মাহতাবের বাবা মিনহাজুর রহমানকে নিয়ে আসেন ওয়েটিং রুমে। তখন এই প্রতিবেদকও ছিলেন আইসিইউর সামনের সেই ওয়েটিং রুমে।
সবাই তখন হুড়মুড় করে ঢুকল। একটি চেয়ারে অনেকটা জোর করে বসানো হলো মাহতাবের বাবা মিনহাজুর রহমানকে। কিছুতেই তাকে চেয়ারে রাখা যাচ্ছিল না, চিৎকার করে কাঁদছিলেন তিনি। বলছিলেন, “আমার মাহতাব।”
তার এই বিলাপে ওয়েটিং রুমের সবাই বুঝে গেল- ১৪ বছরের মাহতাবের জন্য অপেক্ষার পালা শেষ। মিলে গেল তার বোনের সেই প্রশ্নের উত্তর, ফিরলো না ভাই।
এই ওয়েটিং রুমে তখন যারা ছিলেন সবাই মাইলস্টোন কলেজের প্ল্যান ক্র্যাশে আহতদের স্বজন। মিনহাজুর রহমানের আহাজারি তাদের মাঝে সংক্রমিত হতে বিন্দুমাত্র সময় লাগলো না। একটি কক্ষের প্রত্যেকটা মানুষ কেঁদে উঠলেন। কেউ কেউ কাঁদলেন চিৎকার করে, কেউ কাঁদলেন হাত দিয়ে মুখ ঢেকে, আবার কেউ কেউ কাঁদলেন বোবাকান্না।
মাহতাবের বাবা মিনহাজুর রহমান বলছিলেন, “সেদিন যদি ছেলেটা আমার অসুস্থও হতো…তাহলে তাকে স্কুলে দিতাম না। আমার ছেলেটা অসুস্থ হলো না, অথচ চলে গেল। বাড়ি ফিরে আমি কী জবাব দেব ওর মা আর দুই বোনের কাছে।”
ছেলে হারানো এই বাবা বিলাপ করতে করতে আরও বলেন, “ভুলে ভরা এই দেশ, সিস্টেমের ভুল কেড়ে নিলো সন্তানকে। অথচ কী অসীম সাহস নিয়ে পুরো পোড়া শরীর নিয়ে স্কুল মাঠ থেকে দৌড়ে বেরিয়েছিল ছেলেটা আমার…।”
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা বলেন, “কেবল মাইলস্টোন স্কুল পোড়া না, এই পুরো দেশ পোড়া; পোড়া দেশের পোড়া মানুষ আমরা।”
তিনি বলেন, “গতকাল রাতে যখন ডাক্তাররা আমাকে বলে ছেলের আর রক্তের প্রয়োজন হবে না, যখন তারা আর আমাকে নতুন কোনও ওষুধের কথা বলছিল না, তখনই আমি বুঝতে পারছিলাম, ছেলে আমার আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে; ওর জন্য আমাকে আর কিছুই করতে হবে না।”
এসময় মিনহাজুর রহমান বারবার বলছিলেন তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের কথা। মাহতাবকে নিয়ে তাদেরকে কী জবাব দেবেন- সেটাই যেন অনেক হাতড়েও খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি।

সিরামক প্রস্তুতকারী এক প্রতিষ্ঠানের জিএম মিনহাজুর রহমানের মোবাইল ফোন থেকেই মাহতাবের মৃত্যুর খবর দিচ্ছিলেন এক সহকর্মী।
তিনি ফোনে বলছিলেন, “আমাদের মাহতাব আর নেই; অফিসেও আর আসবে না। আপনারা সবাই দোয়া করবেন। ওর কাগজপত্র (হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র) পেলেই কুমিল্লা (দেশের বাড়ি কুমিল্লার দ্বেবীদাড়) নিয়ে যাবে, সেখানেই দাফন হবে ওর।”
এদিন মাহতাবের মৃত্যুর আড়াই ঘণ্টা পর আরেক শিশুরও মৃত্যু হয় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ১৫ বছরের মাহিয়া তাসনিম মায়াও মারা যায়। সে পরিবারের সঙ্গে উত্তরা ১৮ নম্বরে থাকত, তার গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা।
বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান জানান, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিয়ার শরীরের ৫০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্লাস্টিক সার্জারির সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানভীর আহমেদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, সাধারণভাবে ২০ শতাংশ দগ্ধ হওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয় এবং ৪০ শতাংশ পোড়া মারাত্মক দগ্ধ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু মাইলস্টোনের মতো বড় দুর্ঘটনায় ১ শতাংশ নাকি ৪০ শতাংশ দগ্ধ; তাতে খুব একটা পার্থক্য থাকে না। কারণ বাচ্চাদের শ্বাসনালীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটাই মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ বলে ধরা হয় দগ্ধরোগীদের ক্ষেত্রে।
এই ঘটনায় প্রত্যেকের মুখ পুড়ে গেছে জানিয়ে ডা. তানভীর বলেন, “কারণ এতে যুদ্ধবিমানে দাহ্য পদার্থ ছিল এবং আগুন সীমিত স্থানে ছড়িয়েছিল। এ কারণে প্রতিটি রোগীই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এখনও।”
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাসির উদ্দীন জানান, এখানে এখন পর্ন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪২ জন। তাদের মধ্যে ১৩ জন কেবিনে; আইসিইউতে ৬ জন।
তিনি জানান, ১৮ বছর বয়সী সাইমনকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সায়মান শারীরিকভাবে দগ্ধ না হলেও মানসিকভাবে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।



