ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর বক্তব্য কার্যত অসার হয়ে গেল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্যে।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে এক সময় জঙ্গি থাকলেও তা নির্মূল হয়েছে, এখন আর কোনও জঙ্গি নেই।
তার পাঁচ দিন আগে পুলিশ কর্মকর্তা সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, বাংলাদেশে জঙ্গি ছিলই না, আওয়ামী লীগ আমলে এনিয়ে ‘নাটক’ হতো।
গুলশান হামলার বছরপূর্তিতে সাজ্জাত আলীর ওই কথা আসার পরপরই মালয়েশিয়ায় আইএসে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৬ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হওয়ার পর জঙ্গিবাদ নতুন করে আলোচনায় আসে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ঝড় তুলেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
সশস্ত্র বন্দুকধারীরা সেখানে ঢুকে সবাইকে জিম্মি করে, তারপর রাতভর দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করে। তার মধ্যে নয়জন ইতালির নাগরিক, সাতজন জাপানের নাগরিক, একজন ভারতের নাগরিক এবং তিনজন বাংলাদেশি। জিম্মিদের মুক্ত করতে গিয়ে বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা।
সারাবিশ্বের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো বাহিনী চালায় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’, তাতে জঙ্গিমুক্ত হয় হলি আর্টিজান বেকারি, নিহত হয় হামলাকারী পাঁচ তরুণ।
হামলাকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটস বা আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে তখন দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল। তবে বাংলাদেশের তদন্তকারীরা তাদের চিহ্নিত করে দেশে গড়ে ওঠা জঙ্গি দল জেএমবির একটি শাখা হিসাবে।
গুলশান হামলার পর জঙ্গি দমনে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছিল পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তাতে জঙ্গি নেতা হিসাবে চিহ্নিত অনেকেই নিহত হয়েছিল, যাদের কেউ কেউ গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী বলে তখন দাবি করা হয়।
তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ; তারা জঙ্গি দমনে সফলতার দাবিও করে আসছিল। পুলিশ কর্মকর্তারাও বলে আসছিলেন, জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আইএস দুর্বল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে কয়েক বছর পর বাংলাদেশেও জঙ্গিদের তৎপরতা কমে আসে। বড় ধরনের কোনও অভিযানে আর নামতে হয়নি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বছর গড়ানোর আগে গুলশান হামলার বর্ষপূর্তিতে ডিএমপি কমিশনার সাজ্জাত আলী অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রশ্নে দাবি করেন, বাংলাদেশে কোনও জঙ্গি নেই।
তার ভাষ্যে, “আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে। কীসের জঙ্গি?”
তাহলে গুলশান হামলার ঘটনাটি কী ছিল- এই প্রশ্নে তার উত্তর আসে, “ওটা সম্পর্কে আমি জানি না; তবে বাংলাদেশে কোনও জঙ্গি নাই। বাংলাদেশে পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে।”
তার ওই বক্তব্যের পরপরই মালয়েশিয়ায় আইএসে জড়িত সন্দেহে ৩৬ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তারের খবর আসে। মালয়েশিয়া পুলিশ জানায়, তারা আইএসের জন্য তহবিল ও সদস্য সংগ্রহ করছিল।
গ্রেপ্তার ৩৬ জনের মধ্যে পাঁচজনকে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ মালয়েশিয়ায়র আদালতে তুলছে সেদেশের পুলিশ। ১৬ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং ১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর রবিবার ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো পরিদর্শনে গেলে তার কাছে এনিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
মালয়েশিয়া তিনজন এরই মধ্যে ফেরত পাঠিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের কেউ জঙ্গি নয়। মূলত তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই তিনজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
যে পাঁচজনকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, তাদের বিষয়ে কোনও তথ্য এখনও বাংলাদেশ সরকার পায়নি বলে জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, এই জঙ্গি কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের কারও কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অবস্থান এখন কেমন- প্রশ্নে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর বলেন, “বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনও অবস্থান নেই, এখানে কোনও ধরনের জঙ্গিবাদ নাই।”
তবে তার পরের বক্তব্যেই ফুটে ওঠে, এক সময় এখানে জঙ্গি ছিল।
জাহাঙ্গীর বলেন, “আপনাদের (সাংবাদিক) সহযোগিতায় এখানে জঙ্গিবাদ নির্মূল করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনাদের ক্রেডিট অনেক বেশি।
“গত ১০ বছরে আপনারা জঙ্গিবাদের কোনও একটা ইনফরমেশন দিতে পারছেন? পারেন নাই। কারণ আগে ছিল, দিয়েছেন; এখন নাই, দেন নাই।”



